সায়ন্তন মজুমদার: ‘খৃষ্টের জনমদিন বড়দিন নাম।/বহু সুখে পরিপূর্ণ কলিকাতা-ধাম।।’
সায়ন্তন মজুমদার: ‘খৃষ্টের জনমদিন বড়দিন নাম।/বহু সুখে পরিপূর্ণ কলিকাতা-ধাম।।’
ঊনবিংশ শতাব্দীতে মহানগরী তথা তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজধানীতে বড়দিন পালনের এ যেন এক অনবদ্য ছবি! কবিতার মাধ্যমে তা এঁকেছিলেন বাংলা সাহিত্যের মধ্য-আধুনিক যুগসন্ধির কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। সাহেবসুবোদের ঘরে সেই সময় কেরানি-দেওয়ানেরা ভেট পাঠাতে ব্যস্ত। গোরা ব্রিটিশদের কাছে সে এক সুখের পরব। ভেটকি, কমলালেবু, বাদাম, মিছরি ভালো দামে তারা কেনে। পৌত্তলিক ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের যিশু কোলে মাদার মেরির মূর্তির মধ্যে গুপ্ত কবি দেখতে পেয়েছিলেন যশোদাদুলাল শ্রীকৃষ্ণকে। মেরি এবং যশোদার মহিমাকে তিনি যথাক্রমে বিদেশ ও স্বদেশের ব্রহ্ম বলে ঠাওরানোর পাশাপাশি লিখেছিলেন, ‘দিশী কৃষ্ণ রিষি কৃষ্ণ এ দেশ ও দেশ।/উভয়ের কার্য আছে বিশেষ বিশেষ।।’
যিশুর জীবনচরিত সংক্ষেপে বর্ণনা করেই ঈশ্বরচন্দ্র বড়দিন পালনের বিবরণ দিয়েছেন। রুটিমাংস, ‘রক্ত’মদ, বিজিতদের ‘কোল্ড’ বা ঠাণ্ডা করে রাখা বিজেতাদের ‘গোল্ড’ বাঁধাই বাইবেল, জমকালো পোশাক, গির্জার উপাসনা, ছুটির ছোটাছুটি, দেবদারু পাতা-গাঁদা ফুলে সাজানো গোরাদের বাড়ির গেট, প্রেমনৃত্যগীত সহ অনেক কিছুর সন্ধান পাওয়া যায় তাঁর ১৬৬ ছত্রের ‘বড়দিন’ কবিতায়। তৎকালীন ইংরেজভজনাবিলাসী বাঙালিদের ব্যঙ্গ করতেও তিনি ছাড়েননি। উৎসবের শরিক হওয়ার জন্য গোরাদের রান্নাঘরের কুক, ঘোড়ার গাড়ির সহিস, কোচম্যান হতে চেয়ে তিনি লিখেছেন, ‘যে সকল বাঙালির ইংলিশ ফ্যাসন।/বড়দিনে তাহাদের সাহেব ধরণ।।/...হোটেল-মন্দিরে ঢুকে দেখিয়া বাহার।/ইচ্ছা হয় হিঁদুয়ানি রাখিব না আর।।/...জেতে[জাতে] আর কাজ নাই ইশু[যিশু]গুণ গাই।/খানা সহ নানা সুখে বিবি যদি পাই।।’ গুপ্তকবির পরে আমাদের আলোচ্য মধুকবি। উনিশ শতকীয় বঙ্গজীবনে বঙ্গসাহিত্যের মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী ঘটনা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তিনি একশোরও বেশি সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা লিখলেও যিশু নামাঙ্কনে এক কলিও তাঁর কলম থেকে বের হয়নি। একদা একজনের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা গ্রহণকালে তিনি ধর্মপিতা হয়েছিলেন। তখন তার উদ্দেশে ‘কবির ধর্মপুত্র’ নামে একটি সনেট লেখেন। ছেলেটির দীক্ষান্তে নাম হয়েছিল খ্রিস্টদাস। নামটি কোথাও যেন কেষ্টদাসের অনুরণন তোলে। সেটাই হয়তো সুর হয়ে পরিণতি পেয়েছিল পর্তুগালের ফিরিঙ্গি কবি এন্টনির কণ্ঠে—‘খৃস্টে আর কৃস্টে কিছু তফাত নাই রে ভাই।’
সকল তফাৎকে অনায়াসে তফাতে ছুড়ে ফেলে দিতে পারতেন যিনি, সেই ‘চির-বিদ্রোহী’ কবি নজরুলের কথায় আসি। ১৯৫৮ সালে বিশ্বকবির জন্মদিনে প্রকাশিত হয় তাঁর কুড়িতম বই ‘শেষ সওগাত’। কবির চেতনা তখন নিঃশেষিত। তাই বই প্রকাশের কথা অনুধাবন করতে পারেননি। যদিও এর অন্তর্ভুক্ত ‘বড়োদিন’ কবিতাটি অনেক আগেই রচিত হয়েছিল। তাঁর কবিতা মানেই সামাজিক অব্যবস্থার উপর প্রবলভাবে চাবুক মারা। গুপ্তকবির কবিতাদীপের সলতেকে তিনি উসকে দিয়েছিলেন এই বিজোড় সংখ্যক ৩৭ ছত্রের কবিতায়। তাঁর মতে ‘বড়োদিন’ শুধু বড়োলোক ইংরেজদের; ভুখা বাঙালির দিন চিরকালই ছোটো। সেই দিনে একদিকে চলে গোরাদের অর্ধনগ্ন নাচ, অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মশা-আরশোলার সঙ্গে বাঙালির সহবাস যাপন। একদিকে চলে নানা খানাপিনা, অন্যদিকে তার জেরে মাতাল ব্রিটিশদের হাতে ঘটে বাঙালিনীদের লাঞ্ছনা। কিন্তু ভেড়াবলদের মতো বাঙালিরা রুখে না দাঁড়িয়ে তাদের সম্মানে পথ ছেড়ে দেয়। বাঙালির আচরণ এখানে যেন সিনেমার দর্শক বা ঝোপের ইঁদুরবেজির মতো, যেগুলির থেকে ঘরের কুকুরেরও তেজ বেশি থাকে। বড়দিনেও তাই তখন বাঙালির ছোটো মন বড়ো হতেই চায় না। জনদরদি নজরুল মানবপ্রেমিক খ্রিস্টকে সরাসরি প্রশ্ন করেছেন—‘পচে মরে হায় মানুষ, হায় রে পঁচিশে ডিসেম্বর!/কত সম্মান দিতেছে প্রেমিক খ্রিস্টে ধরার নর!/ধরেছিলে কোলে ভীরু মানুষের প্রতীক কি মেষশিশু?/আজ মানুষের দুর্গতি দেখে কোথায় কাঁদিছ জিশু!’
বিদ্রোহী কবির প্রায় সমবয়সি বা এক বছরের বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন চারণ কবি, কৃষ্ণনাগরিক বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়। ১৯৯৫ সালে তাঁর মরণোত্তর কাব্যরূপে প্রকাশিত হয় খ্রিস্টকে নিবেদিত একগুচ্ছ কবিতার সংকলন।
আসি সমর সেনের কথায়। ১৯৩৭-৪০ সালের মধ্যে তিনি লিখেছিলেন ‘ক্রিসমাস’ কবিতা। দুটি স্তবকে, মাত্র দশ লাইনে বিন্যস্ত ছিল সেটি। নাগরিক কবিরূপে পরিচিত হলেও তিনি সেখানে নগরকে দেখেছিলেন ‘কঙ্কালবর্ণ’ কুয়াশায় ছেয়ে থাকতে, শহুরে মানবজীবন তাঁর চোখে ‘শবাহারী শৃগাল’-এর মতো মনে হয়েছিল। রাস্তার আলো হয়ে গিয়েছিল কোটরহীন চোখ। তবুও সেই ‘ক্রিসমাস’-এ তিনি শ্যামল শরীরে নির্জন দ্বীপের উৎপত্তি ও শীতের দিনে অনেক দূরের পাহাড়কে যেন কাছে সরে আসতে দেখেছিলেন।
আধুনিক যুগের অনেক কাব্যে ক্রিসমাস, যিশুর প্রসঙ্গ এসেছে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কাব্য ‘কলকাতার যীশু’ ১৯৭৯ সালের এই ডিসেম্বর মাসেই প্রকাশিত হয়। পথশিশুর মধ্যে যিনি সাক্ষাৎ যিশুকে পাওয়া কবি প্রয়াত হয়েছিলেন ২০১৮ সালে খ্রিস্ট জন্মদিনেই। মনে আসে জয় গোস্বামীর প্রথম কাব্য ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’।
পরান মাঝির হাঁককে কবিতায় ছড়িয়ে দেওয়া কবি রাম বসুর এই বছর জন্মশতবর্ষপূর্তি হয়েছে আমরা জানি। কিন্তু তাঁর নামসাদৃশ্য ধরে আমরা পৌঁছে যেতে চাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে, সাহিত্যিক রামরাম বসুর দরবারে। বাংলা গদ্যের গঠনকালে প্রথম মুদ্রিত বাংলা গদ্যগ্রন্থের লেখকরূপে তিনি অবশ্যই চিরস্মরণীয়। কিন্তু বঙ্গসাহিত্য ক্ষেত্রে তাঁর প্রবেশ কবিরূপে এবং সিংহভাগ কবিতার ভরকেন্দ্রই হলেন যিশুখ্রিস্ট। উইলিয়াম কেরির মুনশি, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের এই শিক্ষক প্রথম কবিতাটি লেখেন ১৭৮৮ সালে। সেটি ছিল একটি খ্রিস্টস্তব। এর প্রশংসা টমাসের সৌজন্যে খোদ লন্ডনে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর খ্রিস্টগীতি বাংলার ঊনবিংশ শতককেও আলোকিত করেছে। ১৮০০ সালে খ্রিস্ট সম্পর্কে একশো পঙক্তির কবিতা ‘হরকরা’ প্রকাশিত হয়। তৎকালে শ্রীরামপুর মিশনারি মহলে সেটি গসপেল মেসেঞ্জার নামে প্রসিদ্ধি পায় এবং ইংরেজি-হিন্দি-ওড়িয়া ভাষায় অনূদিতও হয়। ১৮০২ সালে বাংলা ত্রিপদীতে রামরাম অনুবাদ করেন ইংরেজি ‘খ্রীস্ট সংগীত’। সমগ্র বাইবেলের কাব্যানুবাদ করার ইচ্ছা পূর্ণ না হলেও ‘বাঙালির ত্রাণের কারণে’ ১৮০৫ সালে কবিতার আকারে বাংলা যিশু জীবনী কাব্য ‘খ্রীস্টবিবরণামৃতম্’ তিনি প্রকাশ করেন। এই উত্তরাধিকার বহন করে প্রায় একশো বছর পরে ১৮৯১ সালে প্রকাশ পেয়েছিল ‘বাংলার বায়রন’ কবি নবীনচন্দ্র সেনের ‘খৃষ্ট’ চরিতকাব্য। রামরামের লেখনীমুখে অনায়াসলভ্য সেই যিশুমহিমা বাংলার বিবিধের মাঝে এক মহাসম্মিলনকেই উন্মোচিত করে— ‘হেদে খ্রীস্ট য়িশু মুকতিদ/য়িশু খ্রীস্ট মুক্তিদাতা হে।’
লেখক গবেষক ও প্রাবন্ধিক