নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর ও কলকাতা: ঘটনাস্থল, সেই ওড়িশার সম্বলপুর। সময়, সেই বৃহস্পতিবার। জুয়েল রানার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরই আক্রান্ত হয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের আর এক পরিযায়ী শ্রমিক। অপরাধ? তাঁরা বাঙালি। বাংলায় কথা বলেন তাঁরা। বাংলাদেশি বলে দেগে দিয়ে শুধু মারধর নয়, ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতেও চাপ দেওয়া হয় ওই সংখ্যালঘু বাঙালিকে। পড়শি রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিক কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় মধ্যযুগীয় বর্বরতা। রড-শাবল দিয়ে বেধড়ক মেরে মাথা ফাটানো হয়। ভেঙে দেওয়া হয় পা। কোনওরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে রঘুনাথগঞ্জের গিরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের সোনারপাড়া গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসে মহম্মদ আসিফ। বর্তমানে রীতিমতো আতঙ্ক ও যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি। এই গেরুয়া তাণ্ডবে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির এই সমস্ত ঘটনায় নিগ্রহকারীদের প্রতি আমাদের নিন্দা ও নিগৃহীতদের জন্য আমাদের সবরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি রইল। বাংলা বলা কোনও অপরাধ হতে পারে না।’ এই ঘটনার মূল চক্রীদের চিহ্নিত করা এবং তাদের কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি সুনিশ্চিত করাই যে তাঁর প্রশাসনের প্রাথমিক লক্ষ্য, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে নিহত জুয়েল রানার ঘটনায় সূতি থানায় জিরো এফআইআর দায়ের করে তদন্তে নেমেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। ‘আমার রাজ্যের পুলিশ তদন্তের স্বার্থে ওড়িশা গিয়েছে’ বলেও শনিবার জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
অর্থাৎ, জুয়েল রানাই শেষ নয়। বারবার এই একই পরিণতি হচ্ছে বাঙালি শ্রমিকদের। আর তাঁরা ‘শিকার’ হচ্ছেন ডবল ইঞ্জিন রাজ্যেই। আসিফ ছাড়াও শান্তিনগর এলাকায় শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার জন্য আক্রান্ত হয়েছেন রাজ্যের বাসিন্দা শাহিদুল ইসলাম এবং মহিবুল ইসলাম। বেলডাঙার বাসিন্দা শাহিদুল ও মহিবুলকে তাঁর কর্মস্থল থেকে কাগজপত্র দেখার নাম করে নিজেদের ডেরায় তুলে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। মাথায় গভীর আঘাত পান শাহিদুল। আঘাত পান মহিবুলও। প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়েই প্রাণ হাতে নিয়ে রাজ্যে ফিরে আসেন তাঁরা। অত্যাচারের সেই আতঙ্কিত মূহূর্তের কথা জানিয়ে আসিফ শনিবার বলেন, ‘জুয়েলের খুনের রাতেই আমাকে খুঁজতে এসেছিল ছ’জন। কেউ জানায় আমি বাংলাদেশি। কেউ আধার কার্ড দেখতে চায়। আমাদের সঙ্গে থাকা ন’জন পালিয়ে যাওয়ায় আমাকে একা পেয়ে মারতে শুরু করে। আধার কার্ড দেখিয়েও লাভ হয়নি। লোহার রড ও শাবল দিয়ে বেধড়ক মারধর করে প্রায় আধমরা করে ফেলে।’
তবে শুধু ওড়িশা নয়। অন্যান্য ডবল ইঞ্জিন রাজ্যেও এই একই কারণে বাংলার মানুষকে অত্যাচার ও নিগ্রহের শিকার হতে হচ্ছে। তার প্রতিবাদেও এদিন গর্জে উঠেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘প্রতিটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষী মানুষের উপর যে নির্মম অত্যাচার ও নিগ্রহ নেমে এসেছে আমরা তাকে তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছি।’ মৃতদের পরিবারগুলিকে আর্থিক সাহায্যের আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।



