সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: বিজেপি জানিয়ে দিল, ‘বাংলা’ নামে কোনও ভাষাই নেই। দিল্লি পুলিসের ‘বাংলাদেশি ভাষা’ মন্তব্যকে এভাবেই ‘মূর্খের মতো’ সমর্থন করল বিজেপি। বিজেপির কেন্দ্রীয় আইটি সেলের প্রধান তথা দলীয় মুখপাত্র অমিত মালব্য সোমবার সাফ জানিয়েছেন, দিল্লি পুলিসের ‘বাংলাদেশি ভাষা’ মন্তব্য সঠিক। বাংলা নামক কোনও ভাষাই নেই। বাঙালি নামক জাতি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশি ভাষা হিসেবে যাকে বলা হয়ে থাকে, সেটি একঝাঁক ফ্যাক্টরের উপর নির্ভরশীল। উচ্চারণ, ধ্বনি, বাক্যরীতি ইত্যাদি। অমিত মালব্যর এমন সাফাইয়ে তোলপাড় পড়েছে বাংলা তথা দেশজুড়ে। এবং এটা যে বিজেপির ‘সরকারি অবস্থান’, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। কারণ, মালব্যর বক্তব্যের কোনও বিরোধিতা রাত পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে করা হয়নি। আর তাই ‘বাংলা বিরোধী’ বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণে নেমে পড়েছে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিক। রাজ্যের মন্ত্রী ব্রাত্য বসুর সাফ কথা, ‘দিল্লি পুলিসকে মূর্খের মতো সমর্থন করছে বিজেপি। জোকারের মতো আচরণ।’ সবচেয়ে বড় কথা, এই ইস্যু সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আন্দোলনের ঝাঁঝ তীব্র করার দিকে এগচ্ছেন। সোমবার এমপিদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে তাঁর নির্দেশ, ‘সংসদের ভিতরে এবং বাইরে বাঙালি হেনস্তার প্রত্যেকটা ঘটনা তুলে ধরতে হবে। বাংলা ভাষাকে ওরা মানতে চাইছে না। এটা কোনওভাবে মেনে নেওয়া যায় না। তাই বাংলার স্বার্থে এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।’
দিল্লির লোদি কলোনি থানায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে অভিযোগ দায়ের হয়েছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে। তাদের কাছে পাওয়া নথিতে বাংলা ভাষায় কিছু লেখা রয়েছে। সেটা দেখেই দিল্লি পুলিস মনে করেছে, এই ভাষা ‘বাংলাদেশি’। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দিল্লির দপ্তরে থানা থেকে চিঠি পাঠিয়ে বলা হয়েছে, এই ভাষা উদ্ধার করতে অনুবাদক প্রয়োজন। আপনারা একজন অনুবাদক দিন। একদিকে ‘বাংলা বললেই বাংলাদেশি’ ইস্যুতে হেনস্তার রাজনীতি। তার উপর এমন মন্তব্য। ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে দেশজুড়ে। সংসদে তৃণমূলের এমপিরা সরব হয়েছেন। এমনকী, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন থেকে কংগ্রেসের গৌরব গগৈ—প্রত্যেকে আক্রমণ করেছেন মোদি সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং বিজেপিকে। তাঁরা বলেছেন, ‘বাংলা ভাষাকে চরম অপমান করা হয়েছে।’ এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছেন মালব্য। তাঁর দাবি, ‘সিলেটি নামক একটি উচ্চারণভঙ্গি রয়েছে। তার সঙ্গে ভারতীয় বাংলার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। সুতরাং বাংলা নামক কোনও ভাষাই নেই।’ আত্মপক্ষ সমর্থনে আনন্দমঠ, জনগণমন এবং বন্দে মাতরমের ভাষাও টেনে এনেছেন মালব্য। তাঁর নয়া বাংলা থিসিস হল, আনন্দমঠ বাংলায় লেখা। কিন্তু বন্দে মাতরম সংস্কৃত ভাষায়। আবার তাঁর ‘রচিত’ নয়া ইতিহাস—জনগণমন ব্রাহ্ম সমাজের প্রার্থনা মন্ত্র হিসেবে সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলায় লেখা। বাংলার প্রকৃত ইতিহাস অবশ্য অন্য কথা বলছে। জনগণমন ১৯১১ সালে ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে গাওয়া হয়েছিল। ব্রাহ্ম সমাজের মন্ত্র হিসেবে প্রার্থনাগীত নয়, এই গানের পর্যায় স্বদেশ। বিজেপি নেতা অমিত মালব্যের স্থির বিশ্বাস, বাংলাদেশে যে ভাষা কথ্য ভাষ্য হিসেবে ব্যবহৃত, তাতে ভারতীয় বাঙালিরা কথা বলে না। প্রকৃত ঘটনা হল, দেশভাগের আগে এবং পরে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু ছিন্নমূল বাঙালি পরিবার নিজেদের আত্মীয় বৃত্ত এবং বন্ধুসমাজেও বাঙাল ভাষাতেই কথা বলেন। বাংলা ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে অমিত মালব্যের নবতম উক্তি—সিলেটি এমন একটি ভাষা, যার সঙ্গে ভারতের বাংলাভাষীদের দূর পর্যন্ত সম্পর্ক নেই। অথচ অমিত মালব্যের দল যে রাজ্যগুলিতে শাসন ক্ষমতায়, সেই ত্রিপুরা, অসম, মেঘালয়ের বিস্তীর্ণ অংশের বাঙালি ভারতীয় নাগরিকের দৈনন্দিন ভাষা সিলেটি। দেশভাগের সময় সিলেট ভারতেই যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে বদলে যায় সিদ্ধান্ত। সিলেটের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক নেই বলে মনে করেন অমিত মালব্য। এক শ্রেষ্ঠ বাঙালির বাবা-মা ছিলেন সিলেট তথা শ্রীহট্টের আদিবাসিন্দা। তাঁর নাম? শ্রীচৈতন্যদেব।