Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

আচার বারবার

স্কুল ছুটির পর একছুটে স্কুল গেট থেকে বেরিয়েই থমকে যায় রিনি। স্কার্টের পকেটে হাত গলিয়ে বের করে একরাশ খুচরো। আর তারপরেই চলে যায় ‘কুল কাকু’র সামনে।

আচার বারবার
  • ১৫ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শীত আসছে। আচার বানানোর এই তো সময়। আচার কারও কাছে নস্টালজিয়া, কারও বা রোজগার। নানা স্বাদ ধরা থাকে আচারে।  

Advertisement

দৃশ্য ১: স্কুল ছুটির পর একছুটে স্কুল গেট থেকে বেরিয়েই থমকে যায় রিনি। স্কার্টের পকেটে হাত গলিয়ে বের করে একরাশ খুচরো। আর তারপরেই চলে যায় ‘কুল কাকু’র সামনে। সেখানে কুলের আচার, আমসি, হজমি, আমড়া মাখা— চাহিদা অনুযায়ী চলছে ফরমায়েশ। রিনি যোগ দেয় দলে। 
আট বা নয়ের দশকে যাঁরা স্কুলে পড়েছেন তাঁরা এই চিত্রটির সঙ্গে বেশ পরিচিত। স্কুল গেটের কুল কাকুদের সেই সময় ছিল ভীষণ ‘ডিমান্ড’। পেটমোটা কাচের শিশিগুলো দেখলেই ভিজে জল আসত স্কুল পড়ুয়াদের। 
দৃশ্য ২: বাড়ির পিছনের উঠোনে শীতের মিঠে রোদে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন বাড়ির গিন্নি নির্মলাদেবী। সামনে বিছানো চাটাইয়ের উপর কাগজ পেতে শুকাচ্ছে আম, লেবু, টম্যাটো ইত্যাদি। উঠনের একপাশে উনুন ধরিয়েছে বিমলা। বড় কড়াইয়ে শুকনো খোলায় ভাজা হচ্ছে ধনে, জিরে, মেথি, সর্ষে, মৌরি, রাঁধুনি, শুকনো লঙ্কা সহ হরেক মশলা। এগুলোই আচারের মশলা। অল্প তেলে ভাজা হচ্ছে রসুন, লঙ্কা। সেই তেল মিশবে আচারের মশলায়। তারপর শুকিয়ে রাখা আম, লেবু বা টম্যাটোয় মাখানো হবে তা। সবশেষে সামান্য তেল সহযোগে আচার তৈরি। 
একটা সময় এই দৃশ্য অতি পরিচিত ছিল বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরে। ক্রমশ গৃহিণীদের ব্যাপ্তি ঘর ছাড়িয়ে বাইরে পৌঁছেছে। ফলে রোদে আচার মেলে তা শুকনোর সময় হয়তো এখন আর পাওয়া যায় না।
তাই বলে কি বাঙালির রসনাতৃপ্তির এই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আচার ক্রমশ বিলুপ্তির পথে? পুজো বা শীতের মেলায় আচার বিক্রেতা থেকে রেস্তরাঁর শেফ কেউই কিন্তু তেমনটা মনে করেন না। স্থান কাল পাত্র সময়ের সঙ্গেই বদলে গিয়েছে খানিকটা। তবু আচার বাঙালির অতি প্রিয় খাবারের মধ্যে নিজের স্থানটি ঠিক বজায় রেখে চলেছে। অ্যাস্টর হোটেলের এগজিকিউটিভ শেফ জানালেন, তাঁদের ইন্ডিয়ান রেস্তরাঁর মেনুতে আচার রাখা হয়েছিল এই বছর পুজোয়। চাহিদাও ছিল প্রচণ্ড।
বাঙালি অবাঙালি সবার কাছেই আচার এক অন্য ধরনের নস্টালজিয়া। কেউ ভাবেন একান্নবর্তী পরিবারের কথা, দুপুরে গিন্নিদের ছাদ-আড্ডার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের আচার তৈরির তদারকির কথা। কারও হয়তো স্কুলের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। কেউ আবার আচার শুনলেই তার সঙ্গে কী কী খাবেন সেই লিস্ট নিয়ে বসে পড়েন। 
তবে ক্রমশ আমরা হাইজিনের কদর করতে শুরু করেছি। সেই ক্ষেত্রে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দোকানে, সুদৃশ্য জারে ভরা আচারের চাহিদা বাড়ছে এই প্রজন্মের কাছে। লঙ্কা, কুল, তেঁতুল, চালতা বা আমড়ার পাশাপাশি মিক্সড ভেজ আচার, বাদামের আচার, ফল মাখা ইত্যাদিও তৈরি করছেন আচার প্রস্তুতকারীরা, জানালেন আচার বিক্রেতা স্নেহা মোহন। 
স্মিতা আগরওয়ালও আচার বানিয়ে ও বিক্রি করে হয়েছেন রোজগেরে। তাঁর কাছে আচার ছোটবেলার সুখস্মৃতি। মা ঠাকুরমার গন্ধমাখা খাবার। পুজোর পরেই যে কাজ শুরু হতো, তা-ই চলত বসন্তের প্রথম দিক পর্যন্ত। সেই থেকেই আচারের প্রতি স্মিতার আকর্ষণ ও রোজগার হিসেবে তা বেছে নেওয়া। নোনতা ও মিষ্টি আচার তো বটেই, পাশাপাশি সব্জির আচার, ঝাল আচার ইত্যাদিও বানাতে শিখেছেন। এখন এই বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেন তিনি। কোনও আচার কখন খাওয়া উচিত এই নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করেন।  স্মৃতি বা চাহিদা যেমনই হোক আচারের কদর কিন্তু সমানে চলেছে।      

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ