সায়ন্তন মজুমদার: ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। একটি তারিখের সূত্রেই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে যায় মুর্শিদাবাদের কান্দি মহকুমার বাবলা গ্রাম। এ গ্রামের বাবলা নদ এবং ওপার বাংলার বুড়িগঙ্গা রাঙা হয়ে এক আত্মবলিদানের সাক্ষ্য বহন করে। সেই শাহাদাতের বাহক মাতৃভাষা-শহিদ আবুল বরকত। ১৯৫৩ সালে পূর্ববঙ্গ থেকে প্রকাশিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনে হাসান হাফিজুর রহমান, নিজের কবিতায় ‘বর্ষার তীক্ষ্ণ ফলার মতো’ হৃদয়কে বিদ্ধ করা ‘বিষণ্ণ থোকা থোকা নাম’গুলির মধ্যে বরকতের নাম লিখেছিলেন একেবারে প্রথমেই।
১৯২৭ সালের ১৬ জুন অবিভক্ত বঙ্গের বাবলা গ্রামে জন্ম আবুল বরকতের। এ বছর তাঁর জন্মশতবর্ষের শুভ সূচনা হচ্ছে। গ্রামের সকলে ডাকতেন আবাই বলে। গ্রামের উন্নয়নে গোটা পরিবারের বড়ো ভূমিকা ছিল। বরকতের মা হাসিনা বেগমের নামে এখনও পুকুর ও মসজিদের জমি রয়েছে। পিতা মুন্সি শামসুজ্জোহা বা ভুলু মিয়াঁ আজও গ্রামপ্রান্তে সমাহিত।
৮ ফাল্গুনের সেই দিন তাঁদের সন্তানের শবদেহকে ফুলে মুড়িয়ে দেয় আপামর জনগণ। ওই দিনে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের বেদি রচনার শরিক ছিলেন মা হাসিনা। আবাইয়ের মায়ের সেই তেজ আমাদের কণ্ঠ যেন ভরিয়ে দেয় হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানে— ‘শহিদ স্তম্ভ ভাঙে কারা সাধ্য আছে কার/মোদের সিনায় সিনায় ওঠে শহিদের মিনার।’ বরকতের শহিদ বেদি অবশ্য বারবার তৈরি করা হয়েছে, আবার ভেঙেও দেওয়া হয়েছে।
১৯৫৬ সালে ভাষা-শহিদ আবদুল আউয়ালের আট বছরের কন্যার হাতে দ্বিতীয় শহিদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। সেটি উন্মোচন করেছিলেন হাসিনা বেগম। ১৯৬৩ সালে তৃতীয় শহিদ মিনারও উদ্বোধন করেছিলেন বরকতের বাহাত্তর বছরের ‘আম্মিজান’। আমাদের কাছে দিনটি বেদি প্রতিষ্ঠার ‘ন হন্যতে’ অমৃতময় ভাষা-শহিদ দিবস হলেও, তাঁর কাছে সেটি ছিল আবদুল গফফর চৌধুরীর কথামতো ‘ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু-গড়া এ ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’। কিন্তু আজ শহিদের আত্মত্যাগ, শহিদ জননীর আবেগকে প্রায়শই দলাদলিতে মত্ত মুনাফাবাজদের হাতিয়ার হতে দেখি। তখন বিমলচন্দ্র ঘোষের কাব্যপঙ্ক্তি আমাদের যেন নাড়িয়ে দেয়—‘শহীদের বেদীতলে সাড়ম্বরে পুষ্প মাল্য দান/কী করুণ অপমান!/...মঞ্চে মঞ্চে গালভরা ন্যাকামীর প্রাচীন অভ্যাস/হে জননী জন্মভূমি কবে শেষ হবে?’
আবার ফিরে আসি বাংলার বাবলা গ্রামে। সেখানে এই মাসে কয়েকদিন ধরে চলে বরকত মেলা। আছে তাঁর নামাঙ্কিত ভবনও। আবাইয়ের হাতেখড়ি হওয়া কাদু মিয়ার বৈঠকখানায় চলা ফড়িং মাস্টারের পাঠশালা বা প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঠিক সেভাবে না পাওয়া গেলেও আজও স্বমহিমায় বিরাজমান ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত তালিবপুর হাইস্কুল। অনেক বইতেই লেখা রয়েছে, সেই স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন বরকত। কিন্তু স্কুলের নথি অনুযায়ী, বরকত ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন। তখন স্কুলের নাম ছিল তালিবপুর হায়ার ইংলিশ স্কুল। মোট আটজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দেন। উত্তীর্ণ হন পাঁচজন। বরকত সহ সেই বছর তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন নন্দগোপাল ভট্টাচার্য, মুজাফফর রহিম আবু তাহা, গোলাম মুর্শেদ, গোলাম ফতে। বরকতের বয়স লেখা ছিল ১৪ বছর ৭ মাস। কিন্তু তাহলে তো জন্মসাল হয় ১৯২৯। সেটি সঠিক নয়। সম্ভবত স্কুলের খাতায় বয়সে কিছু গরমিল হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে তিনি স্কুল থেকে সার্টিফিকেট গ্রহণ করেছিলেন। এরপরে পড়তে যান জেলা সদর বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজে। সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট অব আর্টস পাশ করেন। আজ সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেলেও বরকতের স্মৃতিবিজড়িত কলেজ ভবনটি রয়েছে। মামা আবদুল মালেকের সৌজন্যে ১৯৪৮ সালে তিনি ভরতি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দ্বিতীয় বিভাগে চতুর্থ স্থান লাভ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞা়নে সাম্মানিক স্নাতক হন। বাহান্নর উত্তাল দিনকালে তিনি ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তরের (এমএ) শিক্ষার্থী।
শান্ত, ভদ্র, বিনয়ী, মিতবাক বরকত সেই দিন ঢাকার পুরানো পল্টন লেনের বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন থেকে বেরনোর সময় মামিকে বলেছিলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু একটা হতে পারে। ঠিক সেটাই হয়েছিল—তথাকথিত লক্ষ্মী ছেলে আবুল চিরতরে চলে গিয়েছিলেন লক্ষ্মীবার বৃহস্পতিবারেই। বিকাল তিনটের পরে বঙ্গভাষা উৎখাতের আইন অধিবেশন আরম্ভ হলে, ছাত্র বিক্ষোভ সামলাতে আরক্ষা বা পুলিশি আক্রমণ শুরু হয়। ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতা থেকে প্রকাশিত একুশের প্রথম কবিতা সংকলন ‘ওরা প্রাণ দিল’- তে কবি নিত্য বসুর বর্ণনায় যেন অবিকল তার প্রতিচ্ছবি—‘হঠাৎ দেখি যে উঁচানো সঙীন হাতে/দুর্বৃত্তেরা, আকাশে অন্ধকার/...ভুলি নি কো তাই জেগে আছি অনিবার/আমি ইতিহাস।/...জননী গো আজ মোছো আঁখি জল, শুকতারায়/ ঢাকার ছেলেরা তোমার দুয়ারে রক্ত রাঙায়।।’ কবি শামসুর রহমান লিখেছেন, ‘দেখেছি মোহাম্মদ,যীশু আর বুদ্ধে বিদীর্ণ হৃদয় তাদের রক্ত’।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রাবাসে, ছাপড়ার অস্থায়ী ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আইনের রক্ষককুল ও জনতার খণ্ডযুদ্ধ দেখছিলেন আবুল বরকত। হঠাৎ এক বন্ধুকে দেখে এগিয়ে যেতেই তাঁর তলপেটে গুলি লাগে। তাঁর নীল জামা, খাকি প্যান্ট, কাবুলি চপ্পল রক্তে ভেসে যায়। কয়েকজন তাঁকে নিয়ে যান আপৎকালীন বিভাগে। তখনই প্রথম ভাষা শহিদ রফিকউদ্দিন আহমেদের মৃতদেহ আনা হয়। ডাক্তার কর্নেল গিয়াসুদ্দিনের অস্ত্রোপচারকে ব্যর্থ করে বরকত বেহেস্ত বা অনন্তের পথে যাত্রা করেন রাত্রি আটটায়। ঠিক সেই সময় ওই ওয়ার্ডেই প্রয়াত হন শহিদ আবদুল জব্বার। আবুলের মামা সরকারি খয়রাতি না নিয়ে নিজে দাফনের ব্যবস্থা করবেন বলেন। প্রস্তাব মঞ্জুর হয়। বরকতের জন্মভূমি মুর্শিদাবাদের কবি শৌরীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ‘বঙ্গভাষা-বন্দনা’-র সুর যেন সেদিন ঝংকার তুলেছিল—‘ছন্দময়ী বঙ্গভাষা চন্দনেরই গন্ধে ঢালা,/জাতির জাগরণের সে যে জ্বালিয়েছিল বহ্নিজ্বালা।’
আজিমপুর গোরস্থানে আজিম বা মহান আবুল বরকতকে নিয়ে আসা হয়। সেনাবাহিনীর হাতে শব চলে না যাওয়ায় গণসমাধিস্থ হতে হয়নি তাঁকে। এখানেই তাঁর সঙ্গে চিরশান্তিতে ঘুমিয়ে রয়েছেন ভাষাশহিদ শফিউর রহমান। কবরে মাটি দেওয়ার সময় এক অবাঙালি আধিকারিক বলেছিলেন, ‘এ দুধের বাচ্চাকে মেরে এরা রাজত্ব রাখবে?’ সাইকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া, বাড়ি ফেরার পথে সেগুনবাগিচায় বেড়াতে আসা ছেলেটার মাটিতে মিশে যাওয়ার সময় নিয়ে মতান্তর রয়েছে। কেউ বলেছেন রাত্রি দশটায়, কেউ বলেছেন ফজর অর্থাৎ ভোরের নামাজের আজানকালে।
পরদিন, ২২ ফেব্রুয়ারি মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে একজন বৃদ্ধ ইমাম শহিদি জানাজা অর্থাৎ মৃতদের আত্মার সদগতির জন্য পঠিত নামাজ পরিচালনা করেন। তাঁর দীপ্ত মোনাজাত বা মনস্কামনা শুধুমাত্র সেই দিন নয়, যুগে যুগে মূর্ত রূপ ধারণ করেছে, করছে এবং করবেও। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের অতিপ্রিয় শহিদদের আত্মা যেন চিরশান্তি পায়। আর যে জালিমরা আমাদের প্রাণের প্রিয় ছেলেদের খুন করেছে তারা যেন ধ্বংস হয়ে যায় তোমার দেয়া এ দুনিয়ার বুক থেকে।’
এই একই দাবি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির মাহেন্দ্রক্ষণে কবিতায় লিপিবদ্ধ করেছিলেন চট্টগ্রামের কবি মেহবুব-উল-আলম চৌধুরী। একুশের সেই প্রথম কবিতাটির নাম ছিল ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। ঢাকার রমনার কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে প্রাণ দেওয়া শহিদদের রক্তের আলপনা আগুনের ফুলকির মতো জ্বলতে দেখেছিলেন কবি। শোকবিহ্বল হননি, ক্রোধোন্মত্তও হননি, বরং শহিদি রক্তের গৌরবে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। তাঁর সোচ্চার উচ্চারণ আজও আমাদের উদ্বুদ্ধ করে... ‘যারা আমার হাজার বছরের/ ঐতিহ্যময় ভাষায় অভ্যস্ত/মাতৃসম্বোধনকে কেড়ে নিতে গিয়ে/আমার এইসব ভাই-বোনদের হত্যা/করেছে/ আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’