অনেক কিছু দূর হয়, অবসান হয় না কেবল গরিব মারা নীতির। যথারীতি শ্রীবৃদ্ধি হয় বৈষম্যের। নরেন্দ্র মোদির জমানায় দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির নিট লাভের অঙ্ক ৩ লক্ষ কোটি টাকার অধিক। কিন্তু সেটাই আসল ছবি নয়, গত ১১ বছরে ব্যাংকগুলির কার্যকরী মুনাফার অঙ্ক আসলে প্রায় ২১ লক্ষ কোটি টাকা। তা থেকে ১৮ লক্ষ কোটি টাকা সরানো হয়েছে অনাদায়ী ঋণের ‘ক্ষতি’ চাপা দিতে। কিছু কর্পোরেট সংস্থা বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েও শোধ করেনি, তাদের দায় মকুব করে দিতে হয়েছে ব্যাংকগুলিকে। আর সেই ‘খয়রাতি’ সামাল দিতেই সরিয়ে রাখা হয়েছে ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ। অর্থনীতির ভাষায় নন পারফর্মিং অ্যাসেট (এনপিএ) বা অনুৎপাদক সম্পদের পাহাড়চূড়াকে নীচু করে দেখাতেই এই কৌশল। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকের লাভের ঘর থেকে বস্তুত ‘হাপিস’ করে দেওয়া হয়েছে ১৮ লক্ষ কোটি টাকা। স্বভাবতই ব্যাংকগুলির মোট লাভের ছবিটা হয়ে গিয়েছে যার পর নাই অনুজ্জ্বল। তালিকাভুক্ত বহু নামী কোম্পানি বিপুল টাকা ধার নিয়েও পরিশোধ করেছে নামমাত্র! আর বাকিটা মকুব করতে বাধ্য হয়েছে ব্যাংকগুলি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোদি জমানায় কিছু বড়ো মাপের ঋণ খেলাপিরা কার্যত লাই পেয়ে গিয়েছে। আর তাদের এই প্রশ্রয় একবার-দুবার নয়, দেওয়া হয়েছে বারবার!
সংশ্লিষ্ট মহল এজন্য কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির দিকেই অভিযোগের তর্জনী তুলেছে। কারণ তাদের বিশেষ ‘বন্ধু’ বলে পরিচিত কিছু রাঘববোয়াল মার্কা শিল্পপতিই এই ‘হরিলুটের বাতাসা’ কুড়িয়েছে সবচেয়ে বেশি। সম্মিলিত অর্থাঙ্কের দিকে তাকালে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ারই জোগাড় হয়—১৮ লক্ষ কোটি টাকা। না-হলে ব্যাঙ্কগুলির লাভের ঘরে থাকত আরও সাতগুণ বেশি অর্থ। ভাবা যায়, তেলা মাথায় তেল দিতে এই পাহাড় পরিমাণ অর্থ মকুব করে দেওয়া হয়েছে। অথচ গরিব মানুষকে বিনামূল্যে, এমনকি ভরতুকি মূল্যেও রেশনে চাল-গম বণ্টনের ঘোর বিরোধী গেরুয়া অর্থনীতিকরা। গরিব মহিলাদের জন্য লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সরাসরি নগদ হস্তান্তর সরকারি প্রকল্পকেও তাঁরা কটাক্ষ করেন। (যদিও একের পর এক রাজ্যে সরকার তৈরি করতে কিংবা টিকিয়ে রাখতে মোদির পার্টি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মানবিক প্রকল্পটিকে হুবহু টুকে মেরেছে।) গ্রাম ভারতের দুর্বিষহ দারিদ্র্য দূরীকরণে একশো দিনের কাজের নিশ্চয়তা প্রকল্প (মনরেগা) স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে ফলপ্রসূ একটি পদক্ষেপ। ‘খয়রাতি-বিরোধী’ মোদি সরকার এই প্রকল্পে দিনে দিনে কোপ মারছে। বাংলাকে তো এই প্রকল্প থেকে দূরেই রেখেছে দিল্লি। এনডিএ জমানায় সার, বীজ এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণের উপর থেকেও ভরতুকি ছেঁটে দেওয়া হয়েছে নির্বিচারে। গৃহস্থ যে বিদ্যুৎ ও রান্নার গ্যাস ব্যবহার করে তাও কিনতে হয় অগ্নিমূল্যে। ওষুধের দাম লাগামছাড়া। চিকিৎসা পরিষেবা সার্বিকভাবেই সাধারণের নাগালের বাইরে। স্কুলশিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা—সবটাই দামি পণ্যে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা মৌলিক অধিকার হলেও তা প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। এই অধিকার ঘরে ঘরে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষখাতে বাজেট বৃদ্ধি জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ও এশিয়ার উন্নত দেশগুলি শিক্ষাখাতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে তার সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে গেলে মহান ভারতের লজ্জাই বাড়বে কেবল। সেই লজ্জার হাত বাঁচিয়েও এনইপি ২০২০ প্রসঙ্গ তোলাই যায়। কেননা, মোদি সরকারই এই জাতীয় শিক্ষানীতি তৈরি করেছে। সেখানে শিক্ষাখাতে যে অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাজেট এখনও তার চেয়ে অনেক নীচে।
পছন্দের কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে ‘পাইয়ে দেওয়া’র বন্দোবস্তই পাকা করেছে মোদি সরকার। এই কাণ্ড কোনও একটি বছর হয়নি, বারবার বা প্রতিবছর ঘটেছে। তোষণের এই নিন্দনীয় ব্যবস্থাকে ধিক্কার জানাই আমরা। একে যদি গরিব মারা নীতি বলা না-হয় আর কাকে গরিব মারা নীতি বলব আমরা? এইভাবে দেশলুণ্ঠনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেননি দেশবাসীরা। তাঁরা সরকার তৈরি করেছেন এই প্রত্যাশা নিয়ে যে, দেশ দ্রুত এগোবে। দেশগঠনে অগ্রাধিকার পাবে গরিব এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির উন্নয়ন। ধীরে ধীরে কমবে বৈষম্য—সব সমস্যা, সংকটের যে জননী। কিন্তু এমন লুটমার নীতি দেশকে কখনোই ‘অমৃতকালে’ পৌঁছে দিতে পারবে না। একথা হল করেই বলে দেওয়া যায়।