Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিএলওদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কেন?

এখন যখন সাইবার অপরাধ নিয়ে খোদ পুলিশই হিমশিম খাচ্ছে তখন অন্য পেশার ৮১ হাজার বিএলও’র মোবাইল নম্বর গোটা পৃথিবীর সামনে প্রকাশ করে দেওয়ার অর্থ কী?

বিএলওদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কেন?
  • ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: হিটলার বলেছিলেন, মানুষকে এতটাই বিপদের মধ্যে রাখো যে বেঁচে থাকাটাই তার কাছে উন্নয়ন বলে মালুম হয়! দুনিয়াজুড়ে শাসকের এক রা! বিনা পয়সায় যখন চাল দিচ্ছি, তখন প্রাণের উপরও আমার ষোলোআনা অধিকার। ব্যাপারটা এমন, আহার দিয়েছেন যখন মুণ্ডুর উপরও তাঁরই দখলদারি! শুধু ভোটাররা নন, বেচারা বিএলওরাও এই জাঁতাকলে পড়ে এখন কুল রাখেন না শ্যাম! কাজে ফাঁকি দিলেই চাকরি থেকে সাসপেন্ড। আবার রাতবিরেতের নানা আবদার অজুহাতের নিশিডাকা ফোনে তাঁদের রক্তচাপ, বুকের কোণে দমকা ব্যথা চাগাড় দেওয়া খুব অসম্ভব নয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের ফসকা গেরোয় কেউ হাসপাতালে, কেউ অন্তিম শয্যায়। যে যায়, সে যায়। স্বজনহারা পরিবারের খোঁজ কে রাখে? সবাই ছুটছে ক্ষমতা দখলের নেশায় মত্ত হয়ে। নিরীহ বিএলওদের প্রাণ যাচ্ছে। এ জগতে সাধারণেরই শুধু কোনও রক্ষাকবচ নেই, তাঁরা যুগে যুগে বিপন্ন। এর মধ্যেও যদি আপনার শ্বাস চলে, সেটাই তো কেন্দ্রের উন্নয়ন। মোদিজি মেহেরবান! এমপি এমএলএদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির বিল পাশ হয় চোখের পলক পড়ারও আগে!

Advertisement

যে কোনও নির্বাচিত সরকারের একটাই লক্ষ্য, নানা অজুহাতে মানুষকে জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত রেখে বেকারত্ব, দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং নোট বাতিলের নামে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের আখ্যানের উপর পর্দা টেনে ধরা। মন্দির মসজিদ নিয়ে হানাহানি, মানুষে মানুষে বিভাজন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ আরও দু’শো কুনাট্য থেকে দৃষ্টিটা ঘুরিয়ে ভোটার তালিকায় শুধু নামটা বাঁচিয়ে রাখার আড়ালে যে নাটকটা মঞ্চস্থ হচ্ছে তারসঙ্গে রুটিরুজির যোগ নেই, নেই জীবনধারণের কোনও সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও। তবুও এটাই আজ বঙ্গবাসীর অকৃত্রিম অস্তিত্বের লড়াই। আর 
২৪০ ঘণ্টা পরে যে খসড়া তালিকাটা প্রকাশিত হবে, সেখানে নাম না থাকলেই যেন জীবন অঙ্কে অন্ধকার যবনিকা! পঁচিশ বছর সরকারি চাকরি করা পেনশনভোগী বৃদ্ধের নাম ছিল না ২০০২ সালের তালিকায়। মা বাবা গত হয়েছেন, কোনও 
আত্মীয়ও নেই। দেখলাম তিনিও আতঙ্কে জনে জনে জিজ্ঞাসা করে বেড়াচ্ছেন, খসড়া তালিকায় নামটা থাকবে তো? বললাম, আপনি তো পেনশন 
পাচ্ছেন, ভয় কী পিপিওটা দেখাবেন? কে শোনে কার কথা! সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ডুবে গেলে, বিভ্রান্ত হলে মুণ্ডুটা বাঁচাতে শাসকের অনুগত হওয়ার চেষ্টা করে। এই গোটা প্রক্রিয়াটাই তাই অবাধ্য জনগণকে সবক শেখানোর আয়োজন না তো! নামটা বাদ গেলেই আপনি অনুপ্রবেশকারী। দলবদলু নেতা থেকে দেশের মহামান্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খাতায় স্রেফ ঘুসপেটিয়া! পরিণতি? যোগীজি উত্তরপ্রদেশে ডিটেনশন ক্যাম্প রেডি করতে বলেছেন। অযোধ্যার মন্দিরের মাথায় গেরুয়া পতাকা শোভা পাচ্ছে। হিন্দুরাষ্ট্রের অভিযাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে। যোগীজির আর তর সইছে না। এনকাউন্টারেও যাদের এখনও খতম করা যায়নি, তাদের চালান করো ক্যাম্পে। উত্তরপ্রদেশে পরের বিধানসভা ভোট ২০২৭ সালে। বিরোধী নিকেশের তাই এত বিরাট আয়োজন। পিছিয়ে নেই গুজরাত ও মধ্যপ্রদেশও, সেখানে নির্বাচন আগামী ২০২৮ সালে।
আমাদের বাংলায় ভোট শিয়রে। তার মধ্যেই গত একমাস ধরে ৮১ হাজার রাজ্য সরকারি কর্মচারি ইনিউমারেশন ফর্ম নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন। 
রাত জাগছেন। হেনস্তা হচ্ছেন। সবমিলিয়ে ভোটের আগেই একটা চাপা আতঙ্ক চেপে বসেছে নির্বাচকদের মনে। জেলায় জেলায় ফর্ম জমা ও তা বিএলওরা ঠিকমতো আপলোড করছেন কি না, তা নিয়ে ব্যস্ততা তুঙ্গে। কোনও তথ্য বাদ গেল, ম্যাপিংয়ে ত্রুটি থাকলে সব ব্যাটাকে ছেড়ে দিয়ে বিএলও 
ব্যাটাকে ধর! আচ্ছা বলুন তো, আজ থেকে কুড়ি- বাইশ বছর আগে যখন এই প্রক্রিয়া চলেছিল তখন ফর্মের উপর বিএলওদের ফোন নম্বর দেওয়া ছিল? সংগত কারণেই তাঁদের প্রাইভেসির কথা ভেবে তা করা হয়নি। আর বর্তমানে যখন সাইবার অপরাধ নিয়ে খোদ পুলিশই হিমশিম খাচ্ছে, তখন অন্য পেশার ৮১ হাজার বিএলও’র মোবাইল নম্বর গোটা পৃথিবীর সামনে প্রকাশ করে দেওয়ার অর্থ কী? কারও অনুমতি ছাড়া এই কাজ করা যায়? ওই 
ফোনের সংযোগ তো নির্বাচন কমিশন দেয়নি। তার রিচার্জও কমিশনের খরচে হয়নি। তাহলে এই তামাশা কেন? ইতিমধ্যেই বহু মহিলা বিএলওকে ফোনে হুমকি, ভয় দেখানো শুরু হয়ে গিয়েছে। বিএলও পিছু কেন্দ্রীয় বাহিনীর দু’জন করে জওয়ান দেওয়ার দাবি কি খুব অন্যায্য? যদি গেরুয়া 
শিবিরে যোগ দিলেই কোনও সরকারি পদ ছাড়া নিরাপত্তার বহর বেড়ে যায়, ওয়াই-জেড নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়ে যায়, তাহলে বিএলওরা কী দোষ করল? আসলে কোনও রকম পরিকল্পনা না করেই গোটা কাজটায় হাত দেওয়া হয়েছে। তার ফলই ভুগতে হচ্ছে নিরীহ বিএলওদের। তাঁরা কেউ কমিশনের কর্মী নন। কেউ শিক্ষকতা করেন, কেউ আবার অন্য কাজ। গালভরা নির্বাচন কমিশনার কোথায়, তাঁর ফোন নম্বর তো কোথাও দেওয়া নেই! বাংলা সহ দেশের ১২ রাজ্যে এই বিএলওরাই কমিশনের মুখ। তাই আপাতত জ্ঞানেশ কুমারও নন, রাজ্যের সিইও মনোজ আগরওয়ালও নন, এই বিএলওদেরই পোয়াতে হচ্ছে ঝড়ঝাপটা। অথচ পুরোনো তালিকা মেনেই চব্বিশ সালে একের পর এক রাজ্যে জিতে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন নরেন্দ্র মোদি। এখন দলবদলু বিজেপি নেতাই উঠতে বসতে শুধু এরাজ্যেই সওয়া কোটি নাম বাদ যাবে বলে সকাল বিকেল হাঁকছেন। পুরো ভোটার তালিকাটাই যদি ভুলে ভরা, তাহলে চব্বিশে মোদিজির ঐতিহাসিক জিতে আসাটাও কি সম্পূর্ণ বেআইনি ছিল?
একটা কথা মানি, সর্বভারতীয় দলের গোপন এজেন্ডা থাকতেই পারে যেনতেন শ্যামাপ্রসাদের বাংলা দখল করতেই হবে। শুধু দল বললে ভুল হবে, এটা দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার দাবিদার বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হৃদয়েরও সুপ্ত বাসনা। আরএসএসের অনুশাসন ভেঙে ৭৫ বছর পেরিয়েও তাঁর ক্ষমতায় থাকার এই যাত্রায় যে দু’টি লক্ষ্য পূরণ হতে বাকি, তারমধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অন্যতম অবশ্যই বঙ্গবিজয়। সেটা স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন তার জবাব দেবে জনগণ, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে। কিন্তু তাহলে ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে বলে বিএলও নামক এই নয়া সম্প্রদায়ের জীবন দুর্বিষহ করা কোন আক্কেলে? নির্বাচন কমিশন জানে, কাজটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ৩৪, ৪০, ৫০ লাখ— যত নামই বাদ যাক, এরাজ্যে গেরুয়া শিবিরের ক্ষমতায় আসা যে এখনও কষ্টকল্পিত আখ্যান! এটা অমিত শাহদের মোটেই অজানা নয়।
আগেও এসআইআর হয়েছে। নাম বাদ গিয়েছে, সংশোধিত হয়েছে। ১৯৫১ থেকে ২০০২ পর্যন্ত বারেবারে। কিন্তু একটা অঙ্গরাজ্যের ভোটের ভাগ্যকে এভাবে নতুন ভোটার তালিকার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার সাহস কেউ দেখায়নি। আর এখন আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কেষ্টবিষ্টু হাফ নেতা, কাউন্সিলারের দালাল, বিধায়ক এমপি যাঁর সঙ্গেই দু’দণ্ড কথা বলুন না কেন উত্তর একটাই, তালিকাটা বের হোক, দেখি ঠিক কত নাম বাদ গেল! পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। আর বিজেপি তাকিয়ে আছে, সংখ্যালঘুদের নাম কত কাটা পড়ল তা দেখতে। সংগঠন চাই না, প্রার্থী তৈরি কি না তার হিসেব কষার প্রয়োজন নেই। এক কোটি নাম কাটতে পারলেই কাজ শেষ। পালটা শাসক তৃণমূলের ধনুর্ভাঙা পণ, একজনও ন্যায্য ভোটারের নাম কাটতে দেব না। রাজ্যের উন্নয়ন, পেটের ভাত, দুর্নীতি, চাকরিবাকরি সব ছাপিয়ে একটাই ইশ্যু, ৯ ডিসেম্বর খসড়া তালিকাটা দেখি! শেষ এসআইআরে বাংলায় বাদ পড়ে ২৯ লক্ষ ভোটারের নাম। তখন মোট ভোটার সংখ্যা ছিল সাড়ে ৪ কোটির মতো। বুথ ও বিএলও সংখ্যাও ছিল প্রায় অর্ধেক। এখন মোট ভোটার ৭ কোটি ৬০ লক্ষ। গত লোকসভা ভোটে তৃণমূল পেয়েছিল ২৯টি আসন আর বিজেপি ১২টি। কিন্তু মোট ভোটের ফারাক ছিল ৪২ লক্ষ। ভোট পড়েছিল ৬ কোটি ৪৮ লক্ষ। এসআই আর করে ওই ৪২ লক্ষ ভোটের ফারাক কি ঘুচবে? তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে মে মাসের জন্য। মাত্র এক মাসে অন্য পেশায় কর্মরত পুরুষ ও মহিলাদের উপর এতটা কাজের টার্গেট বেঁধে দিয়ে এই আহ্লাদের অর্থ কী? বলতেই পারেন, চতুর্থবার জিতে আসা নিশ্চিত করতেই নাকি তৃণমূল এসআইআরের বিরোধী। 
এবং সেই জন্যই বিএলওদের দিয়ে তাঁরা বিক্ষোভ করাচ্ছেন। কিন্তু এই লেখা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে সর্বভারতীয় পরিসংখ্যান আমাদের হাতে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, কাজের চাপে-আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে বিএলও মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ কিন্তু ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যেই। সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী এই তালিকায় শীর্ষে মধ্যপ্রদেশ। তারপর যোগীরাজ্য উত্তরপ্রদেশ এবং মোদিরাজ্য গুজরাত। কিন্তু ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যে ভোট শিয়রে নয়। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলি এক বছর সময় পাবে গুছিয়ে নিতে। তাহলে কেন জেনেবুঝে বাংলাকে একটা অনিশ্চিয়তার মুখে ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা? বাংলায় বিজেপি সরকার নেই বলে? কেন্দ্রের টাকা বন্ধ, একশো দিনের কাজ তিন বছর প্রায় স্থগিত রাখার পর সুপ্রিম কোর্টের গুঁতোয় মন্ত্রী ফাইলে সই করেছেন বলে খবর। বাস্তবে কবে আবার টাকা প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছবে কেউ জানে না! সব দিক দিয়ে বাংলায় একটা সামাজিক অশান্তি এবং বিভ্রান্তি তৈরি করাই লক্ষ্য। এর একটাই কারণ বাংলার মানুষ বিজেপির তালে তাল দেয় না। পরিণতি শাস্তি, পরিণতি বঞ্চনা।
আসলে বিজেপির হিসেব ছিল, সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বলছি, তা করতে গিয়ে সংখ্যালঘু ভোটকে যেমন আরও তৃণমূলের দিকে সুসংহত করা হয়েছে তেমনি সাধারণ ভোটার, বিএলও এবং আদিবাসী, এসসি, এসটি সমাজকেও খেপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৯ ডিসেম্বরের পর এই বিরক্তি এবং রাগ আরও চরমে পৌঁছোবে। শুধু ঘুসপেটিয়া বলে গাল দিলে সেই ক্ষোভ প্রশমিত হওয়া কঠিন। তাই কোনও তৃণমূল নেতা নন, স্বয়ং রাজ্য বিজেপি সভাপতিকে বলতে শুনলাম, জ্ঞানেশজি দিল্লিতে বসে ফতোয়া দেওয়া ছাড়ুন। একবার পশ্চিমবঙ্গে এসে কথা বলুন। হয়তো তিনি আসবেনও, কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে। রাজ্যের মানুষকে আঘাত করে, হেনস্তা করে কোনওদিন ক্ষমতা দখল করা যায় কি না, শমীকবাবুদের তা ভেবে দেখতে বলব।
ক্ষমতা দখলের দৌড়ে নেতাদের ঢং বদলায়, রং বদলায়। আর সাধারণ মানুষ হিমশিম খেতে খেতে তলিয়ে যায় অন্ধকারে!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ