পশ্চিমবঙ্গ একটি সীমান্ত রাজ্য। শুধু তাই নয়, প্রায় আট দশক আগে স্বাধীনতার জন্য যে-দুটি রাজ্য বলিপ্রদত্ত হয়েছিল, তারই একটি বাংলা। আরও লক্ষণীয় যে, ১৯৪৭ সালে বাংলার অঙ্গচ্ছেদেই বাঙালির ভাগ্য স্থায়ীভাবে নির্ধারিত হয়নি। ওই ঐতিহাসিক ভুলের আড়াই দশক পূর্তির আগেই দ্বিখণ্ডিত হয় পাকিস্তান। জিন্না সাহেবের সাধের মুসলিম রাষ্ট্রের ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামক প্রদেশটি আসলে অবিভক্ত ভারতের ‘পূর্ববঙ্গ’। ইসলামের জিগিরকে ‘অন্যায্য’ প্রমাণিত করে সেখানে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এহেন ভূখণ্ডটি পাকিস্তানের খপ্পর থেকে বেরিয়ে এসেও ধর্মনিরপেক্ষ, গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণের হয়ে উঠতে পারেনি আজও। পাকিস্তানের নষ্টামির সৌজন্যে ওপার বাংলায় অশান্তি বিশৃঙ্খলা নৈরাজ্য আজও সঙ্গী। হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু শ্রেণির মানুষ তো বটেই, শান্তিপ্রিয় মুসলমান নরনারীরাও ভালো নেই ওদেশে। অসংখ্য মানুষের এই ভালো-না-থাকার পরিস্থিতির দায় অংশত বহন করতে হয়েছে ভারতকে, তাও একবার নয়, বারবার। ওপার বাংলার কিছু মানুষ ধর্মীয় কারণে এবং জীবিকার প্রয়োজনে ছুটে এসেছে ভারতভূমিতে, সবচেয়ে বেশি এসেছে পশ্চিমবঙ্গে। এর পাশাপাশি, অন্য পড়শি দেশ মায়ানমারেও অশান্তি চলছে কয়েক দশক যাবৎ। তার জন্য ওই দেশ ছাড়া হতে হয়েছে রোহিঙ্গা জাতির কয়েক লক্ষ মানুষকে। তারা আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে চলেছে ভারত, বাংলাদেশ থেকে শুরু করে দূর প্রাচ্যেরও একাধিক রাষ্ট্রে।
ইতিমধ্যে ভারতে কায়েম হয়েছে নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী শাসন। কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় মোদি হ্যাটট্রিক করার সৌভাগ্য অর্জন করলেও পশ্চিমবঙ্গে মোটেই সুবিধা করতে পারছেন না। অথচ হিন্দুত্ববাদীদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গ নামক অঙ্গরাজ্যটি আসলে তাঁদেরই সৃষ্টি। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তৎপর না-হলে এই ভূখণ্ড পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত। আর তাঁদের জন্মের খেদ এখানেই, তামাম ভারতে লাঠি ঘোরাবার ছাড়পত্র মিললেও বাংলার মানুষ কিছুতেই বিজেপিকে গ্রহণ করছে না। একুশের ভোটে মোদি-শাহ ‘২০০ পার’ ঘোষণা করে দিয়ে বাহু ফুলিয়েছিলেন বিস্তর! কিন্তু গেরুয়া শিবিরের কপাল এমনই পোড়া যে, এই জুটির অশ্বমেধের ঘোড়াটি ১০০ ছোঁয়ার অনেক আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল। তারপর থেকে ঠিকমতো মাজা সোজা করে দাঁড়াতেই পারল না দলটি। তারই মধ্যে বেজে গিয়েছে ছাব্বিশের ভোটের দামামা। অতএব কী করা? ভাঙলেও মচকানো যাবে না, এটাই তো রাজনীতির রীতি। দলটি আমদানি করেছে নতুন ‘অনুপ্রবেশ তত্ত্ব’! বিজেপির অভিযোগ, বাংলায় নাকি গণতন্ত্র নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় এখানে নাকি ভোটের নামে যা চলে তা একটি প্রহসনমাত্র। মৃত, ডুপ্লিকেট, বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা ভোটার ব্যবহার করেই নাকি এখানে ভোটরঙ্গ অনুষ্ঠিত হয়। মমতা যে হ্যাটট্রিক করেছেন, তা নাকি তাঁর কোনও কৃতিত্ব নয়, সবটাই নাকি উপর্যুক্ত উপাদানসমন্বয়ের কারসাজি! এই চালাকি গেরুয়া শিবির ধরে ফেলেছে এবং ছাব্বিশে এর পুনরাবৃত্তি তারা রুখেই দেবে যেকোনও মূল্যে।
বিজেপির প্ল্যান, এজন্য বাংলায় ভোটার তালিকার খোলনলচে বদলে দেওয়া হবে। স্বচ্ছতার অভূতপূর্ব এই অভিযানে বিজেপির সহায় জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। এজন্যই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এসআইআর ২০২৬ নামক এক নাগরিক-যন্ত্রণা। এসআইআর শুরু হতেই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা থেকে শুরু করে মোদি-শাহ পর্যন্ত বহু বিজেপি নেতাই দাবি করেছেন, বাংলায় এক কোটি ‘অবৈধ’ ভোটারের নাম বাদ যাবে। আর তাতেই কুপোকাত হয়ে যাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পার্টি এবং সরকার। কারণ এত এত অবৈধ ভোটারই নাকি রাজ্যের শাসক শ্রেণির ‘জিয়নকাঠি’। কিন্তু এসআইআর শুনানির শেষ পর্বে পৌঁছে দেখা যাচ্ছে, বিজেপির আস্ফালন, হুংকার বাস্তবিকই অযৌক্তিক, বোকা বোকা প্রেশার পলিটিক্স। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ থেকে দেখা যাচ্ছে, গত একদশকে বাংলায় নতুন ভোটার নথিভুক্তির সংখ্যা ক্রমশ কমছে। ২০২৪ সালেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। তাই প্রবণতার ছাপ ভোটার তালিকায় এবারও কমবেশি থাকবে বলেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু তার জন্য এসআইআর’কে বাড়তি ‘কৃতিত্ব’ দেওয়ার সুযোগ কই? সোজা কথায়, নস্যাৎ হয়ে যাছে পশ্চিমবঙ্গে ‘অনুপ্রবেশ তত্ত্ব’, যা বিজেপির কাছে অন্ধের যষ্ঠি, ছাব্বিশের শেষ ভরসা। হাসিনা জমানায় বাংলাদেশের আংশিক শ্রীবৃদ্ধি হওয়ার পরেও যদি এদেশে কিছু অনুপ্রবেশ হয়ে থাকে তার দায় কেন্দ্রকেই নিতে হবে। নৈতিক দায় বর্তায় কেন্দ্রের শাসক দল হিসেবে বিজেপির উপরেও। সেই ব্যর্থতার বোঝা একটি নির্বাচিত সরকারের উপর চাপানো বাংলার মানুষকে অপমান করা ছাড়া কিছু নয়। চৈতন্যোদয় হোক বিজেপির। তারা এবার অন্তত বাস্তবের মাটিতে পা রেখে জনস্বার্থের রাজনীতির সূচনা করুক।