Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নয়া কৌশল?

এ কি তবে বিজেপি তথা মোদি সরকারের নতুন কোনও কৌশল?

নয়া কৌশল?
  • ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

এ কি তবে বিজেপি তথা মোদি সরকারের নতুন কোনও কৌশল? একদিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সরকারি তরফে বার্তা দেওয়া, অন্যদিকে শাসক দলের নেতৃত্বের কেউ-বা দিচ্ছেন বাংলাদেশের সঙ্গে কার্যত যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি! এ নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই যে, গত বছরের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশছাড়া করার পর থেকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর সীমাহীন অত্যাচার শুরু হয়েছে পরোক্ষে সে দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মদতে। পড়শি এই দেশে হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছে, মহিলাদের উপর নির্যাতন চলছে, হিন্দুদের ঘরবাড়ি, মন্দির ভেঙে ফেলা হচ্ছে, এমনকী জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে। দুষ্কৃতীদের হাত থেকে রেহাই মেলেনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িও! বাংলাদেশজুড়ে ভারত বিরোধী স্লোগান তুঙ্গে উঠেছে। জোরালো অভিযোগ উঠেছে যে, ভারতের শত্রু পাকিস্তানের মদতে মৌলবাদী শক্তি হিন্দুনিধন যজ্ঞে মেতে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশকে একাধিকবার বার্তা দিয়েছে দিল্লি। সংখ্যালঘু হিন্দুদের হেনস্তা বন্ধ করতে ইউনুস সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করুক—এমন কড়া কথাও বলা হয়েছে ভারতের তরফে। কিন্তু একইসঙ্গে ভারত যে তার এই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়— সেই বার্তাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানানো হয়েছে। বিভিন্ন মহলের মতে, চাইলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারে দিল্লি। কিন্তু এই উপমহাদেশে চীন, পাকিস্তানের ভূমিকার কথা মাথায় রেখে কূটনৈতিক কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে হয়তো শত্রুতা বাড়াতে চায় না ভারত। বরং যথেষ্ট সহিষ্ণুতা দেখিয়ে কার্যত বন্ধুত্বের বার্তাই দেওয়া হচ্ছে দিল্লির তরফে। তাই এখনও পর্যন্ত সেভাবে কোথাও কোনও বিধিনিষেধ আরোপিত হয়নি।

Advertisement

সরকারের এই মনোভাবের প্রমাণ দিতে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও খালেদার মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করে বার্তা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর দূত হয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কার্যালয়ে গিয়ে শোক জানিয়ে এসেছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে বার্তা দিয়েছে ভারতের বিদেশমন্ত্রক। আরও এক ধাপ এগিয়ে শুক্রবার মাদ্রাজে একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের হিংসা, প্রতিবেশী নীতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জয়শংকর বলেছেন, ‘আপনার যদি এমন পড়শি থাকে যার সঙ্গে আপনার সদ্ভাব রয়েছে বা যে অন্তত আপনার জন্য ক্ষতিকর নয়, তাহলে আপনার স্বাভাবিক প্রবণতাই হবে যে সেই পড়শির প্রতি দয়ালু হওয়া, তাকে সহায়তা করা। সেই প্রতিবেশী যদি সমস্যায় থাকে আপনি যথাসাধ্য করবেন। আর কিছু না করতে পারেন তাকে সম্বোধন করবেন, বন্ধুত্ব তৈরি করতে চেষ্টা করবেন, বন্ধন গড়বেন। আমরা সেটাই করি।’ বার্তা স্পষ্ট। আসলে ভারত বরাবরই সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বে বিশ্বাসী। তবে প্রতিবেশী খারাপ হলে দেশবাসীকে রক্ষা করার অধিকার রয়েছে ভারতের— এই মন্তব্য করে ঘুরিয়ে পাকিস্তানকে তোপ দাগতে ছাড়েননি জয়শংকর।
অবাক করা বিষয় হল, প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কে সরকার এই অবস্থান নিয়ে চললেও বিজেপি দলের কেউ কেউ হিন্দুত্বের লাইন মেনে বাংলাদেশকে কার্যত ‘বয়কট’ করার নিদান দিতে শুরু করেছে! এমনকী কোনও ব্যক্তি বা সংস্থা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ঐতিহ্য রক্ষা করতে চাইলে তাকে বা তাদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে! এই দ্বিচারিতার সাম্প্রতিক শিকার শাহরুখ খান। আইপিএল-এর চলতি মরশুমে খেলানোর জন্য এই বলিউড অভিনেতার দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে দলে নিয়েছে। আর তাতেই গেল গেল রব তুলেছে বিজেপি। গেরুয়াবাহিনীর একাধিক নেতা ও পদাধিকারীর উষ্মার কারণ, একদিকে বাংলাদেশে হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছে, অন্যদিকে সে দেশের ক্রিকেটার কেনা হচ্ছে বলে। তাঁদের চোখে শাহরুখ খান একজন ‘বিশ্বাসঘাতক’, ‘দেশদ্রোহী’। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আইপিএল-এ বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে খেলানো যাবে না বলে আগে থেকে কোনও নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি কেন্দ্রীয় সরকার বা ভারতীয় ক্রিকেট সংস্থা। উল্টে দেখা যাচ্ছে, এ বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরে যাওয়ার কথা ভারতীয় ক্রিকেট দেশের। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড তাহলে কী করে বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে খেলার অনুমতি দিয়েছিল? যদিও শনিবার শেষপর্যন্ত হয়তো চাপের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে বাংলাদেশি ওই ক্রিকেটারকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কেকেআরকে নির্দেশ দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড। এবছর আইপিএল-এর মিনি নিলামের আসরও বসেছিল একটি ইসলামিক দলের। তাছাড়া কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র জয় শাহ আইসিসি-র চেয়ারম্যান হলেও বকলমে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড চলে তাঁর অঙ্গুলিহেলনে। ঘটনা হল, পহেলগাঁওয়ের হাড়হিম করা ঘটনার পরেও ভারত কিন্তু খেলেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। তাহলে বিজেপির এই তথাকথিত কিছু ব্যক্তির হুমকি কি আসলে শাহরুখ একজন মুসলমান বলে? নাকি এটাই আপাতত শাসকগোষ্ঠীর নতুন কৌশল, যেখানে সরকারি তরফে যাবতীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তা দেওয়া হলেও দলের তরফে ‘বয়কটের’ বিদ্বেষ ছড়ানো হবে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ