আত্মনির্ভর ভারত গড়তে হবে। এ জন্য দেশীয় পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে, যাতে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনা যায়। নিজস্ব উৎপাদিত পণ্যেই সাধারণ মানুষের যাবতীয় চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নিয়েই সকলকে এগোতে হবে। মোদি জমানার শুরু থেকে মূলত এটাই কেন্দ্রীয় সরকারের রিংটোন। জাতির উদ্দেশে ভাষণ, মন কি বাত কিংবা মেঠো বক্তৃতা, গত এক দশক ধরে খোদ প্রধানমন্ত্রীর এই প্রচারে কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। কিন্তু মোদি বাহিনীর ১১ বছর রাজত্বের পর এর নিট ফল কী? উত্তর হল: এক) এই মুহূর্তে ভারতে মাথাপিছু আয় গড়ে বছরে ২ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা, দুই) মাথাপিছু ঋণ বা ধারের বোঝা ১ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা, তিন) পারিবারিক ঋণ জিডিপির ৪২ শতাংশ (অর্থবর্ষ শেষে দাঁড়াবে ২৫ লক্ষ কোটি টাকা, চার) ভারত সরকারের মোট ঋণ ২০০ লক্ষ কোটি টাকা, পাঁচ) বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৭ লক্ষ কোটি টাকা। এমন হতাশাজনক পরিসংখ্যান হাতে নিয়েই মোদি সরকারের প্রচার হল, বিশ্বে বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হওয়ার দৌড়ে ২০২২ সালে ব্রিটেনকে পিছনে ফেলে পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছিল ভারত। আর ২০২৫-এর শেষলগ্নে জাপানকে পিছনে ফেলে ভারত উঠে এসেছে চতুর্থ স্থানে। সামনে শুধু আমেরিকা, চীন ও জার্মানি। অর্থনীতির কারবারিরা বলছেন, মোদি সরকারের এই দাবি সত্য হলেও অতিরঞ্জিত। ভারতের বিপুল জনসংখ্যার (প্রায় ১৪৫ কোটি) সুবাদে জিডিপি বৃদ্ধির হার সাধারণ অঙ্কের নিয়মে বেশি বলেই এই উত্থান। আসল মাথাপিছু আয়ে জাপান ১২ গুণ, জার্মানি ২০ গুণ এগিয়ে রয়েছে ভারতের থেকে। বিশ্বে ভারতের স্থান ১৪৪ তম, যা একটা নিম্ন-মধ্য দেশের পরিচায়ক।
এই ঋণসর্বস্ব কোমরভাঙা অর্থনীতির দেশে আরও এক চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছে রিজার্ভ ব্যাংক। সম্প্রতি সর্বোচ্চ ব্যাংকের এক সমীক্ষা রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২০১৯-২৪ সালের মধ্যে পাঁচ বছরে এ দেশে পারিবারিক ঋণের হার মোট ঋণের মধ্যে গড়ে ৩৮ শতাংশ ছিল। ২০২৫-এ এক ধাক্কায় তা অনেকটা বেড়ে হয়েছে জিডিপির ৪২ শতাংশ। টাকার অঙ্কে চলতি অর্থবর্ষের শেষে তা ২৫ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছবে। ২০১৫ সালে পারিবারিক ঋণের পরিমাণ ছিল সাড়ে তিন লক্ষ কোটি টাকা। এই পারিবারিক ঋণের মধ্যে ২২ শতাংশই ব্যক্তিগত ঋণ। অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, কিছুকাল আগে পর্যন্ত বাড়ি ফ্ল্যাট কেনা, গাড়ি কেনা, গৃহ সংস্কারের জন্য ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। এখন ভোগ্যপণ্য ক্রয় করতে পরিবারগুলি ঋণ নিচ্ছে বেশি। বর্তমানে মোট ঋণের ২৮ শতাংশ নেওয়া হচ্ছে গৃহঋণ হিসেবে। ৫৩ শতাংশ ঋণ নেওয়া হচ্ছে ভোগ্যপণ্য কেনার কারণে। ১৬ শতাংশ কৃষি ও ব্যবসার কারণে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে বাড়ি তৈরি করতে যত মানুষ ঋণ নিতেন, তার প্রায় আড়াই গুণ বেশি নিচ্ছেন ভোগ্যপণ্য কিনতে। আগে ঋণ নিতে ব্যাংকে ছোটাছুটি ছিল দস্তুর। এখন অনলাইনেই তা সেরে ফেলছেন নতুন প্রজন্ম। এর কারণ তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণ, উচ্চমূল্যের পণ্য কেনার মতো প্রবণতা, ঋণ শোধের খরচকে ছোট ছোট কিস্তিতে ভাগ করে নেওয়ার সুবিধা এবং অবশ্যই মুদ্রাস্ফীতি। এক কথায়, হাতের সামনে একাধিক বিকল্প ও সুবিধা থাকায় পণ্যক্রয়ে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। মোদি জমানায় যে বিষয়টি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে তা হল এই পার্সোনাল লোন বৃদ্ধি। ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা না থাকলেও ঋণ নেওয়ার সুবিধার কারণে প্রয়োজন মেটাতে মানুষ পার্সোনাল লোন নিচ্ছেন, পরিণতিতে সুদের পাহাড় জমছে। ঋণ পাওয়ার সহজলভ্যতায় বিপজ্জনকভাবে পারিবারিক ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এ অনেকটা ঋণ করে ঘি খাওয়ার মতো। মোদি সরকার সেই দিকেই মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে।
অথচ দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে বোঝাতে মোদি সরকার সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়ছে বলে যে প্রচার করছে, তাতেও বাস্তব এই ছবি বদলায় না। ঘটনা হল, বিগত এক বছরে পারিবারিক সঞ্চয়ের পরিমাণ সামান্য বেড়েছে। এতে খুশি হওয়ার কোনও কারণ দেখছে না খোদ রিজার্ভ ব্যাংকই। তাদের মতে, আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ গৃহস্থের সংশয় রয়েছে। সেটা হল, বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কোনও জীবিকা, পেশা বা আয়ের উৎস যদি আগামী দিনে একইরকম না থাকে—এই অনিশ্চয়তার কারণেই তারা সঞ্চয়ের অর্থে হাত না দিয়ে ঋণ করে প্রয়োজন মেটাতে চাইছে। ঋণ নেওয়া সত্ত্বেও সঞ্চয় বৃদ্ধির প্রবণতার এই ছবি প্রমাণ করে, এদেশে রোজগারের রাস্তা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে কর্মসংস্থানের বাজার। সেইসঙ্গে স্থায়ী কাজের সুযোগ কমছে, বাড়ছে চুক্তিভিত্তিক কাজ, যার স্থায়িত্ব পুরোটাই মালিকনির্ভর। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যে বেশ টালমাটাল— তাতে সন্দেহ থাকার কথা নয়। অথচ ঋণ ও সঞ্চয়ের এই বিপজ্জনক ছবিটাকে সামনে রেখেই অর্থনীতিতে হাল ফেরার অসত্য প্রচার করে চলেছে মোদি সরকার! কিন্তু তাতে কি প্রকৃত সত্য ঢেকে রাখা যায়!