Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ঢাকি সমেত বিসর্জন কার?

কোনও নেতানেত্রী নয়, বিশ্বরাজনীতির নাট্যমঞ্চের নিয়ন্ত্রকও নয়, চাকরি ফিরে পাওয়া শিক্ষক শিক্ষিকাদের উদ্ভাসিত মুখটা দেখছিলাম বারবার।

ঢাকি সমেত বিসর্জন কার?
  • ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: কোনও নেতানেত্রী নয়, বিশ্বরাজনীতির নাট্যমঞ্চের নিয়ন্ত্রকও নয়, চাকরি ফিরে পাওয়া শিক্ষক শিক্ষিকাদের উদ্ভাসিত মুখটা দেখছিলাম বারবার। ডিসেম্বরের প্রথম শীত সপ্তাহের সেরা উপহার! সংহতি চৌধুরী, 

Advertisement

শোভন মিশ্র, বিশাখা ঘোষ এবং আরও ৩১ হাজার ৯৯৭ জন। এরা সবাই অত্যন্ত সাধারণ ঘরের। হয়তো আলাদা করে তেমন বলারও কিছু নেই, কিন্তু হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে সবার মুখটাই পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল উচ্চকিত স্বতঃস্ফূর্ত। একটা রায়ের উপর লক্ষাধিক মানুষের বাঁচা-মরা, সংসার উজাড় হওয়া এবং শেষে পুনর্জীবনের অদ্ভুত আলোর ঝিলিক! বিচার ব্যবস্থা তো অন্ধকার সরিয়ে সেই পথেরই দিশারী যুগ যুগ ধরে। আশপাশের চাকরি খাওয়া নেগেটিভ বাতাবরণটাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য মহামান্য দুই বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও ঋতব্রত মিত্রকে ধন্যবাদ। কিছু কিছু কাজ আজও রাজনীতির সীমা মানে না। তাতে কার লাভ হল শাসক না বিরোধী, সাদা না কালো, সেই চুলচেরা হিসেবও শেষপর্যন্ত ব্রাত্যই থেকে যায়। দুর্নীতির সঙ্গে যেমন আপস চলে না, তেমনি ছড়িয়ে পড়া সামাজিক অসুখ দমনের নামে একজনও যোগ্য প্রার্থী যদি চাকরি হারায়, তাও সমাজের পক্ষে কম বড়ো বিপর্যয় নয়। গত আড়াই বছর ধরে কোনও অপরাধ না করে এই শিক্ষকদের জীবনকে যেভাবে দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে তার দায় কার? যিনি রায় দিয়ে পেশা বদলে শাঁসালো সাংসদ হয়েছেন, তিনি ওই যন্ত্রণার কতটা বোঝেন বা উপলব্ধি করেন?  
২০১৬ থেকে ২০২৫, প্রায় এক দশক সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করার পর যদি কারও চাকরি বাতিল হয় তা প্রায় অযাচিত মৃত্যুসমান। তাঁদের এবং তাঁদের ঘিরে থাকা পরিবারের উপর তার কী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, ডিভিশন বেঞ্চের দুই বিচারপতি তা অনুধাবন করেই চাকরি বহাল রাখার ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। ঢাকি সমেত বিসর্জন দেওয়ার সস্তা রাজনৈতিক পালা লেখায় মন দেননি। এটাকে শুধুই আবেগ বলে যাঁরা ছোটো করতে চাইছেন, তাঁদের ধিক্কার। ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, চাকরি করার সময় ওই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ওঠেনি। তাঁরা যে পড়াতে ব্যর্থ এমন নালিশও জমা পড়েনি কোথাও। সন্দেহভাজন কয়েকজনের জন্য গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষতি করা যায় না। এক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থাও সেই সংগঠিত অপরাধ ও অনিয়ম চিহ্নিত করতে ব্যর্থ। শুধু তদন্ত চলছে বলে পুরো নিয়োগ বাতিল করা যায় না। বছরের পর বছর এতগুলো মানুষের ভাগ্যকে ঝুলিয়ে রাখাও নিতান্তই অন্যায়। আদালত একথা বলে ফের একবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মনে করিয়ে দিয়েছে, একের পর এক তদন্তে এদের ব্যর্থতাই দস্তুর। এক্ষেত্রে গুরুত্বটা এই কারণে যে সংখ্যাটা একজন দু’জন নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি। একসঙ্গে ২৬ ও ৩২, অর্থাৎ ৫৮ হাজার শিক্ষক চাকরিহারা হলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাটাকেই লাটে তুলে দেওয়া যাবে, ঢাকি সমেত বিসর্জনের এই ছিল ব্লুপ্রিন্ট। এক দুর্নীতির বিচার করতে বসে তার চেয়েও সুদূরপ্রসারী এক সংকটের মুখে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঠেলে দেওয়া এবং তার অভিঘাতে সরকার ফেলা যে সুবিচার হতে পারে না, সেটাই মনে করিয়ে দিয়েছে ১৪১ পাতার ডিভিশন বেঞ্চের রায়। তদন্ত শেষ না করেই শুধু চাকরি খেলে তার ফায়দা তুলবে কারা? দুর্নীতিকে গোড়া থেকে নির্মূল করা যেমন অগ্রাধিকার তেমনি তা দমনের নামে রাজনীতিতে হাওয়া দেওয়ার গোপন অপারেশনও কখনও কাম্য হতে পারে না। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধিতা সব সময় স্বাগত কিন্তু চাকরি খাওয়ার মতো নিম্ন শ্রেণির রাজনীতিতে অক্সিজেন দিয়ে সমাজ কতটা লাভবান হতে পারে? এইখানেই মহামান্য দুই বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও ঋতব্রত চক্রবর্তীকে অভিনন্দন। সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা একটা অসামান্য মানবিক রায় দিয়েছেন। তাঁদের এই রায় ভোটের কড়ি গোনার জন্য নয়, জনপ্রতিনিধি হওয়ার অভিপ্রায় থেকেও নয়। বরং আইনকে শিখণ্ডী করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতা থেকে সরানোর অন্যায় চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। 
৩২ হাজার পরিবারের অন্দরে অকাল অন্ধকার নামিয়ে আনার কুনাট্যেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছে বিচার প্রক্রিয়ারও ক্রমাগত সংশোধন প্রয়োজন, যা করেছেন মহামান্য বিচারপতিদ্বয়। দীর্ঘ রায়ে তাঁরা বলেছেন যত তার চেয়েও মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের দ্যুতি ছড়িয়েছেন বেশি। কলকাতা থেকে শুরু করে উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসই অকাট্য প্রমাণ শেষপর্যন্ত বিচার ব্যবস্থা জিতে গিয়েছে, পরাজয় হয়েছে রাজনীতির। এবং অবশ্যই সেই শকুনদের যাঁরা সমাজে অশান্তি ও রাজনৈতিক স্থায়িত্বকে ভঙ্গ করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তদন্তকারী সংস্থাই বলতে পারেনি এরা সবাই অযোগ্য! তাহলে কেন চাকরি যাবে সবার? ২৬ হাজারের চাকরি খাওয়ার ক্ষেত্রেও যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করত তাহলে শিক্ষক শিক্ষিকাদের এই সীমাহীন হেনস্তার শিকার হতে হত না। সন্তানকে কোলে নিয়ে রাজপথে শূন্যমুখে দিন কাটত না তাঁদের। যাঁরা দুর্নীতিতে যুক্ত তাঁদের শাস্তি না দিয়ে চাকরি কেড়ে নেওয়ার নাটকে যবনিকা পড়ে যেত আগেই।
প্রশ্ন একটাই, ৩২ হাজার চাকরি ফিরিয়ে দিয়ে ঢাকি সমেত কার বিসর্জন নিশ্চিত করল কলকাতা হাইকোর্টের মহামান্য ডিভিশন বেঞ্চ? কোনও ব্যক্তির, কোনও আদর্শের না কোনও অমানবিক সত্ত্বার? যিনি একডালে বেশিদিন কখনও বসেননি, সদা চঞ্চলমতি, সুযোগসন্ধানী এমন মানুষেরই কলমের এক আঁচড়ে বাতিল হয়ে গিয়েছিল ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি। যদি বলি, ওই চাকরিহারারা তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষারই অসহায় বলি, খুব অন্যায় হবে! সেই মামলাতেই বড়োসড়ো জয় পেয়ে উদ্বেলিত প্রাথমিক শিক্ষকেরা। শহর কলকাতা থেকে জেলায় জেলায় প্রত্যন্ত গ্রামে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে চাকরি বহাল রইল তাঁদের। সমাজকে নাড়া দেওয়া একের পর এক রায় দিয়ে যিনি চাকরির মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের খাতায় নাম লিখিয়ে সংসদে যাওয়ার ছাড়পত্র আদায় করেন তাঁর আগের বিচারধারা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিচারের দণ্ড তোমার হাতে, তুমি কঠোর নির্মম হাতে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু যে বিচারে মানবিকতা নেই, যেখানে ন্যায় দেওয়ার চেয়ে নির্বাচিত সরকারকে বিসর্জন দেওয়ার স্বার্থান্বেষী অভিপ্রায় ও উচ্চকিত উল্লাসই প্রকট হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মতোই বিচারও যে আরও ভয়ংকর দোষে দুষ্ট। তাঁর কাছে ন্যায় দেওয়ার চেয়ে চাকরি খেয়ে সমাজে অসন্তোষ ও অশান্তি তৈরি করাই অগ্রাধিকার। নাহলে শুধু রায়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের প্রতিপক্ষ খাড়া করে অযথা ব্যক্তিগত টিকাটিপ্পনিতে সরব হতে যাবেন কেন? কেনই বা প্রকাশ্যে বলবেন ঢাকি সমেত বিসর্জন দেওয়ার মতো অবান্তর কথা। আদালতের বাইরে একজন বিচারপতি যদি আত্মপ্রচারে মগ্ন হন এবং কেরিয়ারকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ায় মন দেন, তাও কি একই দোষে দুষ্ট নয়?
আসলে সিঙ্গল বেঞ্চের রায়ের গরিমা নষ্ট হয়ে গিয়েছে তখনই, যখন তিনি নিরপেক্ষতাকে ছুড়ে ফেলে গেরুয়া পোশাকের আহ্লাদকে বেছে নিয়েছেন সদর্পে। প্রমাণ হয়ে গিয়েছে আগাগোড়াই সিঙ্গল বেঞ্চের বিচারপতি পেশা ছেড়ে নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কেরিয়ারকে জল সার দিয়ে পুষ্ট করার কাজে সময় দিয়েছেন। এক শ্রেণির মানুষ তাঁর বিচার ধারায় আকৃষ্ট হয়ে একদা এক-একটি রায় দেখে তাঁকে ভগবান ঠাওরেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন বিচারপতির পবিত্র পোশাকটা ফেলে দিয়ে লোভাতুর চোখে রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ কারেছিলেন, তখনই সব ভক্তি উবে গিয়েছিল। আর মহামান্য ডিভিশন বেঞ্চ যখন তদন্ত চালিয়ে যাওয়ায় সায় দিলেও প্রায় একদশক ধরে চাকরি করা ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষিকার চাকরি খাওয়াকে রুখে দিয়ে মানবিকতার জয় ঘোষণা করলেন, তখন ভিলেন হলেন কে? কলমের একটা খোঁচায় ৩২ হাজার চাকরি খেয়ে দেওয়া খুব সহজ কাজ। কিন্তু ওই ৩২ হাজারের উপর যে লক্ষাধিক বৃদ্ধ বাবা-মা, সন্তান সন্ততি, এককথায় সংসার নির্ভরশীল, সেটাও তো আদালতের দেখা উচিত। এই কারণেই গোটা বাঙালি সমাজের পক্ষ থেকে মহামান্য বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীকে প্রণাম ও অভিনন্দন। সামান্য প্রাথমিক শিক্ষকদের ভাত না কেড়ে তিনি তাঁদের মুখে হাসি ফোটানোয় জোর দিয়েছেন। ওই শিক্ষকদের মধ্যে কে তৃণমূল, কে বিজেপি, কে বাম তার হিসেব না করে বাস্তব মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুরো বিষয়টিকে দেখতে চেয়েছেন। 
সবাই জানি ভোট বড়ো বালাই। কিন্তু চাকরি খেয়ে রাজনীতির ময়দানে ভেসে থাকার বালাইয়ের মৃত্যু হোক! দয়া করে আর কেউ আদালতে চাকরি খাওয়ার সওয়াল করে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখা থেকে বিরত থাকুন। ওদের শান্তিতে শিক্ষকতা করতে দিন। এইখানেই ঢাকি সমেত বিসর্জনের হুংকারেরও মৃত্যু। যা আরও স্পষ্ট হবে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের পর। একটা ইশ্যুর তলায় আগেরটা চাপা পড়ে যায়। যেমন এই মুহূর্তে গত পাঁচ বছরের সবকিছু চাপা পড়ে একমাত্র জ্বলন্ত সমস্যা এসআইআর। তাও মৃত সঞ্জীবনীর মতো বহুধা বিভক্ত বঙ্গ বিজেপিকে কোরামিন দিয়ে জাগাতে পারবে কি না কে জানে! হিন্দু -মুসলিম নয়, শাসক বিরোধীও নয়, ভোটে জিতে ক্ষমতা দখলও নয়, আম পাবলিক একটা সম্মানজনক শর্তে একটা কাজ চায় বেঁচেবর্তে থাকতে। অযথা রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে সেই পরিসরটাকে কেড়ে নেবেন না। বিচারপতির সত্ত্বাকে ছাপিয়ে এই কাজটাই করেছে ডিভিশন বেঞ্চের দুই মহামান্য সম্রাট। তাঁদের কুর্নিশ জানাই। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ