বাদাম
  • ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী: টপেনটা নেওয়ার জন্য ল্যাপটপ ব্যাগের সামনের চেন খুলে হাতড়াতেই পকেটের একদম তলার দিকে পিচপিচ করে আওয়াজ হল। শুভঙ্করের মনে পড়ল, ওখানে একটা বাদামের প্যাকেট ছিল। মা দিয়েছিল। প্যাকেটটা বের করল ও। আঙুলের স্পর্শ জানান দিল, মিইয়ে গিয়েছে বাদামগুলো। নরম। প্যাকেটটা ঝটিতি বের করে জামার বুকপকেটে রাখল শুভঙ্কর। অফিসের বিরাট ফ্লোরের একেবারে কোনার দিকে তিনটে মিটিং রুম আছে। ছোটোটা খালি ছিল। কাচের দরজা ঠেলে ওই মিটিং রুমে ঢুকে পড়ল ও। দাঁত দিয়ে টেনে বাদামের প্যাকেটটা ছিঁড়ল। দু-তিনটে মুখের মধ্যে পুরেই বুঝতে পারল, সেগুলো খাওয়ার যোগ্য নয়। বড্ড নেতিয়ে গিয়েছে। তাড়াহুড়ো করে আরও চার পাঁচটা মুখে দেওয়ার সময়ই ঘটনাটা ঘটল। দরজার সামনে হাজির হলেন সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট। বিপিন আগরওয়াল। শুভঙ্কর ওঁকেই রিপোর্ট করে। বিপিনের মুখে হাসি। এর পরের কথোপকথন তুলে দেওয়া যেতে পারে।

Advertisement

—কেয়া শুভঙ্করবাবু, চুপচুপকে কেয়া খা রহে হো?
—কিছু না স্যার। সামান্য বাদাম।
—ইতনা ছোটা? এত ছোটো বাদামের প্যাকেট আজকাল পাওয়া যায় নাকি?
—যায় তো। সব দোকানেই যায়।
—কত দাম এটার?
—পাঁচ টাকা স্যার। 
টাকার অঙ্কটা শুনে হঠাৎ বিষম খেলেন বিপিন আগরওয়াল। টেবিলে রাখা জলের বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খাওয়ার চেষ্টা করলেন। শেষরক্ষা হল না। কিছুটা জল ওঁর মুখ থেকে ছিটকে পড়ল সমুদ্র নীল রঙের ব্লেজারে। ভদ্রলোকের ঘোর তখনও কাটেনি। আশ্চর্য হওয়া এক জোড়া চোখ নিয়ে উনি ঠায় তাকিয়ে রইলেন শুভঙ্করের দিকে।  
—পাঁচ টাকার বাদাম? দেখি কয়েকটা খাওয়াও তো।
—বাদামগুলোর কন্ডিশন খুব একটা ভালো নয় স্যার। বেশ নরম হয়ে গিয়েছে। 
—শালা কঞ্জুস আদমি। তিন-চারটে বাদামের দাম কত? কিউআর কোড দাও। এক টাকা তোমায় পাঠিয়ে দিচ্ছি। আরে খাওয়াও না ইয়ার!
—এই নিন। 
খুব আগ্রহ ভরে মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাবভঙ্গি পালটে গেল বিপিন আগরওয়ালের। প্রবল জোরে একবার ওয়াক ধ্বনি করলেন। তারপরেই থুতু ফেলার মতো সেগুলো ফেলে দিলেন। টেবিলের তলায় ওয়েস্ট বিন রাখা ছিল। আধচেবানো বাদাম লুটিয়ে পড়ল দামি কার্পেটে। ভীষণ অবিশ্বাসের চোখ নিয়ে শুভঙ্করের দিকে তাকালেন তিনি। চিৎকার করে বললেন, ‘তুমকো শরম নহি আতা হ্যায়? গরিব কোথাকার।’ এরপরই কাচের দরজা খুলে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন।
প্রমাদ গুনল শুভঙ্কর। মাকে ফোন করে দু’কথা শুনিয়ে দিতে হাত নিশপিশ করছিল। নিজেকে সামলে নিল। কী হবে আর এসব করে। নিজের অজান্তেই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা জল। প্যাকেটে থাকা বাকি বাদামগুলো ধীরেসুস্থে শেষ করল ও। নিজের সিটে ফিরে গেল। মনে হল, যেন পৃথিবীশ্রেষ্ঠ জোকারের জন্য অপেক্ষা করছিল রঙ্গমঞ্চ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওর চারদিকে ভিড় জমল। জমায়েতের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বিপিন আগরওয়াল। দু’হাতের দুটো তর্জনীই তিনি উঁচিয়ে ধরলেন শুভঙ্করের দিকে। যেন উদ্যত রাইফেল। অট্টহাসি তিনিই শুরু করলেন প্রথমে। ছোঁয়াচে রোগের মতো সেই হাসি মুহূর্তে প্রসারিত হল শুভঙ্করকে ঘিরে রাখা প্রতিটি সহকর্মীর মুখে। কয়েকটি নির্বাচিত সংলাপ ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।
—সকাল বিকেল কাজ করে, খিদের কথা মনে পড়ে। পাঁচ টাকা, পাঁচ টাকা, পাঁচ টাকা।
—তোমার এই গরিবিপনা আমরা মেনে নিতে পারছি না, ছুনুমুনু। আমার তরফ থেকে এই নাও একশো টাকা।
—তুমি গুরু এ যুগের তুতেনখামেন আছ। যেদিন যাবে, তোমার ডেবিট কার্ড আর ব্যাংকের পাশবই কফিনে ভরে দেব। কিপটে টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি।
—কদম কদম বড়ায়ে যা, কোটি টাকা জমায়ে যা। 
—গুরু আমার শার্টের দাম টু নাইন নাইন নাইন। তোমারটা? দেখে তো আড়াইশো টাকার বেশি মনে হচ্ছে না। ধর্মতলার ফুটপাথ নাকি?
—প্যান্টটাও মনে হচ্ছে শ’চারেকের মধ্যেই নামিয়ে দিয়েছ। আমরা তো সাড়ে তিন হাজারের নীচে কোনো প্যান্ট ছুঁতেই পারি না।
—আমাদের এই অবলা এবং সুপার কিপটে সহকর্মীর জন্য মুক্তহস্তে দান করুন।
—দান করুন। দান করুন।
থম মেরে বসে ছিল শুভঙ্কর। ও জানে, একলা সৈন্য হয়ে অক্ষৌহিনী সেনার বিরুদ্ধে লড়া যায় না। ভিতর থেকে একটা অন্য শুভঙ্কর হঠাৎ চিৎকার করে বলে ওঠার চেষ্টা করেছিল, ‘কেন রে? তোর বাপের অফিস নাকি? কাজ করি। মাইনে পাই। পপকর্নের মতো স্ট্যাটাস ফাটানোয় আমি বিশ্বাস করি না। এনি প্রবলেম?’ অন্য শুভঙ্কর এই আওয়াজ বের হতে দিল না। মুখ দিয়ে যা বেরিয়ে এল, তাকে গোঙানির বেশি কিছু বলা যায় না। দ্রুত কাজে ফেরার চেষ্টা করল শুভঙ্কর। মাউস প্যাডে হাত পড়তেই ল্যাপটপের স্ক্রিন সেভার গায়েব হয়ে গিয়ে চলে এল এক্সেল শিট। কি-বোর্ড স্পর্শ করতে যাওয়ার মুহূর্তে ফের গলা উঁচিয়ে ডাকলেন বিপিন আগরওয়াল। চোখের ইশারায় বললেন, মিটিং রুমে চল। পরের দীর্ঘ কথাবার্তা অনেকটা এরকম।
—হোয়াট ইজ সিরিয়াসলি রং উইথ ইউ, শুভঙ্কর?
—আমি ঠিক বুঝতে পারছি না স্যার।
—আমাদের সংস্থার টার্নওভার সম্পর্কে আশা করি তোমার ধারণা আছে।
—গত ফিনান্সিইয়াল ইয়ারে, মানে অর্থবর্ষে ২ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা প্রফিট করেছি আমরা।
—কারেক্ট। দেন?
—আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আপনি আমায় মিটিং রুমে আবার ডেকে পাঠালেন কেন? আমাকে দেওয়া কোনো অ্যাসাইনমেন্টও তো পেন্ডিং নেই। 
—তোমার ডেজিগনেশন কী?
—প্লিজ আমার সঙ্গে মজা করবেন না, স্যার। গত বছর আপনিই তো প্রোমোশন দিয়ে চিফ ম্যানেজার বানালেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার থেকে ম্যানেজার, সিনিয়র ম্যানেজার হয়ে চিফ ম্যানেজার—একটা লম্বা জার্নি।
—এই অফিসের সবাই জানে তোমার মাইনে পৌনে দু’লাখ পেরিয়েছে। জানে কি না?
—জানত না। আপনিই তো লাস্ট পার্টিতে বলে দিলেন সবাইকে। কী বলেছিলেন মনে আছে? আর চার আনা দিলেই শুভঙ্করের দু’টাকা হয়ে যাবে। সবাই যা বোঝার বুঝে নিয়েছিল।
—বেশ করেছে বুঝেছে, শুভঙ্কর। লোকের সামনে শো অফ করার সেরা মাধ্যম হল স্যালারি। কিন্তু তুমি আজকে আমাকে এটা কি প্রতিদান দিলে? তোমার যদি আরও বেশি আস্ক থাকত, বলতে পারতে আমাকে।
—আমি তো আপনাকে বাদাম দিতে চাইনি, স্যার। আপনি প্রায় জোর করে নিয়ে নিলেন।
—আমার নিয়ে নেওয়াটা ইস্যু নয়। কিন্তু তুমি আমার টিম মেম্বার হয়ে পাঁচ টাকার বাদাম খাবে? ডোন্ট ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া অ্যাবাউট সাম পালিশড্, অ্যারিস্টোক্রেটিক স্ন্যাকস্? শেষ পর্যন্ত আনব্র্যান্ডেড বাদাম?
—আমার মনে হয় ব্যাপারটা নিয়ে একটু বেশিই চর্চা চালাচ্ছি আমরা। 
—বিলকুল নহি। তোমার আজকের ব্যবহার ডিজার্ভস দিস। তুমি রোস্টেড ইডামামে খাও না কেন? তোমার অন্তত পাঁচ-সাতজন কলিগ এটা খায়। এটা হাই প্রোটিন, সুপারফুড।
—ভেবে দেখিনি কখনো স্যার। এটা নিয়ে ভাবতে এখন ইচ্ছে করছে না। আমি যাই এবার, প্লিজ? অনেক কাজ পড়ে আছে।
—নিকুচি করেছে তোমার কাজ। সবই তো আমার হাতে। রাগি চিপস ট্রাই করে দেখেছ কখনো? দু’শো টাকার মধ্যেই তো ছোটো প্যাকেট চলে আসে। 
—না।
—স্লাইস করা ক্র্যানবেরি খাও না কেন? যা বলছি তোমার ভালোর জন্যই বলছি। ড্রাই করা সুপারমিক্স বেরিও তো খেতে পারো। দু’শো গ্রামের প্যাকেট অনলি চারশো রুপিয়া। 
—বুঝলাম।
—খুব খিদে পেলে মাল্টিগ্রেন এনার্জি বার খেতে পার। মিলেট মুসেলিও একটা ভালো অপশন। 
—ওকে, স্যার।
—তোমার হাত ধরে বলছি শুভঙ্কর, নো বাদাম প্লিজ। তুমি একজন ভাইস প্রেসিডেন্টকে রিপোর্ট কর। আমার টিমের অংশ হয়ে তুমি পাঁচ টাকার আনব্র্যান্ডেড বাদাম খেতে পার না। দিস ইজ দ্য ফাইনাল ওয়ার্নিং। হয়তো তুমি আমাকে ডিটেলে কিছু বলতে পারছ না। আমি এইচআর আর তোমার একটা মিটিংয়ের বন্দোবস্ত করছি পনেরো মিনিটের মধ্যে। প্লিজ বি অ্যাভেইলেবল।
—কথাটা এইচআর পর্যন্ত চলে গিয়েছে স্যার?
—আলবাত গিয়েছে। এইচআর হেডকে আমি নিজে ফোন করে জানিয়েছি। ২ হাজার ৭০০ কোটির নেট প্রফিটের অফিসে এ ধরনের কালচার বরদাস্ত করা যায় না।
মাথা নীচু করে চুপচাপ নিজের সিটে ফিরে যায় শুভঙ্কর। কাজে মন বসতে চাইছে না কিছুতেই। যা ঘটছে সেটাকে সার্কাস বলে মনে হচ্ছে আজ। কিন্তু কি আশ্চর্য। ঘটনাগুলো সব সত্যি। দশ মিনিট যেতে না যেতেই ফোন বেজে উঠল ওর। এইচআর হেড। নীতিন ত্রিপাঠী। ওঁর ঘরটাকে সাপলুডোর ঘর বলা হয় এই সংস্থায়। কত লোক ডাবল প্রোমোশনের চিঠি বাগিয়ে নিতে ঢুকেছে ওই ঘরে। একইসঙ্গে কত লোকের টার্মিনেশন লেটার। জব্বর তোল্লাই কিংবা জগঝম্প ধাক্কা—দুটোই উনি নিজের হাতে দিয়ে থাকেন।
—ডিয়ার মিস্টার শুভঙ্কর, কথা বলার পয়েন্টে স্ট্রেট চলে আসা যাক, কি বল? 
—ইয়েস স্যার।
—এক্সেপশনাল কেস হিসেবে তোমার মাইনে মাসে দু’লক্ষ টাকা করে দিতে কোম্পানি তৈরি। আমি সব শুনেছি। ইউ আর অ্যান অ্যাসেট টু দ্য কোম্পানি। কিন্তু তোমাকে একটা পেপারে সই করে দিতে হবে। সেখানে স্পষ্ট করে লেখা থাকবে, কোনো ব্র্যান্ডহীন, বিলো দ্য পভার্টি লেভেল টাইপের খাবার তুমি অফিসে খাবে না। তুমি আজ যা করেছ, তা আমাদের সংস্থার সুনামের বিরোধী।
—একটা সামান্য বাদাম এত দূর পর্যন্ত জল গড়িয়ে দিল স্যার?
—শাট আপ শুভঙ্কর। তোমার এই বাদাম খাওয়ার ছবি বাইরে চলে গেলে সংস্থার শেয়ার প্রাইসও পড়ে যেতে পারে। এভরি স্টেপ ম্যাটার্স। গলায় কোম্পানির পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে তুমি সংস্থাবিরোধী কাজ করতে পার না। মনে রেখ, আমরা ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড। লাক্সারি ব্র্যান্ড, আলট্রা লাক্সারি হওয়ার কথা ভাবে। সেখানকার কোনো কর্মীর এমন ফকিরের মতো মানসিকতা মানায় না।
—বুঝতে পেরেছি, স্যার।
—এক্সিলেন্ট, মাই বয়! মানুষ ভুল করতেই পারে, কিন্তু সময়ে শুধরে যেতে হয়। বিপিন আমাকে বলল ও তোমায় অনেকগুলো বিকল্প খাবারের সন্ধান দিয়েছে। সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বল। দুশো থেকে তিনশো টাকা রেঞ্জের মধ্যে আরও অনেক কিছু পেয়ে যাবে। ইট দেম। লাভ দ্য ব্র্যান্ডস। চিঠিটা তাহলে প্রিন্ট করে দিই?
—প্রয়োজন নেই। 
—এ জন্যই তোমাকে আমি এত ভালোবাসি শুভঙ্কর। তুমি কোম্পানির তিন লক্ষ টাকা বাঁচিয়ে দিলে। মাসে পঁচিশ হাজার ইনটু বারো। নিতে পারতে। নিলে না। যাইহোক, ইওর উইশ।
সন্ধে সাড়ে ছ’টার সময় ল্যাপটপ বন্ধ করল শুভঙ্কর। সব কাজ শেষ হল না। আরও কিছুক্ষণ থাকাই যেত আজ। ইচ্ছে করছে না ওর। বিপিন আগরওয়াল আর নীতিন ত্রিপাঠী আলাদা করে কী বললেন তা জানার জন্য সহকর্মীদের মধ্যে উৎসাহের অন্ত নেই। চারদিকে অন্তহীন গুঞ্জন। শুভঙ্করের অনলাইন ওয়ালেটে সত্যি সত্যি চারশো টাকা জমা পড়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। ওদের টাকা ফিরিয়ে দিল শুভঙ্কর। ক্লান্ত লাগছে খুব। অফিস থেকে বেরল। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই চলে এল সরকারি এসি বাস। সোয়া এক ঘণ্টার রাস্তা। বাসস্টপ থেকে আর আট মিনিট মতো হাঁটলেই বাড়ির গলি। অন্যদিনের থেকে প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে ফিরতে পারল আজ।
যা ভেবেছিল, ঠিক তাই দেখল শুভঙ্কর। আয়ার কাঁধে হাত রেখে জুবুথুবু হয়ে, শামুকের মতো হাঁটার চেষ্টা করছে মা। নিশ্চয়ই মোড়ের দোকানটাতে যাচ্ছে। অনন্ত ভাঁজ হয়ে যাওয়া সাদা ম্যাক্সি। শাড়ি আর পরতে পারে না এখন। তাও সাদা রংটা ছাড়েনি। বাবা শেষ দিকে বারবার বলত, ‘শোক করবে না একদম। এটাই কালের নিয়ম।’ মা শোনেনি। চোখে এখন আর দেখতে পায় না কিছুই। জটিল স্নায়ুর রোগ শরীরটাকে খেয়েছিল। পিঠে চাবুক পড়েছিল বাথরুমে পড়ে যাওয়ার পরে। তিন মাস বিছানা থেকে নামতে পারেনি। 
গতকাল অফিস থেকে ফেরার পরে ম্যাজিক দেখেছিল শুভঙ্কর। নাকি দুঃস্বপ্ন? আয়া বললেন, ‘মাসিমাকে আবার একটা মাথার ডাক্তার দেখাও দাদা। সন্ধেবেলা বলল, হাঁটব। আমি বললাম, বেড রিডেন রোগী তুমি। হাঁটবে কী! শুনল না। পইপই করে বারণ করলাম। শুনল না। আমার উপরে ভর করে, কেঁচোর মতো স্পিডে কোথায় গেল জানেন? মোড়ের মুদির দোকানে। আমার থেকে পয়সা নিয়ে একটা বাদামের প্যাকেট কিনল।’
জ্বলে উঠেছিল শুভঙ্কর। চিৎকার করে বলেছিল, ‘এসব ন্যাকামো করতে কে বলেছিল তোমায়, মা? একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলে কী হত?’
ন্যুব্জ মহিলা বিড়বিড় করে বলেছিলেন, ‘টিফিন দিতে খুব ইচ্ছে করে বাবু। আজ পারলাম, জানিস। যতদিন পারি! আর হয়তো পারব না বেশিদিন। খেয়ে নিস।’
বাদামের প্যাকেটটা ল্যাপটপ ব্যাগের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিয়ে শুভঙ্কর বলেছিল, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে, মা? এই টিফিনে কখনো কোনো মানুষের পেট ভরে?’
ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিলেন উনি। 
অন্ধ মানুষটিকে ঠকিয়ে দিয়েছিল দোকানদার। ওর সঙ্গে শুভঙ্কর পরে বুঝে নেবে।
আপাতত মায়ের হাতটা শক্ত করে, খুব শক্ত করে ধরল ও। 
দু’জনের দুটো তালুর মধ্যে সিমেন্ট মেরে দিতে বড্ড ইচ্ছে করছিল। 
অঙ্কন:  সোমনাথ পাল