শুভজিৎ অধিকারী, শ্রীনগর: আপনি বাঙালি? সম্মতি জানাতেই মুখে চিলতে হাসি গোলাম হাসান আশিরের। ব্যবসাপত্র হচ্ছে না। মেজাজ বেজার। তারমধ্যেই বাঙালি জানতে পেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন কাশ্মীর হ্যান্ডলুমসের কর্মকর্তা হাসান। শোরুমের এক কর্মচারীকে বললেন, ‘দো জবরদস্ত কাওয়া টি (কাওয়া চা) লেকে আও।’
ডাল লেক লাগোয়া মার্কেটে হাসানের শোরুম। তাঁর দাদুর দাদুকে কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী পোশাক বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিলেন তৎকালীন রাজ প্রশাসন। কথাবার্তার মধ্যেই তুললেন বাঙালিদের সঙ্গে কাশ্মীরিদের যোগসূত্রর প্রসঙ্গ। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘দাদুর মুখে শুনেছি, বিশ্বখ্যাত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাশ্মীরে এসেছিলেন। ডাল লেকের একটা হাউসবোটে রাত্রিযাপনও করেছিলেন। বেশ কয়েকদিন এখানে ছিলেন তিনি। আমাদের সঙ্গে বাঙালিদের একটা নাড়ির টান রয়েছে।’ তিনি বললেন, ‘বাংলার দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা রয়েছে কাশ্মীরিদের। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিও রয়েছে নির্ভেজাল ভালোবাসার টান।’ পহেলগাঁও কাণ্ডের পর কাশ্মীরে তৃণমূলের প্রতিনিধি দল পাঠানো নিয়েও আপ্লুত হাসান। তিনি বললেন, ‘এটা নিয়ে এখন সর্বত্র আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, মমতাদিদির এই মানবিক উদ্যোগ কাশ্মীরের পর্যটন ব্যবসার পুনরুজ্জীবন ঘটাবে। দেশভাগের সময়ও কঠিন সঙ্কটে পড়েছিল কাশ্মীর। তখন বহু বাঙালি এসে এখানে শিল্প-কারখানা গড়ে স্থানীয়দের রুটি-রুজির দিশা দেখিয়েছিলেন।’ বাংলার শৈলশহর দার্জিলিংকে ভূস্বর্গের ছোট বোন ভাবেন আম কাশ্মীরি। খালি অটো নিয়ে ডাল গেটের মুখে দাঁড়িয়েছিলেন ইরফান হোসেন। হতাশার মধ্যেও প্রতিনিধি দল পাঠানোর জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন ইরফান। তিনি বলেছেন, ‘ঘণ্টা দুয়েক বসে রয়েছি। কোনও যাত্রী নেই। গতবার এই মরশুমে দিনে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় হতো। সত্যি এখন আমরা ভালো নেই। আজ সকালে পাঁচজনের একটা পর্যটক দলকে লালচক ঘণ্টাঘরে নামিয়ে ৪০০ টাকা পেয়েছি। কথাবার্তা শুনে মনে হল ওঁরাও বাঙালি। মমতাদিদি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছেন শুনেছি। এই সিদ্ধান্ত আমাদের বুকে সাহস জুগিয়েছে।’ আদি শঙ্করাচার্য মন্দিরের প্রধান পুরোহিত বাবুল শর্মা বললেন, ‘এই কঠিন সময়ে সাহসই আমাদের সম্বল। আর এক্ষেত্রে বাঙালিরা আমাদের প্রেরণা।’ এসব কথাবার্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পহেলগাঁওকাণ্ডের পর কাশ্মীরে যাঁরা ঘুরতে এসেছেন ও আসছেন, তাঁদের অধিকাংশই বাঙালি। চশমেশাহিতে আলাপ হল জয়া অধিকারী, দ্বিপান্বিতা অধিকারী ও প্রসেনজিৎ মণ্ডলদের সঙ্গে। কাঁকুড়গাছি ও সাঁতরাগাছিতে বাড়ি দুই পরিবারের। প্রসেনজিৎ বললেন, ‘স্রেফ সাহসে ভর করে চলে এসেছি। পহেলগাঁওয়েও দু’দিন ছিলাম। কোনও অসুবিধা হয়নি।’
জঙ্গি হামলা থেকে করোনা মহামারী, কাশ্মীরে পর্যটন ব্যবসা যখনই মুখ থুবড়ে পড়েছে, তখনই ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাঙালি। কাশ্মীরবাসীও বুকে জড়িয়ে আপন করে নিয়েছেন বারবার-‘আপ হামারে মেহমান হো..’। এবার খানিক বেশি বলছেন...ক্ষতটা অনেক গভীর বলেই হয়তো...। -নিজস্ব চিত্র