Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ট্রাম্পের টার্গেট ভেনেজুয়েলার তেল

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক গুরু ছিলেন রয় কোহন। কুখ্যাত সিনেটর জো ম্যাকার্থির উপদেষ্টা।

ট্রাম্পের টার্গেট ভেনেজুয়েলার তেল
  • ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক গুরু ছিলেন রয় কোহন। কুখ্যাত সিনেটর জো ম্যাকার্থির উপদেষ্টা। কোহন ১৯৫০-এর দশকে দুনিয়াজুড়ে কমিউনিস্টবিরোধী উইচহান্ট চালিয়েছিলেন। তিনি ট্রাম্পকে শিখিয়েছিলেন ‘সাপ’ হতে, ‘দুষ্কৃতী’দের মতো হতে, একেবারে নতুন ধরনের নির্দয় মানুষ হয়ে উঠতে। কোহনের বিরুদ্ধে একের পর এক শেয়ার জালিয়াতি, বিচারব্যবস্থায় বাধা, মিথ্যা সাক্ষ্য, ঘুষ, ষড়যন্ত্র, তোলাবাজি, ব্ল্যাকমেলের অভিযোগ ছিল। ট্রাম্পের মতো তিনিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পার পেয়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত অতীতই তাঁকে ধরে ফেলে। আসলে ট্রাম্পের কাছে আদর্শ মিত্র সেই ব্যক্তি, যিনি তাঁর মতোই অভিযুক্ত অপরাধী। যিনি সব অস্বীকার করেন— দুর্নীতি, হত্যা, যুদ্ধাপরাধ। যেমন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেতানিয়াহু। সংবাদসংস্থা ‘মিডল ইস্ট আই’-এ এই ভাষায় লিখেছেন সাংবাদিক জো গিল। শিরোনাম: মাদুরোকে তুলে নিয়ে গিয়ে শান্তির নামে যুদ্ধে মাতলেন ট্রাম্প!

Advertisement

আসলে নতুন বছরের শুরুই হয়েছে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধ দিয়ে। ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে (স্থানীয় সময় রাত ২টো নাগাদ) ভেন‌েজুয়েলায় আক্রমণ শানায় আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স। ওই সময় রাজধানী কারাকাসে ঢুকে প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন সেনা। এই সামরিক অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’। বিগত কয়েক দশকে বিশ্ব ইতিহাসে এমন ঘটনা যে বেনজির, তা বলাই বাহুল্য। ট্রাম্পের দাবি, মাদুরো নাকি ভেনেজুয়েলার দুই অপরাধী গোষ্ঠী, ড্রাগ কার্টেল ট্রেন দে আরাগুয়া ও কার্টেল দে লস সোলেসের সঙ্গে যুক্ত। ট্রেন দে আরাগুয়া কারা? এরা ভেনেজুয়েলার আরাগুয়ার জেলে তৈরি একটা গ্যাং— যারা ড্রাগ, মানুষ পাচার, খুন ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত। ট্রাম্প এবারের ইলেকশনের আগে থেকেই এদের ভীতি আমেরিকান জনমানসে ছড়িয়েছে। গোটা আমেরিকায় নাকি এরা জাল ছড়িয়ে ফেলেছে। ওরা নাকি চলে ভেনেজুয়েলার সরকারের কথায়। এই প্রচার চালিয়ে আমেরিকার সব জায়গা থেকে উদ্বাস্তু তাড়ানোর দাবি তুলেছিলেন ট্রাম্প।
অথচ, মার্কিন প্রশাসনের নিজস্ব নথি বলছে, মাদুরোর সঙ্গে ট্রেন দে আরাগুয়া ও কার্টেল দে লস সোলেসের কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। ২০২৫-এর ৭ এপ্রিল প্রকাশিত ন্যাশনাল ইন্টালিজেন্স কাউন্সিলের নথি ODNI on 5/5/2025, Case No. DF-2025-00379 বলছে, আমেরিকায় অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত কিংবা অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশের জন্য আটক করা হয়েছিল— এমন কিছু ব্যক্তির বয়ানের ভিত্তিতে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে মাদুরো সরকারকে। ওই নথিতে এটাও লেখা রয়েছে, অভিযুক্তরা তাদের অপরাধের দায় এড়াতে এবং শাস্তি কমানোর প্রচেষ্টায় ভেনিজুয়েলার শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ড্রাগ কার্টেলের সম্পর্ক নিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী, গোটা লাতিন আমেরিকায় ড্রাগ ব্যবসা ছড়িয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। গোটা লাতিন আমেরিকা জুড়ে তাঁবেদার ডিক্টেটরদের বসানোর খরচ তুলতে ড্রাগ চোরাচালান করেছে ওই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাই। এমন অভিযোগে কালিমালিপ্ত সিআইএ-এর ইতিহাস। তারাই আবার ড্রাগ কার্টেলের অজুহাত তুলে একটা গণতান্ত্রিক দেশের প্রেসিডেন্টের উপর হামলা চালায় কী করে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের হামলা আসলে আমেরিকার নয়া জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের প্রতিফলন। এই নথি প্রকাশিত হয়েছে গত নভেম্বরে। এতে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে মার্কিন সাম্রাজ্যের জন্য এক নগ্ন জাতীয়তাবাদী ও নব্য-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে। ওই নথি কার্যত বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পশ্চিমি ঐক্যের যুগের অবসানকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়। যেখানে বলা হয়েছে, পশ্চিম ইউরোপ আর আমেরিকার ঐতিহাসিক মিত্র নয়। বরং এখন একটি ‘সমস্যাপূর্ণ অঞ্চল’। ইউরোপের বর্তমান পথের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ’ গড়ে তুলে সেখানে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করবে। নথিতে সতর্ক করা হয়েছে, অভিবাসনের কারণে ইউরোপ ‘সভ্যতাগত বিলুপ্তির’ মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্প ঘটা করে নাম রেখেছেন, ‘ডনরো ডকট্রিন’। এটি তাঁর নিজের নাম এবং মনরো ডকট্রিনের একটি অস্বস্তিকর সংমিশ্রণ। এই নীতি আমেরিকাকে আবার ফিরিয়ে নিতে চায় গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে। সেই সময়, লাতিন আমেরিকা ছিল ওয়াশিংটনের উঠোন। কিউবা থেকে চিলি পর্যন্ত, কর্তৃত্ববাদী ও মার্কিনপন্থী সরকারকে সমর্থন দিয়ে তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রেখেছিল। নথিতে স্পষ্ট লেখা আছে—‘আমরা মনরো নীতির উপর ‘ট্রাম্প করোলারি’ কার্যকর করব।’ মনরো ডকট্রিন হল, ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত ‘আমেরিকানদের জন্য আমেরিকা’ নীতি, যা পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের বৈধতা দিতে ব্যবহৃত হয়। প্রয়োজনে কেবল আইনশৃঙ্খলা নয়, মারাত্মক শক্তি প্রয়োগ করা। এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে মার্কিন প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ করা। ঠিক যেমন ঘটেছে ভেনেজুয়েলায়। ‘দ্য গার্ডিয়ান’ লিখেছে, ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’। ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন চালিয়ে পুরোনো রূপে ফিরছে আমেরিকা!
বছর কয়েক ধরেই লাতিন আমেরিকাজুড়ে আমেরিকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে কট্টর ডানপন্থী নেতারা ক্ষমতায় আসছেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এল সালভাদরে এই ধারা শুরু হয়। পরে আর্জেন্তিনা, বলিভিয়া, ইকুয়েডর আর সাম্প্রতিক সময়ে চিলি ও হন্ডুরাসেও সেই স্রোত দেখা গিয়েছে। এতে লাতিন আমেরিকায় তৈরি হয়েছে ট্রাম্পপন্থী সরকারের এক লম্বা লাইন। তবু অঞ্চলটির দুই বড় শক্তি— ব্রাজিল ও মেক্সিকো এখনও গণতান্ত্রিক বামপন্থী সরকারের হাতেই রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে কিউবা, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়ার মতো কিছু দেশ। ফলে ট্রাম্পের টার্গেট এই দেশগুলিই।
ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি ভেনেজুয়েলা থেকে ‘তেল ফিরিয়ে নিতে’ চান। অথচ, দেশটি বহু দশক আগে তার বিপুল তেলসম্পদ জাতীয়করণ করেছিল। হুগো সাভেজের আমলে সেই সম্পদের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় হয়। তখন থেকেই ভেনেজুয়েলা আমেরিকার নজরে পড়ে। এর ফল— তেল রপ্তানির উপর একের পর এক ধ্বংসাত্মক নিষেধাজ্ঞা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি ক্ষেত্রের অন্যতম প্রভাবশালী সাময়িকী ‘অয়েল অ্যান্ড গ্যাস জার্নাল’ বলছে, ২০২৩ সালের হিসোব অনুযায়ী ভেনেজুয়েলার মজুত তেলের পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির জোট ওপেকের ‍তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট মজুত তেলের প্রায় ২০ শতাংশের মালিক ভেনেজুয়েলা। অর্থাৎ, বিশ্বব্যাপী মোট মজুত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই রয়েছে ভেনেজুয়েলার মাটির নীচে। আর মজুতের দিক থেকে নবম স্থানে থাকা আমেরিকার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি তেল আছে ভেনেজুয়েলার হাতে। 
ভেনেজুয়েলার নেতা মাদুরো অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করছিলেন, তাঁর দেশের তেলসম্পদ দখল করতে চায় আমেরিকা। আর এই কারণেই ওয়াশিংটন নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে। কেমন সেই অজুহাত? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের দাবি, ভেনেজুয়েলা থেকে আমেরিকায় মাদক ও অস্ত্র পাচার করা হচ্ছে। গ্যাং পাঠানো হচ্ছে। এসবের হোতা স্বয়ং মাদুরো। তিনি আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছেন। মাদুরো শুধু আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক হুমকিই নন, তিনি নিজ দেশের জনগণের জন্যও একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি। মাদুরো একজন অবৈধ প্রেসিডেন্ট। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। তারই পরিণতিতে, ট্রাম্পের নির্দেশে আকস্মিকভাবে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’ নামে অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। তারা নাটকীয়ভাবে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে সেফ হোম থেকে তুলে আমেরিকায় নিয়ে যায়। অভিযান শেষে একই দিনে ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ নেবে আমেরিকা। ট্রাম্পের এই ঘোষণায় স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি কেন, কোন উদ্দেশ্যে ভেনেজুয়েলাকে নিশানা করেছেন। ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে এত দিন ট্রাম্প মাদকবিরোধী যুদ্ধের কথা ও গ্যাংয়ের কথা বলে এলেও এই সাংবাদিক সম্মেলনে এসব বিষয় খুব কমই গুরুত্ব পায়। সাংবাদিক সম্মেলনে ভেনেজুয়েলা নিয়ে ট্রাম্পের ‘আসল পরিকল্পনা’ প্রকাশ্যে চলে আসে। আর তা হল, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখলের নীলনকশা!
আমেরিকার কেন ভেনেজুয়েলার তেল দরকার, তার ব্যাখ্যা মেলে স্কাই নিউজের এক এক্সপ্লেইনারে। ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি এত আগ্রহী’ শীর্ষক এই এক্সপ্লেইনারে বলা হয়, আমেরিকা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক। কিন্তু তারা মূলত হালকা অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। তাই ভারী অপরিশোধিত তেলের চাহিদা আমদানির মাধ্যমে মেটায় আমেরিকা। আর এ ক্ষেত্রেই আমেরিকার কাছে ভেনেজুয়েলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভেনেজুয়েলা ভারি অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। তাছাড়া আমেরিকার বেশিরভাগ পরিশোধনাগার ভেনেজুয়েলার ভারী তেল প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্মিত। ভৌগোলিক অবস্থান, তুলনামূলক সস্তা দাম, কম পরিবহণ খরচ, দ্রুত সরবরাহসহ নানা দিক বিবেচনায় ভেনেজুয়েলা থেকে আমেরিকায় তেল আনাটা বেশি সুবিধাজনকও। এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ ট্রাম্প!
নিউ ইয়র্ক টাইমস পর্যন্ত স্বীকার করেছে, ট্রাম্প-প্রশাসনের কর্তারা জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ‍্য আসলে জমানা-বদল! ‘মাদক’ এখন ওয়াশিংটনের কাছে নতুন ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’! কে না জানে, আমেরিকার জন্য মিত্র এবং শত্রুর সংজ্ঞা সাময়িক এবং স্বার্থভিত্তিক। এই দুনিয়ার যে নেতা আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে যান, যেভাবেই হোক তাঁকে সরাতে দ্বিধা করে না ওয়াশিংটন। তখন আন্তর্জাতিক আইন, গণতন্ত্রের বুলি থাকে মার্কিনীদের জুতোর ডগায়!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ