প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সেই অমর উক্তি এখনও সমান প্রাসঙ্গিক। গোপীবল্লভপুরের ‘গুজরু গান্ধী’ মতিবাস দাসের কথা বাঙালি মনে রাখেনি। মহত্মা গান্ধীর ডাণ্ডি অভিযানে ৭৮জন স্বেচ্ছাসেবকের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন। উচ্চতা কম থাকার কারণেই ভালোবেসে ‘গুজরু গান্ধী’ বলে ডাকা হতো তাঁকে। এখনও ধুলোমাখা ঘরে বাবার স্মৃতি আগলে রেখেছেন সত্তরোর্ধ্ব কলিঙ্গকিশোর দাস।
জাতীয় কংগ্রেস তখন পূর্ণ স্বরাজের ডাক দিয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের ডাকে দেশের যুবসমাজ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সদ্য বিবাহিত মতিবাস স্ত্রীকে ছেড়ে সবরমতী আশ্রমে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি মহাত্মার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। লবণ সত্যাগ্ৰহ অভিযানে গান্ধীজির ৭৮জন বিশ্বস্ত স্বেচ্ছাসেবকের মধ্যে জায়গা করে নেন। গান্ধীজির সঙ্গে সবরমতী আশ্রম থেকে ৩৯০কিমি পথ অতিক্রম করে ডাণ্ডিতে পৌঁছন। লবণ সত্যাগ্ৰহ অভিযানে তিনি কলিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। মহাত্মা তাঁকে সন্তানের চোখে দেখতেন। মতিবাসের স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় হলে তিনি সবরমতী আশ্রম থেকে বাড়ি ফেরার জন্য গান্ধীজির কাছে আবেদন করেন। গান্ধীজি সেই আবেদন মঞ্জুর করে বলেছিলেন, ‘পুত্র হলে তার নাম রাখবে কলিঙ্গ’।
এখনও গোপীবল্লভপুরের ধুলোমাখা ঘরে বসে গান্ধীজির দেওয়া নামের স্মৃতি বহন করে চলেছেন বৃদ্ধ কলিঙ্গকিশোর দাস। তিনি বলেন, মহাত্মার দেওয়া নামের স্মৃতি এখনও বহন করে চলেছি। আমার বাবা দেশের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন। একাধিকবার জেল খেটেছেন। পরিবারের দিকে নজর দিতে পারেননি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিক্ষকতা করে কোনওরকমে সংসার চালিয়েছেন। একবার মাত্র বোনের বিয়ের জন্য রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের কাছে চিঠি লিখে সহযোগিতা চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিয়েছিলেন। এখন এসব কথা মানুষকে বললে বিশ্বাস করতে চাইবে না।
বাঙালির ইতিহাসে গুজরু গান্ধীর জায়গা না হওয়া বিস্ময়কর। আঞ্চলিক গবেষক মধুপ দে বলেন, গান্ধীজির অত্যন্ত স্নেহের পাত্র মতিবাস দাস সবরমতী আশ্রমে দীর্ঘদিন ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্ৰামী হিসেবে তাম্রপত্র পেয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে তাঁর নাম নেই। জাতি হিসেবে সত্যি এটা আমাদের কাছে লজ্জার বিষয়।
কলিঙ্গকিশোরবাবুর ছেলে জ্যোতিপ্রকাশ দাস বলেন, গোপীবল্লভপুরে থানার চকে সংবাদপত্র বিক্রি করি। বাবাও থাকেন। গান্ধীজির সঙ্গে দাদুর সম্পর্কের কথা বললে লোকে বিশ্বাস করতে চায় না। অভাব-অনটনে আমাদের দিন চলে। তবে দাদু ও বাবার কাছ থেকে সৎপথে চলা শিখেছি। তা মেনে চলার চেষ্টা করি।
গোপীবল্লভপুর বাসিন্দা অনিমেষ সিংহ বলেন, আমার মা মতিবাস দাসের কাছে টিউশনি পড়তেন। তিনি মাকে পড়াশোনার পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার কথা বলতেন। উচ্চতা কম থাকার কারণেই স্থানীয় মানুষ ভালোবেসে মতিবাসকে ‘গুজরু গান্ধী’ বলে ডাকতেন। ২০২৩সালে এলাকার ব্যোম নিলীমা সারস্বত মন্দির গ্রামীণ পাঠাগারে তাঁর মূর্তি বসানো হয়েছিল। জীবনের শেষদিন অবধি তিনি গান্ধীজির অহিংসার আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন।