তন্ময় মল্লিক: কনকনে ঠান্ডা। সঙ্গে উত্তুরে হাওয়া। পারদ নামছে। যাদের রক্ত টগবগ করে ফোটার কথা, সেই তরুণদেরও হাঁটু কাঁপছে। বয়স্কদের অবস্থা আরও কাহিল। এই পরিস্থিতিতে ‘বেনাগরিক’ হওয়ার ভয়ে কাগজপত্র বগলদাবা করে বিডিও অফিসে লাইন দিয়েছেন সরকার গড়ার কারিগররা। তাঁদের কারও শরীরে স্যালাইনের সুচ, কারও নাকে গোঁজা অক্সিজেনের নল। অনেকে তীর্থের কাকের মতো ডাকের আশায় শুয়ে আছেন অ্যাম্বুলেন্সে। নির্বাচন কমিশনের খাতায় তাঁরা সকলেই ‘সন্দেহজনক’ নাগরিক। রাজ্যের প্রতিটি বিডিও অফিসে একই ছবি। ফিরল নোটবন্দির দুর্দশার স্মৃতি। অনেকের মতে, এসআইআর হয়রানি নোটবন্দির চেয়েও ভয়ঙ্কর। কারণ এবার ধনী, নির্ধন সবাইকেই লাইনে দাঁড় করিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে, সামনে কমিশন থাকলেও পিছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে বিজেপি।
পশ্চিম বর্ধমানের কুলটির বেজডি গ্রামের অনিল বাউড়ি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। বাড়িতে শুয়েবসেই দিন কাটে। ওয়াকার ছাড়া এক পা হাঁটতে পারেন না। তিনিও লাইনে। দাঁড়ালেই ভীষণ কষ্ট। পাশে দাঁড়িয়ে শিবানীদেবী স্বামীকে সাহস জোগাচ্ছেন। বলছেন, আরও একটু কষ্ট করো। নাম কাটা গেলে কোনও সরকারি সুযোগ পাব না। তখন চলবে কী করে?
কাটোয়া-১ ব্লকের সুদপুর অঞ্চলের রাধাকৃষ্ণপুরের মুক্তিবালা প্রামাণিকের আধারকার্ডে বয়স নব্বুই। বাস্তবে একশো পেরিয়েছে। ১৫ বছর শয্যাশায়ী। প্রাণবায়ুটুকুই যা বইছে। যেভাবে ধানের বস্তা নিয়ে যায় ঠিক সেভাবেই চাদরে শুইয়ে চারটে খুঁট ধরে তাঁকে আনা হয়েছে বিডিও অফিসে। ‘বেনাগরিক’ হলে বন্ধ হতে পারে বার্ধক্যভাতা, রেশন। সেই আশঙ্কাতেই নাতি পরিতোষ শুনানিতে এনেছেন ঠাকুমাকে। নাতির চোখেমুখে বিরক্তি। কিন্তু, মুক্তিবালাদেবী নির্বিকার। জীবন-মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি এখন জাগতিক উপলব্ধির বাইরে। তবুও তাঁকে দিতে হচ্ছে নাগরিকত্বের প্রমাণ।
কমিশনের নোটিশ পেয়ে খণ্ডঘোষের বিডিও অফিসের লাইনে দাঁড়িয়েছেন ধ্রুব কিস্কু, যোগেশ মাঝিরা। দিন আনা দিন খাওয়া বলতে যা বোঝায় তাঁরা তাই-ই। ধ্রুববাবুর চোখেমুখে আতঙ্ক নেই, ঝরে পড়ছে ক্ষোভ। আদিবাসী হয়েও দিতে হচ্ছে নাগরিকত্বের প্রমাণ। তাই রাগ যাচ্ছে না কিছুতেই। ধ্রুববাবুর সাফ কথা, আমার কাছে কোনও প্রমাণপত্র নেই। বাবা মারা গিয়েছেন অনেক আগেই। তাঁর না আছে ডেথ সার্টিফিকেট, না আছে ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় নাম। এতদিন এগুলির প্রয়োজন হয়নি। আমাদের পূর্বপুরুষরা এদেশের আদি বাসিন্দা। তাও নাগরিত্বের প্রমাণ দেওয়ার জন্য শুনানিতে ডাকা হয়েছে। এরচেয়ে আর দুর্ভাগ্য কী হতে পারে?
এঁরা প্রত্যেকেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পেটের ভাত জোগাড় করেন। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর ৫০০ ও হাজার টাকার নোট বাতিলের দিনেও এই মানুষগুলিকে দুশ্চিন্তা ছুঁতে পারেনি। কারণ নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে পাঁচশো, হাজার টাকার নোট থাকার কথা নয়। ছিলও না। তাই লাইন দিতে হয়নি। কিন্তু, এসআইআর শুরু হতেই তাঁদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব খোয়ানোর ভয় চেপে বসেছে। তাই কমিশনের নোটিশ পেয়ে রুটিরুজি ফেলে ছুটে এসেছেন নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে। এরপরেও তাঁরা ভোটাধিকার পাবেন, নাগরিক হবেন, এমন গ্যারান্টি নেই। সবটাই নির্ভর করছে কমিশনের উপর। কর্তারা যদি ‘নট স্যাটিসফায়েড’ লিখে দেন তাহলে সব চেষ্টাই বৃথা।
এসআইআর শুনানি যত এগোচ্ছে মানুষের ক্ষোভ ততই চড়ছে। তাতে অবশ্য বিজেপি নেতৃত্বের হেলদোল নেই। উল্টে কমিশনের প্রতিটি কাজের সাফাই দিচ্ছে। কমিশনের কাজের দায় আগ বাড়িয়ে নিজেদের কাঁধে তুলে নিচ্ছে। এছাড়া বিজেপির উপায়ও নেই। কারণ এই মুহূর্তে কমিশনই ভরসা। বিজেপির সুবিধে হবে, এমনই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কমিশন। ইনিউমারেশন শুরু হতেই বিজেপি বুঝেছিল, বুথের ভোটারকেই সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএলএ করার ক্ষমতা তাদের নেই। বিষয়টি স্পষ্ট হতেই কমিশন জানিয়ে দিল, বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার হলেই যে কোনও বুথের বিএলএ হতে পারবেন। বাংলায় শুনানিতে থাকবে মাইক্রো অবজার্ভার। তাঁরা সকলেই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মী অথবা অফিসার। তবে, এটা কেবল বাংলার জন্যই। এসব দেখে অনেকে বলছেন, পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে এরপর হয়তো ভোট কাউন্টিংয়ে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি থাকার উপরেও জারি হবে নিষেধাজ্ঞা।
ফলে কমিশনের কাজকে দু’হাত তুলে সমর্থন করা ছাড়া বিজেপির কোনও রাস্তা নেই। তাই মানুষের চরম দুর্ভোগ, হয়রানি সত্ত্বেও বিজেপি নেতৃত্ব কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে। শুনানিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের মন্তব্যে ভুক্তভোগীদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়েছে। মানুষের এই হয়রানি সুকান্তবাবুদের মনে দাগ কাটেনি। উল্টে তিনি শুনানিতে অসুস্থ ও বয়স্কদের যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বলেছেন, যাঁরা অসুস্থ তাঁরা ভোট দিতে কীভাবে ভোটকেন্দ্রে আসবেন? তখন অসুবিধে হবে না?’ সাফাই দিতে গিয়ে টেনে এনেছেন নিজের বাবার উদাহরণ। তিনি বলেছেন, ‘আমার বাবা অসুস্থ মানুষ। তিনি ভোট দিতে যেতে পারেন না। তাই এসআইআরে তাঁর নাম নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। আপনি যদি ভোট দিতে যেতে পারেন, তাহলে এসআইআরে যেতে পারবেন না কেন?’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সর্বোপরি একজন অধ্যাপকের থেকে এমন প্রতিক্রিয়া কল্পনাও করা যায় না! সুকান্তবাবু কমিশনের ‘অমানবিক’ কাজকে সমর্থন করতে গিয়ে এমন সব কথাবার্তা বলছেন যা পুত্রস্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকেও হার মানিয়েছে। তবে, সুকান্তবাবু নিরুপায়। বিজেপির ‘বিগ বস’ অমিত শাহ বাংলায় ‘ঘুসপেটিয়া’দের নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। তাই তাঁকেও সেই সুরে সুর মেলাতে হবে। বেসুরো হলেই হাল যে পূর্বসূরি দিলীপ ঘোষের মতোই হবে, সেটা তিনি বিলক্ষণ জানেন। তাই কমিশনের প্রতিটি কাজকে সমর্থন করা ছাড়া উপায় নেই।
এসআইআর শুরুর আগে বঙ্গ বিজেপি বলেছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমান ও রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দেওয়া হবে। তাহলেই পতন ঘটবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের। কারণ তৃণমূল সরকার রোহিঙ্গাদের ভোটেই টিকে আছে। কিন্তু, শুনানিতে মুসলিমদের পাশাপাশি প্রচুর হিন্দুও ডাক পাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, এসআইআর সময়সাপেক্ষ কাজ। বছর খানেকের বদলে কমিশন বাংলায় সেই কাজটাই করতে চাইছে মাত্র তিন মাসে। কমিশনের তাড়া না থাকলেও বিজেপির আছে। কারণ শিয়রে বাংলায় ক্ষমতা দখলের লড়াই। পুরোনো ভোটার তালিকা ধরে ভোট করলে বিজেপিকে বাংলায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই কমিশনকে দিয়ে নিজেদের পছন্দের ভোটার তালিকা তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। তালিকা সংশোধনের জন্য কাজে লাগানো হয়েছে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স(এআই)কে। তবে সৌভাগ্য, বিজেপি নেতাদের মতো ‘এআই’ এখনও হিন্দু-মুসলিম ভাগাভাগিটা রপ্ত করতে পারেনি।
বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির সৌজন্যে এ রাজ্যের হিন্দুদের একটা অংশ পদ্মভক্ত হয়েছে। আরও বেশি সংখ্যক হিন্দু ভোট এককাট্টা করার অঙ্ক কষে বঙ্গ বিজেপি বলছে, এখন আর ‘সব কা সাথ সব কা বিকাশ’ নয়। তাহলে? ‘যো হামারা সাথ হাম উনকো সাথ।’ অর্থাৎ হিন্দুরা বিজেপির সঙ্গে থাকবে। হিন্দুদের সঙ্গেও বিজেপি থাকবে। হয়তো অনেকে সেই স্লোগানে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু এসআইআর শুনানি পর্বে তাঁরাও টের পাচ্ছেন, বিজেপির দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার নেই।
অকারণে শুনানির লাইনে দাঁড়াতে যাঁরা বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা প্রত্যেকেই অসন্তুষ্ট। নাকে অক্সিজেনের পাইপ নিয়েই শুনানিতে আসতে হয়েছে বোলপুরের সঞ্জয় পালকে। মার্চেন্ট নেভিতে কাজের সুবাদে দেশে দেশে ঘুরেছেন। ২০০২ সালের তালিকায় তাঁর নাম নেই। তাই তিনি সন্দেহজনক। কমিশনের ডাক পেয়ে নাকে নল নিয়েই লাইনে দাঁড়িয়েছেন। উগরে দিয়েছেন ক্ষোভ। নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে কলকাতা থেকে দাঁতনে আসতে হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামী পরিবারের সন্তান প্রশান্তকুমার মোহান্তিকে। এই ঘটনায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারক প্রশান্তবাবু প্রচণ্ড বিরক্ত। এমনকি, ডাক পেয়েছেন প্রাক্তনমন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ও। সর্বস্তরের মানুষকে হয়রানির মুখে ফেলেছে কমিশন।
এসআইআর শুরুর সময় আতঙ্কে ছিলেন মূলত সংখ্যালঘুরা। এখন তা ছড়িয়েছে হিন্দুদের মধ্যেও। শুনানি-যন্ত্রণা সর্বত্র। এই হয়রানির ক্ষোভ কতটা, ইভিএম খুললেই টের পাবে বিজেপি। গেরুয়া নেতারা তখন বুঝতে পারবেন, যে ডালে বসে তাঁরা এতদিন ডানা ঝাপটেছেন, এসআইআর করতে গিয়ে সেই ডালটাই কেটে বসেছেন।