Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ কেন?

বঙ্গে ভোটের দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা হয়নি। অথচ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের হুংকার দিচ্ছেন বিজেপি’র সর্বোচ্চ নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ কেন?
  • ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: বঙ্গে ভোটের দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা হয়নি। অথচ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের হুংকার দিচ্ছেন বিজেপি’র সর্বোচ্চ নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এমনিতেই গত দু’মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে। ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যে ভোট এলে মোদিজি বারবার গিয়ে একের পর এক প্রকল্প উদ্বোধন করেন। রাস্তা, হাইওয়ে, বিমানবন্দর, হাসপাতাল, বড়ো শিল্পপতিদের হাত ধরে হরেক কিসিমের কারখানা, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রেললাইন, বন্দেভারত আহ্লাদ, আরও কত কী...। হাজার হাজার কোটির ‘সওগাত’। মহারাষ্ট্র, দিল্লি, হরিয়ানার উদাহরণ খুব বেশিদিন আগের নয়। বিজেপির সম্ভাবনা আছে এমন রাজ্যে ভোটের আগে এসআইআর হেনস্তা নৈব নৈব চ! আর বাংলার মানুষ যেহেতু বারবার মুখ ফিরিয়েছে, এবারও তেমন ভরসা নেই, তাই গোড়া থেকে ঘেঁটে দাও! ‘শত্রু’ বাঙালির বিরুদ্ধে বদলা নাও! মহারাষ্ট্র, বিহারে ভোটের আগে প্রত্যেক উইকেন্ডে গিয়ে হাজার হাজার কোটির তোফা! ভোটের আগে বিহার পেয়েছে কয়েক হাজার কোটির নিউ পূর্ণিয়া এয়ারপোর্ট টার্মিনাল, ১৩ হাজার কোটির গয়া উন্নয়ন প্রকল্প, কোশী-মেচি নদী সংযুক্তিকরণ, আরারিয়া থেকে নতুন রেললাইন, আরও কত কী! আর পশ্চিমবঙ্গ? নতুন প্রকল্প দূরঅস্ত! প্রাপ্য বকেয়া টাকাই মেলে না। ভাবটা এমন, উত্তরপ্রদেশে চুরি হয় না, মধ্যপ্রদেশে দুর্নীতি নেই, মহারাষ্ট্রে সবাই যুধিষ্ঠির! ব্রাত্য শুধু বাংলা। সবাই জানে আবাস, একশো দিনের কাজের টাকা তিনবছর বন্ধ। আদালতের গুঁতোয় যাও বা শিকে ছেঁড়ে তাও অসম্ভব সব শর্ত চাপানোর জেরে ভিনগ্রহের হাতছানি হয়েই থেকে যায়। যার অর্থ, ভোটের আগে খাতায় কলমে সব দিয়ে দিলাম, কিন্তু বাংলার ভাগ্যে তা সহজে জুটবে না। এই বঞ্চনার কি কোনওদিন শেষ হবে? ভোটের পর ফল যাই হোক, বনসাল, তাওড়ে, সিং, সন্তোষরা বাংলার থেকে হিন্দি বলয়ের রাজনীতেই স্বচ্ছন্দ, ওখানেই বেশি সময় ও বিনিয়োগে মন দেবেন। দুয়োরানি হয়েই দিন কাটবে বাংলার। বরং যা অবস্থা, ভুল করলে মাছেভাতে বাঙালিকে আমিষ ছেড়ে নিরামিষে মন দিতে হবে। জাত যাবে পেটও ভরবে না। কারণ, বাঙালি অবাঙালি সংস্কৃতির সংমিশ্রণে একটা অদ্ভুতুড়ে কিম্ভুত-কিমাকার জীবনধারা তৈরি হবে। হারিয়ে যাবে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, নেতাজি, স্বামী বিবেকানন্দের সাহিত্য দেশপ্রেম। সাভারকার হবেন শ্রেষ্ঠ স্বাধীনতা সংগ্রামী। দিন কাটবে গোলওয়ালকরের বাণী শুনে! বাঙালি তা মেনে নিতে পারবে তো! 

Advertisement

ক্ষমতায় এলে তথাকথিত সনাতনীরা ঠিক কী তাণ্ডব রূপ ধারণ করবেন তার একটা ছোট্ট ট্রেলার দেখেছে গত রবিবারের ব্রিগেড। বাঙালি বুঝতে পেরেছে আসন্ন নির্বাচনে সামান্য ভুলচুক করলে কত বড়ো সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে! ১৫ বছর টানা ক্ষমতায় থাকলে যেকোনও শাসকের বিরুদ্ধেই কিছু প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বাসা বাঁধে। বর্তমান শাসকও তার বাইরে নন। কিন্তু তাই বলে গেরুয়া বীরপুঙ্গবরা এলে বাঙালিয়ানার শেষযাত্রার বিশেষ যে দেরি হবে না, তাও খুব কষ্টকল্পিত নয়। যাঁরা একজন সামান্য প্যাটি বিক্রেতাকে সহ্য করতে পারেন না, তাঁরা ধারণ করবেন বাঙালির বহুধারা ও স্রোতের মিলন সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও উদার খোলামেলা জীবনশৈলীকে? গীতাপাঠের আসরে একজন গরিব মানুষ গিয়েছিলেন সামান্য কিছু আয়ের আশায়। তিনি জানতেন না, গীতা ত্যাগ কিংবা শান্তি ও সম্প্রীতির প্রতীক হলেও যাঁরা ওই মহতী সভায় হাজির হয়েছেন তাঁরা আধ্যাত্মিক উন্নয়ন নয়, ভোট কেনার কাজেই ধর্মকে ব্যবহার করতে বেশি আগ্রহী। সেই কারণেই ওই ধর্মে সৌভ্রাতৃত্ব, ভাইচারার জায়গা নেই। আছে আমিষ, নিরামিষ, হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণকে সামনে রেখে নির্বাচনে জেতার নীচ কূট কৌশল।
কেন বিজেপি ও সংঘের এই হিন্দুধর্মের সঙ্গে বাংলার মানুষ নিজেকে মানাতে পারে না তার বড়ো উদাহরণ গীতাপাঠের ময়দানে ওই নিরীহ প্যাটিওয়ালাকে ঘিরে ধরে গেরুয়া বাহিনীর বেদম মার। কী দোষ ছিল ওই প্যাটি বিক্রেতার? এই বাংলার সঙ্গে আমিষের চিরদিন ওতপ্রোত যোগ। শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ যে সর্বজনীন হিন্দুধর্মের কথা বলে গেছেন সেখানে গীতাপাঠের সঙ্গে মাংস খাওয়ায় কোনও বিরোধ নেই। আপত্তি নেই  বিক্রিতেও। স্বামীজির কথায় গীতাপাঠের চেয়ে ফুটবল খেলা ভালো। আজ থেকে দেড়শো বছর আগের ওই বাণী আজও এই বাংলায় হিন্দু ধর্মের চালিকা শক্তি। ওতে শরীর ও চরিত্র দুই-ই গঠন হয়। তিনি গুরুভাইদের সর্বদা বলতেন কাজ করতে গেলে শক্তি চাই, নিরামিষ খেয়ে শরীর দুর্বল হলে হবে না। স্বামীজির এই আমিষ প্রীতি বিশেষ করে মাংস আর কইমাছ খাওয়া সর্বজনবিদিত। এনিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কাছেও অভিযোগ কম জমা পড়েনি। কিন্তু ঠাকুর তা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বলতেন, ‘ও যাই খাক আর যেখানেই যাক, তোরা কোনওদিন ওর নখের যোগ্য হতে পারবি না।’ আজ তাঁর মৃত্যুর একশো তেইশ বছর পর বাংলা দখলে ঝাঁপিয়েছে গেরুয়া ভেকধারী কিছু বহিরাগত। একটা নিরীহ সামান্য প্যাটিওয়ালাকে মেরে তাঁদের মেকি বীরত্ব। এর নাম কি হিন্দুত্ব? নাগপুরের কাছে হিন্দুত্বের সংজ্ঞা শিখতে হবে?
আর বন্দেমাতরম? গত একসপ্তাহ ধরে বন্দেমাতরম নিয়ে যে নাটকটা চলছে সংসদে, তার মানেটা কী? যে দলটা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশই নেয়নি। মুখ ফিরিয়ে ছিল। ব্রিটিশের তাঁবেদারি করেছে। তারাই এখন দেশে জাতীয়তাবাদের সোলসেলিং এজেন্ট। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বন্দেমাতরম ছিল ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক। ওই মন্ত্র উচ্চারণেই ফাঁসির মঞ্চে মৃত্যুবরণ করেছেন একের পর এক স্বাধীনতা সংগ্রামী।  আজ দেশমাতৃকাকে সামনে রেখে বিভাজন আর মেরুকরণের বীজ যাঁরা বপন করতে উদ্যোগী, তাঁদের কাছে বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, চিত্তরঞ্জন দাশের ত্যাগের কথা শুনতে হবে?  
বিগত একুশ সালের ভোটে বাংলা দখল ব্যর্থ হওয়ার পর এবার কৌশল বদল করেছে বিজেপি। গতবার ইডি, সিবিআই ছিল বিজেপির বঙ্গ দখলের প্রধান ঘুঁটি। দল নয়, সংগঠন নয়, তৃণমূলের কিছু উচ্ছিষ্ট নেতাকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে বের করে এনে পুরোটা ঘেঁটে দাও। জেলায় জেলায় যোগদান মেলা বসাও আর তৃণমূলের অতৃপ্ত আত্মাদের লোভ দেখাও। এবার কৌশল বদলেছে। কারণ, একই অ্যান্টিবায়োটিক বারবার কাজে দেয় না। তার উপর এবার বাংলায় গেরুয়া সংগঠন পাঁচ বছর আগের চেয়েও খারাপ অবস্থায়। জেলায় জেলায় দলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরমে। ভোটের আগেই অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যদিও বা একজন নাম কা ওয়াস্তে রাজ্য সভাপতি চাপিয়ে দেওয়া গেল, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বেড়ে যাবে এই অজুহাতে রাজ্য কমিটি ঘোষণা এখনও বিশবাঁও জলে। ঘটা করে সদস্যসংগ্রহ অভিযানেও তেমন সাড়া মেলেনি। অগত্যা বশংবদ নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ভোটার তালিকা ধরে ধরে বাংলার জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করা হয়েছে। এক কোটি রোহিঙ্গা বাদ দেওয়ার টার্গেট। কিন্তু তা করতে গিয়ে আঘাত করা হচ্ছে হিন্দু উদ্বাস্তুদেরই। ড্যামেজ কন্ট্রোলে আগামী শনিবার রানাঘাটে সভা করতে আসতে হচ্ছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে। এরপর শুরু হবে প্রচারের লাগাতার কার্পেট বম্বিং। হাওয়াই জাহাজে চেপে ডেলি প্যাসেঞ্জারি। যার রূপরেখা গত বৃহস্পতিবার দিল্লিতে শাসক জোটের এমপিদের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। এবং বাংলার আসন্ন নির্বাচন তাঁর কাছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন। যদি এবারও পরাজিত হন তাহলে তিনি ভারতীয় ইতিহাসের নয়া মহাভারতে কৌরবপক্ষ হিসেবেই চিহ্নিত হবেন। সবচেয়ে দীর্ঘসময়ের প্রধানমন্ত্রী, হিন্দি বলয়ের পার্টিকে প্যান ইন্ডিয়ান দলে পরিণত করার সাফল্য নোটবাতিলের ‘ফ্লপ শো’র সঙ্গে যুক্ত হবে বাংলা দখল করতে না পারার ব্যর্থতাও। বাংলা দখল করার এটাই শেষ সুযোগ মোদিজির সামনে। 
মোদিজি বলেছেন, বাংলা দখল তাঁর কাছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সমান। কিন্তু তা করতে গিয়ে তাঁর দল যেন ন্যায় আর ধর্মের পথ থেকে সরে না যায়। ‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানম ধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।’ এর অর্থ সহজ ও সাধারণ, যখনই পৃথিবীতে ধর্মের ক্ষয় হয় এবং অধর্মের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখনই অবতাররূপে তিনি নিজেকে সৃষ্টি করেন এবং সৎ-সাধুদের রক্ষা ও দুষ্টদের বিনাশ করতে উদ্যোগী হন। গীতাপাঠ পাঁচ লক্ষ না দশ লক্ষ মানুষ করেছেন প্রশ্নটা তা নয়, দখলদারির নেশায় প্রধানমন্ত্রী যেন ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুত না হন। অধর্মের যুদ্ধে লিপ্ত হলে পরিণাম সর্বনাশ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ