শ্যামল চক্রবর্তী
শ্যামল চক্রবর্তী
• ‘ফাঁকা মাঠে এত শীত লাগে কেন বলতো?’
— উত্তরের হাওয়া দেয় যে।
— তোর মাথা, আমার মুণ্ডু!
— আপনিই বলে দিন ম্যাডাম।
— কত লম্বা লম্বা গাছ, গাছগুলো বেয়ে বেয়ে শীত নামে আকাশ থেকে!
এমন উচ্চমার্গের রসিকতা করতে জানতেন প্রয়াত লেখক নবনীতা দেব সেন। সুরসিক ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী বলতেন, ‘কলকাতায় এখন শীত পড়ে না কংক্রিটের ঝালাপালায়!’
রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, গানে শীত এসে ছুঁয়ে যায় চকিতে। শীতের বেলা খুব ছোটো। ‘এল যে শীতের বেলা, করো ত্বরা করো ত্বরা।’ তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ না করলে ঝুপ করে নেমে আসবে অন্ধকার, হি হি করে কাঁপতে হবে হিমালয়ছোঁয়া হাওয়ায়। কবি অবশ্য ভোর চারটেয় উঠে হিমশীতল জলে স্নান করেন। তারপর গায়ে চাপিয়ে দেন বিশাল জোব্বা। ‘হাট’ কবিতায় ‘উচ্ছে বেগুন পটল মুলো’য় শীতের আভাস। শান্তিনিকেতনের আশেপাশে এত খেজুর রসের, গুড়ের রমরমা। তবু কেন মাছি উড়ে বেড়ায় শুধু ‘কলসি ভরা এখো গুড়ে’, নলেন গুড়ে নয়? এই রহস্য বুঝতে গেলে কবিগুরুকে প্ল্যানচেটে ডাকতে হবে!
যে মানুষটা ছাত্র মুজতবা আলী সিলেটের বাড়ি থেকে ফিরলেই কমলাফুলের মধু পাউরুটিতে মাখিয়ে খেতেন তারিয়ে তারিয়ে, কোনও প্রতিষ্ঠানের ‘মিষ্টান্ন খাইয়া প্রীত’ হয়ে দরাজ সার্টিফিকেট দিতেন, তাঁর লেখায় নানাবিধ মিষ্টান্নের উল্লেখ পেলেও নলেন গুড় নৈব নৈব চ। প্রতিমা দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী, রানি চন্দদের লেখাতেও রবি ঠাকুরের পাটালি-প্রেমের উল্লেখ নেই। রসিক রবীন্দ্রনাথ তবে কি কোনও অজানা কারণে এড়িয়ে চলতেন খেজুর রস অথবা নলেন-পাটালিকে? ‘রবিজীবনী’ নিরুত্তর।
শীত রসরাজ! জিরেন কাটের রস, নতুন গুড়ের রসগোল্লা। জয়নগরের মোয়া, নতুন গুড়ের পায়েস। পৌষ সংক্রান্তির জন্য বসে থাকে না পিঠেপুলি। বাচ্চারা পিঠের মারকে ভয় পেলেও নাচতে নাচতে হাপুসহুপুস খেয়ে নেয় নতুন গুড়ের পিঠে-পায়েস। রবীন্দ্রনাথের ‘পেটে ও পিঠে’ পড়ে দেখতে পারেন। বার্গার-পিৎজা ভক্ত ‘আই ডোন্ট লাইক ইট’ বাঙালি সাহেবরাও পিঠে-পায়েস খান লুকিয়েচুরিয়ে! প্রতিবেশী অমিতাভ রে একদিন নতুন গুড়ের রসমালাই খেয়ে ধরা পড়ে রেসের ঘোড়ার মতো দৌড়ে পালালেন! নিতাই দে ডায়াবেটিসের রোগী। তবু কড়া শীতে গোপনে নতুন গুড়ের কড়াপাক আর মাখা সন্দেশ খান চোখ বুজে। পুজোয় নাড়ু-তক্তি খেয়ে চিনি বাড়ে রক্তে! শীতে বাড়ে নতুন গুড়ে! ডাক্তারদের পোয়াবারো!
শীতকাল এলেই গরম জামাকাপড় কুলুঙ্গি থেকে ল্যান্ড করে বাস্তবে। প্রবীণরা ছেলেবেলায় সুতির মোটা চাদরে মাথা, কান ঢেকে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতির জাবর কাটতে শুরু করেন। ঢাকার বাঙাল চিত্তখুড়ো যেমন...
— একখান চাদরেই শীত কাটাইয়া দিতাম। আর অখন রোজ একটা কইরা নতুন সোয়েটার লাগে। দ্যাখলেই গা জ্বইলা যায়! যত্তোসব!
‘জ্যাকেটটা বললেন না জ্যাঠা’, ফুট কাটল মিচকে কল্লোল।
— থও ফালাইয়া তোমাগো জেকেট! আমাগো হাতে বুনা সোয়েটার একখান হইলেই চইলা যাইত।
— রবীন্দ্রনাথের ‘শীতের রেপার নকশাকাটা’র জমানা আর নেই। পৃথিবী বদলে গিয়েছে! পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই জীবন!
— ফাইজলামির কথা কইও না অসিত। ভিতর যত ফাঁকা হয়, বাইরে তত সাজগুজ লাগে।
— খারাপ বলেননি। উলিকটের ফুলহাতা গেঞ্জির উপর খদ্দরের পাঞ্জাবি। তার উপর সোয়েটার ঢেকে চাদর। মাথায় আমাদের পূর্বপুরুষের টুপি!
— ঘুরিয়ে বলার কি আছে! হনুটুপি বল রাজু।
— অপদার্থের দল। হনুমান টুপি পইরা থাকে?
— লোকে তাই বলে। মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে। সুন্দরবনে গেলে দেখবেন মাঘ মাসে বাঘ মাথায় টুপি দেয়!
রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালেন চিত্ত সামন্ত।
আচমকা মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলার বসন্ত, মালতি আর তুহিনার কথা। ক্লাসের অ্যানুয়াল পরীক্ষাগুলো হত শীতকালে। পরীক্ষার আগে লাল শালুর লেপ দিয়ে সারা শরীর ঢেকে দুলতে দুলতে পড়া। পরীক্ষা হয়ে গেলেই মাঠেঘাটে, বনবাদাড়ে জঙ্গল সাফ করে কাঠের ব্যাট বানিয়ে ক্রিকেট। সঙ্গে ব্যাডমিন্টন, পিট্টু, ডাংগুলি, মার্বেল খেলা। থইথই আনন্দ। রেজাল্টের সময় এগিয়ে আসতেই শরীরজুড়ে জ্বরের কম্প! বাপ রে! কি ঠান্ডাটাই না লাগত!
শীত মানেই কমলালেবু। এখনকার মতো বছরভর নাগপুরের দাঁত টকে যাওয়া কমলা নয়। দার্জিলিংয়ের টুকটুকে মিষ্টি কোয়ার কমলালেবু। দার্জিলিং মেলে ফিরতে ফিরতে বর্ধমান স্টেশনে চার দশক আগেও ট্রেনে বসে শোনা যেত, ‘লেবু মেল, ড্রাইভার, লেবু মেল, সিগন্যাল দেওয়া আছে, গাড়ি স্টার্ট করুন।’ দার্জিলিং মেল আজও আছে। হারিয়ে গিয়েছে, ‘লেবু মেল’।
দার্জিলিংয়ের লেবুর পাতলা খোসা ছাড়িয়ে একটা একটা করে কোয়া দাঁত আর হাতের কায়দায় উলটে পদ্মফুল বানানো। লেবু ছাড়ানোর সময় সামনে কাউকে পেলেই ‘আয় তোর চোখটা একটু পরিষ্কার করে দি’। বুঝে ওঠার আগেই চোখে লেবুর কাঁদুনে গ্যাস। ক্ষতিপূরণ হিসেবে হাতে একটা-দুটো লেবুর কোয়া। লেবুর খোসা ফেলে না দিয়ে রোদে শুকানো। শুকনো খোসা বেটে ময়রার কমলাভোগ। বাটা খোসার সঙ্গে দুধের সর মিশিয়ে দিদিদের রূপচর্চা! সেই সব দিনের শীতে মেয়েদের ‘রুপ লাগি’-র প্রাকৃতিক ব্যবস্থা এখনকার ঝাঁ চকচকে বিউটি পার্লারগুলোকে বলে বলে দশ গোল দেবে।
সন্ধ্যায় খেলার মাঠ থেকে ফিরে জোরে জোরে নতুন ক্লাসের পড়া। পড়তে পড়তে পুত্র-কন্যারা বাবার অফিস থেকে ফেরার অপেক্ষায়। বাইরে পায়ের শব্দ শুনতে পেলেই এক ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরা। হাসতে হাসতে মা ব্যাগ খুলে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন কমলা রঙের টুকটুকে লেবু। আহ্লাদে বত্রিশখানা পুত্র-কন্যা। লেবু শেষ করে আবার ‘বাবর...বাবর... বাবরের ছেলে হুমায়ুন... বাবার হল আবার জ্বর সারিল ঔষধে...।’ পড়া থামলেই বিধিসম্মত লাঠ্যৌষধি! ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে প্রহার আসন্ন বুঝলেই লেপের তলায়! গায়ে মোটা জামা, সোয়েটার, তার উপরে লেপ। কেশবচন্দ্র নাগের নিয়ম মেনে প্রহারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ লাগছে শরীরে। তাতেই ‘বাবা গো, মরে গেলাম গো’ বলে অভিনয়! মার গেল থেমে। চুপিচুপি মায়ের হাত থেকে সান্ত্বনা পুরস্কার... আর একটা কমলালেবু।
শীত মানেই চড়ুইভাতি। সাজানো বাগানে সেজেগুজে বসে ক্যাটারার লাঞ্ছিত ঝুটা পিকনিক নয়, প্রাণের আনন্দে সবাই মিলে ফাঁকা মাঠে বা বাগানে হাতে হাত লাগিয়ে গরম গরম মাংস-ভাত। অফুরন্ত চা। গরম বেগুনি। রোদে পিঠ দিয়ে বসে পঙ্ক্তিভোজন। ‘পথের পাঁচালী’র বোড়াল গ্রামে অপু-দুর্গাদের প্রাণখোলা সেই চড়ুইভাতি মনে পড়ে? বাড়ি থেকে এক কৌটো চাল, একটু ডাল, একটা ডিম আর একটা টাকা নিয়ে এসে স্কুল জীবনের মাঠে বসে খিচুড়ি আর ডিমভাজা ভোলা যায়? শেষপাতে টোপা কুলের চাটনি! সেইসব চড়ুইভাতির পাশে ফুড ভ্লগারদের নির্দেশনায় রাজবাড়ির মহাভোজও নস্যি। শীতের সন্ধ্যায় ডুমলাইট জ্বালিয়ে সন্ধ্যাভাতি। খোকন আর পচা গিয়ে কোনও বাড়ি থেকে নিঃশব্দে তুলে এনেছে একটা ফুলকপি আর একটা কাঁচা পেঁপে। চুরি করা পাপ হলেও ছেলেবেলায় এমন পাপ অনেক মহাপুরুষও করেছেন। এদিক-ওদিক থেকে চুরি করে আনা জিনিস দিয়ে ছেলেবেলার পিকনিক আসলে প্রাণের আরাম, আত্মার আনন্দ।
শীতে চোর বাড়ে। মামুলি চুরি থেকে হাফ-ডাকাতি। বাগান থেকে মামুলি কুল বা রস থেকে ফুল চুরি পর্যন্ত। অম্বিকা কালনার গল্প। পাড়ার রায়বাবুকে সবাই ডাকেন ফুলবাবু নামে। হেমন্তের বৈরাগ্যের পর রংবেরঙের ফুল ফোটে শীত পড়তেই। গাঁদা, রঙিন চন্দ্রমল্লিকা, পিটুনিয়া, গোলাপ, ডালিয়া। কার্তিক মাস থেকে গাছ লাগিয়ে নভেম্বরের মাঝামাঝিই ফুলবাবুর বাগানে রঙের দাঙ্গা!
ফুলবাবু শীতঘুমে তলিয়ে যেতেই সজাগ হয়ে ওঠে পাহারাদার লালু। হাফ-ডাকাত ফুল চোরের দল মাংসের হাড় খাইয়ে বশ করে ফেলল তাকেও। পরদিন সকালে সাজানো বাগান ফরসা হয়ে গিয়েছে দেখে মড়াকান্না কাঁদতে শুরু করলেন কুসুমকোমল রায়। নীলুদারোগা ছুটে এলেন।
—‘মার্ডার করে দিয়ে গেল দারোগাবাবু! খুনিগুলোকে ধরুন।’
—‘ফুলচোরদের অত্যাচারে আমি কোয়ার্টারের বাগানে শীতে ফুলগাছ করাই ছেড়ে দিয়েছি। আপনিও ছাড়ুন।’
—‘চোর না ধরলে আমি কিন্তু সুইসাইড করব।’
—‘আমিও ভেবেছিলাম, পারিনি। পারবেন না মশাই।’
শীতের রাতে ঘুম গাঢ় হয়। গৃহস্থের গভীর ঘুম, চোরদের মহাধুম! ঘটি বাটি কলসি থেকে শুরু করে কায়দা করে ঘরে ঢুকে শাড়ি, গয়না, নগদ ভ্যানিশ। বর্ধমানের খোশবাগান এক শীতে চোরে চোরে টইটম্বুর। গৃহস্থরা ডিফেন্স পার্টি বানিয়ে রাত পাহারা শুরু করলেন। প্রতিরোধ বাহিনীর নেতা গামা পালোয়ান।
পাহারা চলছে, চুরিও। হঠাৎ একদিন মাঝরাতে গামাবাহিনীর প্রবল চিৎকারে জেগে উঠল পাড়া। রোগা টিংটিঙে একজন বৃদ্ধকে জড়িয়ে ধরে আছে গামা। মাথায় টুপি গায়ে চাদর, বুড়ো চোর থরথর করে কাঁপছে। অবনী উকিল দৌড়ে গিয়ে গামার হাত থেকে মুক্ত করলেন বৃদ্ধকে। বাড়িতে ঢুকিয়ে গরম দুধ খেয়ে চাঙ্গা হলেন উকিলবাবুর বেয়াই।
— এত রাতে বাইরে গিয়েছিলেন কেন?
— অজ পাড়াগাঁর মানুষ, বাড়ির বাইরেই জলবিয়োগ করি।
— তাই বলে এই চরম শীতের রাতে!
— উনো বর্ষায় দুনো শীত! বর্ষা বেশি হলে শীত বাড়বেই।
যৌবনের অলিম্পিক সার্কাসের ট্রাপিজের খেলা। বুকের পাটায় হাঁটছে হাতি। শীতের সেইসব স্মৃতি আজ ছবি। প্রায়- ছবি ধুনুরির মাথায় তুলো, কাঁধে শালু নিয়ে তুলোধোনা। বালাপোশ। কাঁথা সেলাই। গুগলজেঠু সব জানে! হাতের মুঠোয় এক কোটি ছবি। ফেসবুক-হোয়াটস্যাপে পাটালি, মাটির হাঁড়ির খেজুর রস, নলেন গুড়ের কাঁচাগোল্লা। বিয়েবাড়ির অন্তহীন ভিডিও। সোয়েটার-চাদর। নতুন গুড়ের পুলিপিঠে। পাটিসাপটা। সরার পিঠে। চড়ুইভাতি। সরষে খেতি। জয়নগরের মোয়া। কমলালেবু। হরেক মাল পুরো মাগনা।
ময়দানে শীতের কুয়াশা চিরে এগিয়ে চলেছে রোমান্টিক ট্রাম। ভোরে মুখ খুললেই ধোঁয়া। কমলালেবু রঙের রোদ। কলঘরে স্নানের নামে নামমাত্র মাথা ভিজিয়ে বেরিয়ে আসা। পরমান্নের রাঁধুনিপাগল খুশবু। নতুন গুড়ের রাজভোগ। ছাদের রোদে ডাল বেটে বড়ি দেওয়া মায়েরা। দিদির হাতে বোনা সোয়েটার। কুয়াশা তাড়াতে ভোরের ট্রেনে পটকা ফাটানো। এসব অবশ্য ছবিতে মিলবে না। মিলবে শুধু স্মৃতির তোরঙ্গে।
শীতের আড্ডা বেঁচে আছে আজও। জেলায় জেলায় নাটক। বইমেলা। আছে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের অনবদ্য গল্প ‘রস’। আছে সিরাজ, গগনের মতো শিউলির দল। খেজুরের রস জ্বাল দেওয়ার স্বর্গীয় গন্ধ। আর আছে সুকুমার রায়ের ‘পাঁউরুটি আর ঝোলাগুড়’। ‘সবার চাইতে ভালো’ অবশ্য এখন গরিব- মধ্যবিত্তের গরমগরম হাতরুটি আর খেজুরের গুড়। আম জনতা কনকনে শীতে এটুকু পেলেই আহ্লাদে ষোলোখানা।
অঙ্কন : সুব্রত মাজী
গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র