Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাঙালিরা হাঁপিয়ে উঠেছে!

একের পর এক ইস্যুতে দেশের মানুষকে অপদস্থ করা, বিড়ম্বনায় ফেলা যেন মোদি সরকারের অন্যতম কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছে

বাঙালিরা হাঁপিয়ে উঠেছে!
  • ১৭ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

একের পর এক ইস্যুতে দেশের মানুষকে অপদস্থ করা, বিড়ম্বনায় ফেলা যেন মোদি সরকারের অন্যতম কর্মসূচি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই নোটবন্দি থেকে শুরু হয়ে আজ এসআইআর— একের পর এক ধাক্কায় দেশবাসী হাঁপিয়ে উঠেছে। এ রাজ্যে বিধানসভা ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অনুপ্রবেশের আতঙ্ক ছড়ানো শুরু করেছেন। তাঁর এই অনুপ্রবেশের গল্পের জেরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বাংলা এবং বাঙালিরা। ‘মুসলিম’ বিষয়টা দিয়ে তাঁর গেরুয়া শিবির দেশবাসীকে এমন অন্ধ করে দিতে চাইছে যে, যেখানে যা মিলছে, সেটাকেই চেপে ধরে রাজনীতির অস্ত্র বানিয়ে শাণ দেওয়া চলছে। অন্ধ না হলে বাংলায় লেখা সরকারি পরিচিতিপত্র নিয়ে পুলিস বলতে পারে, এটা বাংলাদেশি ভাষা, বাংলাদেশে চলে যাও? অন্ধ না হলে বিনা তদন্তে শ্রমজীবী মানুষদের ও তাঁদের পরিবারকে তুলে নিয়ে আটকে রাখে দিনের পর দিন? জোর করে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া যায়? বাংলা ও বাঙালির উপর আজ যে দেশজোড়া আক্রমণ, তার প্রধান কারণ, বাঙালির সঙ্গে মুসলিম পরিচয় আজ যেন এক হয়ে যাচ্ছে। এই ভাবনা থেকেই দিল্লিতে অমিত মালব্য বলেন, বাংলা বলে কোনও ভাষা নেই, আছে কেবল বাংলাদেশি ভাষা। সেই সুরে শান দিয়ে ৭৯তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, অনুপ্রবেশকারীদের জন্য দেশের জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে। নতুন ‘জনবিন্যাস অভিযান’-এর মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে। অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে দেশকে বাঁচানো হবে। অন্যদেশ থেকে যাঁরা ভারতে প্রবেশ করছেন, তাঁরা এ দেশের তরুণ প্রজন্মের মুখের ভাত কেড়ে নিচ্ছেন। এটা সহ্য করা হবে না। কিন্তু এই অনুপ্রবেশের গল্প ছড়িয়ে, বাংলার মানুষকে আকস্মিকভাবে নাগরিকত্বের পরীক্ষায় ফেলে অপদস্থ করার প্রয়োজনীয়তা কী? যে রাষ্ট্র নাগরিক তথা সাধারণ মানুষকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না, তাকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তোলে, তা আপাদমস্তক অমানবিক।

Advertisement

দেশবাসী এতদিন জানত, ভোটার কার্ড দিয়ে ভোট দেওয়া যায় এবং আধার কার্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রাপ্য সুযোগসুবিধা পাওয়া যায়। ভাবুন একবার, এই আধার কার্ড কত জরুরি, এত দিন ধরে এই দাবি রাষ্ট্রের তরফে শোনা গিয়েছে। শোনা গিয়েছে এই আবশ্যিক পরিচিতিপত্র সব কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য ‘ইউনিক আইডি’। সেই আধার-কে নাগরিকের পরিচিতির ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এসআইআর বা নিবিড় ভোটারতালিকা সংশোধনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তাতে এই দুই পরিচিতিসূচক কাগজই নাকি পর্যাপ্ত নয়। একে তুঘলকি ভাবনা ছাড়া কী বলবেন? প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তাহলে ঘটা করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে আধার কার্ড তৈরির প্রয়োজন কী ছিল? শেষ পর্যন্ত অনেক টালবাহানার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আধারের ভিত্তিতে আবেদন মঞ্জুর হয়েছে।
আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটকে পাখির চোখ করে এ রাজ্যে এরই মধ্যে ‘অবৈধ ভোটার’ নিয়ে রাজনৈতিক সুর চড়তে শুরু করেছে। বিজেপি নেতারা প্রচার শুরু করেছেন, এ রাজ্যে নাকি দু’কোটি ভুয়ো ভোটার রয়েছে। অর্থাৎ, সেই অনুপ্রবেশের তত্ত্ব। অতএব, দ্রুত এসআইআর চাই। বস্তুত, এই এসআইআর ভোটার তালিকার বিষয় অতিক্রম করে নাগরিকত্বের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ, তাকিয়ে দেখুন, বিহারে এসআইআর-এর প্রাথমিক কাজ হয়ে গিয়েছে। বিহারে বিধানসভা ভোটের আগেই অত্যল্প সময়ের মধ্যে অভিযান চালিয়ে, যেভাবে ৬৫ লক্ষ লোককে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাতে সংশোধন প্রক্রিয়ার অভিমুখ নিয়েই বিপুল সন্দেহের বাতাবরণ চার দিকে। যেখানে খসড়া ভোটার তালিকায় দেখা গিয়েছে, বিহারের জামুই জেলার একটি গ্রামের ২৩০ জন ভোটার একই বাড়ির বাসিন্দা। ওই ২৩০ জনের প্রত্যেকেই কমিশনের কাছে জমা দেওয়া ফর্মে জানিয়েছেন, তাঁরা তিন নম্বর ওয়ার্ডের তিন নম্বর বাড়ির বাসিন্দা। শুধু তাই-ই নয়, এ ছাড়াও কারও বাড়ির নম্বর(ঠিকানা) ০, কারও ০০, কারও আবার ০০০! বিহারের খসড়া ভোটার তালিকায় প্রায় তিন লক্ষ ভোটারের বাড়ির ঠিকানা এমনই। এসব নিয়ে বিজেপি নেতারা চুপ! তাঁদের মনে রাখা দরকার, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে বৈধ ভোটার নির্ধারণ করার অর্থ এই নয় যে, শাসকের ইচ্ছামতো ও সুবিধামতো দেশের মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া যায়। সেই চেষ্টা হলে, নোটবন্দির মতোই ফের মুখ থুবড়ে পড়বে মোদিজির ‘জনবিন্যাস অভিযান’!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ