Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ব্যাটম্যানের কল্পনার শহর!

ইংল্যান্ডে রয়েছে গথাম নামে একটি গ্রাম। এটিই কি ব্যাটম্যানের সেই কাল্পনিক শহর? খোঁজ দিলেন সায়নদীপ ঘোষ।

ব্যাটম্যানের কল্পনার শহর!
  • ২৫ মে, ২০২৫ ১৫:০৫

ইংল্যান্ডে রয়েছে গথাম নামে একটি গ্রাম। এটিই কি ব্যাটম্যানের সেই কাল্পনিক শহর? খোঁজ দিলেন সায়নদীপ ঘোষ।

Advertisement

 

রাতে বাড়ির বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছে মানুষ। অন্ধকার নামলেই গোটা শহরের গ্ৰাস করছে অপরাধের ছায়া। চারদিকে শুধুই অপরাধ। এই কঠিন পরিস্থিতিতে কে রক্ষা করবে শহরবাসীকে? হঠাৎ আকাশে দেখা গেল হলুদ আলো। মাঝখানে বাদুড়ের চিহ্ন। সেই আলো দেখেই অপরাধীরা কুপোকাত। চোখেমুখে ভয়ের চিহ্ন স্পষ্ট। কাকে ভয় পাচ্ছে তারা? সে অসম্ভব ক্ষমতাসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব। পরনে কালো পোশাক। সঙ্গে রয়েছে অত্যাধুনিক গাড়ি আর অস্ত্র। নাম ব্যাটম্যান। এই নামটা শুনলেই কুখ্যাত অপরাধীদের আতঙ্কের শেষ নেই!
১৯৩৯ সাল। বব কেন আর বিল ফিঙ্গারের হাত ধরে পৃথিবীর আলো দেখেছিল ব্যাটম্যান। ডিসি কমিক্সের এই সুপারহিরো সত্যিই যেন গোটা পৃথিবীর প্রহরী। কমিক্স হোক বা সিনেমা। আজও ব্যাটম্যানকে নিয়ে উন্মাদনার শেষ নেই। গথাম নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এই সুপারহিরোর কীর্তির বিভিন্ন মুহূর্ত। জানা যায়, তিনের দশকে নিউ ইয়র্কের বাস্তব পরিস্থিতিকে বোঝাতেই তৈরি হয়েছিল গথাম শহর। তবে গথাম নিছক কল্পনা নয়। বাস্তবে এর অস্তিত্ব রয়েছে। তবে সেটি গ্রাম। ব্যাটম্যান কমিক্সের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই গ্রামটি।
ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ারের একটি ছোট গ্ৰামের নাম গথাম। কমিক্সের সঙ্গে কোনও মিল নেই। এখানকার মানুষের জীবনে কোনও জটিলতা নেই। একসময় গ্ৰামটির নাম ছিল ‘গোট-আম’। পশুপালনই ছিল বাসিন্দাদের অন্যতম কাজ। তবে ১৩০০ সাল নাগাদ গ্ৰামবাসীদের উপর নেমে এল ঘোর বিপদ। মসনদে তখন রাজা জন। মধ্যযুগের প্রথা অনুযায়ী, রাজা কোনও পথ দিয়ে গেলে সেটি জনগণের রাস্তায় রূপান্তরিত হবে। রাজা ঠিক করলেন, গথাম হয়ে গন্তব্যে পৌঁছবেন। এই খবর শুনেই বাসিন্দাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। একদিকে জমি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা। অন্যদিকে পেটের ভাত জোগাড়ের ব্যবস্থা চিরকালের জন্য বন্ধ হওয়ার চিন্তা। তাহলে উপায় কী? ভাবতে ভাবতে গ্ৰামবাসীদের মাথায় এক মজার বুদ্ধি খেলে গেল। সেই সময় পাগলামিকে অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হিসেবে দেখা হতো। সেটাই হয়ে উঠল রাজার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার হাতিয়ার। রাজা আসার কয়েকদিন আগে গ্ৰাম পরিদর্শন করতে এলেন নিরাপত্তারক্ষীরা। তবে গ্ৰামে প্রবেশ করে রীতিমতো চমকে গেলেন তাঁরা। রাজাকে স্বাগত জানানোর বিন্দুমাত্র আয়োজন নেই। অধিকাংশ মানুষই পাগলের মতো ব্যবহার করছে। কেউ পুকুরে ঈল মাছ ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করছে। কেউ আবার উঁচু বেড়া তৈরি করে কোকিলের উড়ে যাওয়া আটকানোর মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্ৰামবাসীদের এই চাল সফল হল। রাজার কানে খবর পৌঁছল, গ্ৰামের মানুষ পাগল। সঙ্গে সঙ্গে গথাম যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করলেন তিনি। 
১৫৬৫ সালে এই কাহিনিগুলি সংগ্ৰহ করে বই আকারে প্রকাশ করেন এ বি ফিজিকে ডক্টুর। নাম ‘মেরি টেলস অব দ্য ম্যাড মেন অব গথাম’। তারপর থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই গল্প শুনে আসছে। ধীরে ধীরে বিদেশেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে গথামের রাজা তাড়ানোর কাহিনি। ১৮০৭ সালের ১১ নভেম্বরে ওয়াশিংটন আর্ভিং নিউ ইয়র্কের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরতে গথাম শহরের নাম ব্যবহার করলেন তাঁর ‘সালমাগুন্ডি পেপার’-এ। শহরের রাজনৈতিক আর সামাজিক চিত্র তুলে ধরতে গ্রামবাসীর পাগলামির কাহিনির সাহায্য নিলেন আর্ভিং। শহরবাসী যেন এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠেছে। ক্ষমতার লোভ যেন প্রত্যেকের মস্তিষ্ক খারাপ করে দিয়েছে। দেখতে দেখতে নিউ ইয়র্কের ডাকনাম হয়ে যায় ‘গথাম’। মার্কিন শহরে সেই নামে দোকানও ছিল একসময়। 
সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন বিল ফিঙ্গার আর বোর কেন। বিল ফিঙ্গার জানিয়েছিলেন, একটি ফোন বুকে তিনি গথাম জুয়েলার্স নামে একটি দোকানের উল্লেখ পেয়েছিলেন। সেই থেকেই ব্যাটম্যানের শহরের নামকরণ। তবে পরবর্তী লেখকরা নটিংহ্যামশায়ারের ছোট গ্ৰামের সঙ্গে কল্পনার গথামের যোগসূত্র স্থাপন করেছেন। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় ডেনিস ও’নিলের লেখা ব্যাটম্যান ক্রনিকলস ৬-এর ‘সিটিস্কেপ’ নামক কাহিনি। সেখানে ব্যাটম্যানের গথাম শহর নির্মাণের ইতিবৃত্ত তুলে ধরা হয়েছে। পরে ২০০৬ সালে ‘লেজেন্ডস অব দ্য ডার্ক নাইট’-এ রাজা জনের কাহিনির কথা তুলে ধরেছেন।  
কয়েক বছর আগে নটিংহ্যামশায়ারের গথামে ‘ভিলেজ অব লেজেন্ড’ নামে একটি স্থাপত্য তৈরি করা হয়েছে। সেখানে কিং জনের সঙ্গে রয়েছে ব্যাটম্যানও। এভাবেই বাস্তব আর কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ