Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শপিংয়েই মনখুশ! আজব রহস্য

বেশ ক’বছর ধরে একটা কথা লোকের মুখে মুখে ঘুরছে— ‘শপাহোলিক’। অ্যালকোহলিকের মতো যিনি শপিং বা কেনাকাটায় বুঁদ থাকেন তিনিই ‘শপাহোলিক’।

শপিংয়েই মনখুশ! আজব রহস্য
  • ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: বেশ ক’বছর ধরে একটা কথা লোকের মুখে মুখে ঘুরছে— ‘শপাহোলিক’। অ্যালকোহলিকের মতো যিনি শপিং বা কেনাকাটায় বুঁদ থাকেন তিনিই ‘শপাহোলিক’। কথাটার উৎসস্থল জানা নেই। হয়তো হতে পারে, কোনও মার্কেটিং বিশেষজ্ঞের মুখ নিঃসৃত। যাইহোক না কেন কথাটা এখন বেশ প্রচলিত। স্বাভাবিকভাবেই ‘শপাহোলিক’ বানানো ও বাড়ানোর গুরুদায়িত্বটা কাঁধে নিয়ে ফেলেছে একাধিক ই-কমার্স সাইট। এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে কে-ই বা চায়!

Advertisement

এখন হাতের তালুতে বন্দি গোটা চরাচর। চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যে মনটা মাঝে মাঝেই বিগড়ে যায়। বড্ড অস্থির লাগে। সংবাদপত্র বা টেলিভিশনে খবর দেখতেও ইচ্ছে করছে না। গল্পের বইয়ে চোখ রাখার ধৈর্য নেই। অতঃপর, মোবাইল নিয়ে শুরু ঘাঁটাঘাঁটি। সেখানেও হরেক প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু, অস্থির মন চায়, দেখি তো ফ্যাশন-প্ল্যাটফর্মে নতুন কী ট্রেন্ড চলছে। পোশাক দিয়ে শুরু। একে একে সোয়েটার, জ্যাকেট থেকে সানগ্লাস, ঘড়ি বা ছোটোখাটো নানা সামগ্রী। দাম নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি। ই-কমার্স সাইটগুলিতে ছুঁচ থেকে সোনার গয়না—সবকিছুই হাতের মুঠোয়। কিনি বা না কিনি, কোন বস্তুটি নিজের ‘ফ্যাশন সিগনেচার’ হয়ে উঠবে, সেটা ভেবে তো অন্তত ভালো লাগে। গয়না কেনাবেচার ক্ষেত্রে আবার উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর সাইট রয়েছে। সেখানে নিজের ছবি বসিয়ে তাতে সোনার চেনটা সেট করা যায়। নিজেকে দেখে নেওয়া যায় ঠিক কেমন মানাচ্ছে। একটা যুৎসই না হলে অন্যটা। বাছতে বাছতে একটা না একটা মানানসই হয়েই যায়। ফুরফুরে হয়ে ওঠে মনটা। ট্যাঁকে জোর থাকলে সঙ্গে সঙ্গেই নগদে বুক। না থাকলে ক্রেডিট কার্ড। তাছাড়া ইনস্টলমেন্টের সুযোগও তো রয়েছে। 
পছন্দের জিনিস এল দুয়ারে। আঁকুপাঁকু মন একবার বক্স খুলে দেখে নেয়। ছবির সঙ্গে বাস্তবে মেলাতে একটু সময় গায়েও চড়ে। তারপর ঢুকে পড়ে আলমারিতে। ওই যা ঢুকল কবে সেটা আবারও গায়ে উঠবে তার ঠিক নেই। মনপসন্দ জিনিসটি প্যাক হয়েই পড়ে। ব্যবহারের সুযোগও আসে না। তবে আজ আছে, কাল যদি না পাই! তাই, কিনে নিলাম। এই ভাবখানায় বন্দি হয়ে জিনিস কেনাকাটা চলতেই থাকে। আর এটা করলে মনটা ধীরে ধীরে বিষাদ থেকে আনন্দে ভরে যায়। এক ঝটকায় মনখুশ করার রসদ তালুবন্দি মোবাইলই। তাই অনাবিল আনন্দ পেতে অবাধ বিচরণ করি ই-কমার্স সাইটগুলিতে। 
সমীক্ষা বলছে, মন খারাপ থাকলে এই কেনাকাটার ইচ্ছা আরও বেড়ে যায়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় যাকে বলে, ‘রিটেল থেরাপি’। পুজো-পার্বণ হোক বা কোনও বিশেষ অনুষ্ঠান, কেনাকাটা করতে গেলেই আমাদের মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠে। পছন্দের জিনিস কিনতে পারলে তো আর কথাই নেই। কর্পূরের মতো উবে যায় মন খারাপ করার নানা চিন্তাভাবনা। অর্থাৎ, শপিংই মন-ঠান্ডার একমাত্র ওষুধ। 
অর্থনীতির ভাষায় আবার এটাকে ‘ইমোশনাল স্পেন্ডিং’ বা আবেগতাড়িত ব্যয়ও বলা হয়। বিষয়টা একই। মন খারাপ থাকলে বা রাগ হলে পছন্দের কিছু কেনাকাটা করে সেই মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা। নিজেকেই নিজে ট্রিট দিলাম। আগে হয়তো এই ট্রিট বলতে ভালো-মন্দ খাবার খাওয়া বোঝাত। এখন বাধ সাধছে স্বাস্থ্য-সংকট। ফ্যাটি লিভার, কোলেস্টেরল, সুগার, হাই প্রেশারের চোখরাঙানি। সচেতনতা অবলম্বন জরুরি। স্বাভাবিকভাবেই সেই জায়গাটা এখন দখল করেছে কেনাকাটা। তাতে শরীরের কোনও ক্ষতি নেই। বরং প্রাপ্তি ভালোলাগা।
এবারে আসা যাক, মন খারাপের সঙ্গে শপিংয়ের সম্পর্কের জৈবিক রসায়নটা কী? আসলে রাগ করলে বা অস্থিরতা দেখা দিলে আমাদের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তখন আমরা কীভাবে অর্থ ব্যয় করছি, তা নিয়ে খুব একটা ভাবি না। অনেক ক্ষেত্রে অবশ্য কেনার পরই শুরু হয় আপশোশ। কারণ, ততক্ষণে তো মনটা ঠিক হয়ে গিয়েছে। গাঁটের কড়ি কতটা খসে গেল, সেদিকে নজর চলে যায়। মন করিয়ে দেয় ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের কথা। ফের মন খারাপ— ‘এত কিছু না কিনলেই বোধহয় ভালো হতো!’ কিন্তু, দেখবেন এই আক্ষেপও ক্ষণস্থায়ী। আবারও নতুন ট্রেন্ডের প্রতি ঝোঁক নিজের অজান্তেই বাড়তে থাকে। ক’দিন যেতে না যেতেই আবারও কেনাকাটা। মনস্তত্ত্বের এ এক অদ্ভুত সাইক্লিং অর্ডার। একবার নেশায় পেলে মুক্তি পাওয়া বড়োই কঠিন। কারণ, মনোবিদরা বলেন, মানুষ সবকিছুর আগে মন খারাপ থেকে মুক্তি পেতে চায়। শান্তি পেতে চায়। আর যেটা করলে খুব সহজে মুক্তি মেলে, মস্তিস্ক সেটাই করতে নির্দেশ দেয়। 
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘পেমেন্ট অ্যান্ড কমার্স মার্কেট ইন্টেলিজেন্স (পিসিএমআই) এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, ইদানীং অনলাইন শপিংয়ের ক্ষেত্রে প্রায় ৮০ শতাংশ হয় মোবাইল-মাধ্যমে। বাকি ২০ শতাংশ হয় কম্পিউটার বা ডেস্কটপের মাধ্যমে। আর এখন কেনাকাটার জন্য যে শুধু ই-কমার্স সাইট ঘাঁটতে হবে, এমনও নয়। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে বন্ধু-পরিচিতদের প্রোফাইল সোয়াইপের মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ ভেসে ওঠে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন। তাই, ই-কমার্স সাইট থেকে বেরিয়ে এসেও নিস্তার নেই। স্বাভাবিকভাবেই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের সেই বিজ্ঞাপনের গেরোয় কিশোর প্রজন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক, সকলেই একসূত্রে বাঁধা পড়ি। ঘরে বসে সেই কেনাকাটায় মন থেকে একটা বাড়তি তৃপ্তিও অনুভব করি। 
‘জার্নাল অব কনজিউমার সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত ২০১৪ সালের এক সমীক্ষা বলছে, হতাশা বা অবসাদ যখন এমন জায়গায় চলে যায়, সেখান থেকে আমরা কোনওভাবেই বেরতে পারছি না, তখনই মন চায় এমনকিছু করতে যাতে আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা যায়। আর কেনাকাটার সময় নিজের পছন্দের জিনিস বেছে নেওয়া এবং শেষমেশ অর্ডার দেওয়ার মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাসই আরও জোরদার হয়। নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে কিছু করলে আলাদা একটা তৃপ্তি অনুভূত হয়।
বিভিন্ন দেশের নানা গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ শপিং আসক্তিতে ভুগছেন। এটি শুধু অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতা নয়, এই আসক্তি মানুষের মধ্যে সম্পর্কও নষ্ট করতে পারে এবং ঋণের বোঝায় ডুবিয়ে দিতে পারে। তবুও এই আসক্তি থেকে দূরে থাকা কঠিন। কারণ, এর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে সামাজিক অবস্থান ও স্ট্যাটাস। ধারণাটি এসেছে মার্কিন সমাজ থেকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আমেরিকায় প্রযুক্তির বিকাশ ও অর্থনীতির জোয়ারে পণ্য হয়ে ওঠে সহজলভ্য ও সস্তা। সেখান থেকেই শুরু মার্কিনিদের শপিংপ্রীতি। একসময় তা তাদের সামাজিক মূল্যবোধকেও প্রভাবিত করতে থাকে। কে কতটা কেনাকাটা করলেন, কে কতটা ভালো জিনিস কিনলেন, কে কত দামি গাড়ি কিনলেন, তা দিয়েই বিচার করা হতে থাকে পরিবারের সামাজিক অবস্থানের মাপকাঠি। যাকে আমরা ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ও বলে থাকি। এটাই এখন ভাইরাসের ন্যায় সব শ্রেণির মধ্যে ছড়িয়ে গিয়েছে। 
অনেকে আবার (যাঁদের ট্যাঁকের জোর কম) এই ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ বজায় রাখতে দারুণ এক কৌশল নিয়ে চলেন। মন খারাপের দিনে পরিবার নিয়ে কিংবা একা একা বেরিয়ে পড়েন মার্কেটে। নানা দোকান, শপিং মল ঘুরতে থাকেন। কিন্তু জিনিসপত্র কিছুই কিনলেন না। এমন কৌশলকে আমরা সাধারণত ‘উইন্ডো শপিং’ বলি। এতে টাকা খরচও হল না, অথচ মনটাও কিছুটা ভালো হল। স্ট্যাটাস সিম্বলও খানিক বজায় রাখা হল। অনলাইনেও এই উইন্ডো শপিং চলে। ‘অ্যাড কার্ট’ করে রাখলাম। কিন্তু অর্ডার কনফার্ম করলাম না। তাতে নিজের পছন্দের জিনিস বাছাই করাও হল, আর পরে কিনব সেই মনোবাঞ্ছাও জিইয়ে রাখলাম। এতেও মন বেশ ভালো থাকে। এই অনলাইন উইন্ডো শপিংও মনস্তত্ত্বের এক অন্যতম অঙ্গ। বলছেন মার্কিন মনোবিদ সুসান আলবারস। তিনি মন খারাপের দাওয়াই হিসেবে শপিংকে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছেন। সঙ্গে সতর্কবার্তাও। আলবারসের মত, অনলাইনে এমন অনেককিছুই থাকে যা আমাদের প্রয়োজন নেই। তাও আমরা কিনে ফেলি। এটা রোধ করতে এক পন্থা মেনে চলা জরুরি। যখন যা মনে হবে সব ‘অ্যাড কার্ট’-এ বেছে রাখুন। মনখুশ হয়ে গেলে কর্ম ব্যস্ততায় ফিরুন। তারপর টুক করে সময় নিয়ে সব জিনিসগুলিই কার্ট থেকে ডিলিট করে দিন। তাহলেই আর পকেটের জন্য মাথা চাপড়াতে হবে না। 
তবে, আদতে কতজন বুদ্ধি করে এটা করেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ, আপনি যখন হতাশ, তখন এত ফন্দি-ফিকিরকে মস্তিস্ক প্রশ্রয় দেয় না। অর্ডারে ক্লিক করতে আঙুল নিশপিশ করে। আসলে, যে কোনও আসক্তির পিছনে আশপাশের মানুষের যেমন প্রভাব থাকে, তেমনই শপিংয়ের নেশাকে চাগিয়ে দিতে ‘ব্যাড কোম্পানি’ও থাকে। যারা অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে উৎসাহিত করে। সেটাও মনস্তত্ত্বের এক রহস্য। মনে হয়, সবাই কিনছে, আমি না কিনলে খারাপ দেখাবে বা ‘অড ম্যান আউট’ হয়ে যাব। একেই মন খারাপ। তার সঙ্গে যোগ দেয় এই পিছিয়ে পড়ার ভাবনা। দু’য়ে মিলে আমরা হয়ে যাই শপাহোলিক।  
বিশ্বের তাবড় মনোবিদরা নানা সময় শপাহোলিকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। কেউ বলেছেন, অনলাইনের সেই পেজগুলোই আনসাবস্ক্রাইব করে দিন, যা আপনাকে কিনতে বাধ্য করছে। কেউ কেউ আবার বলেন, মোবাইল না ঘেঁটে বাড়ির কাজে মন দিন। বিভিন্ন আসবাবপত্র ঝাড়াই-মোছাই করুন, কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে যান, বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা মারুন। তবে, আদতে প্রশ্ন একটাই। মন ভালো করার জন্যই যখন শপিং করছি, তখন কি আর অন্য কিছু ভাবার অবকাশ থাকে? লক্ষ্য তখন একটাই—পছন্দের জিনিস কিনে হতাশা থেকে মুক্তি। অতঃপর, আমরা সবাই কম-বেশি শপাহোলিক হয়ে পড়ছি না তো? উত্তরটা সকলে নিজেই জানেন। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ