Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কমিশনের আজগুবি নির্দেশ

বিহারে এসআইআরের অভিজ্ঞতা মানুষের ভালো নয়। তাই পরের ধাপে বাংলায় এসআইআর ঘোষণা হতেই বিরোধীদের একাংশের তরফে প্রবল আপত্তি ওঠে।

কমিশনের আজগুবি নির্দেশ
  • ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিহারে এসআইআরের অভিজ্ঞতা মানুষের ভালো নয়। তাই পরের ধাপে বাংলায় এসআইআর ঘোষণা হতেই বিরোধীদের একাংশের তরফে প্রবল আপত্তি ওঠে। সাধারণ মানুষও আশঙ্কা করেছিল যে, এসআইআর মোদি জমানায় নতুন এক হেনস্তার নাম হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে যে রাজ্যে ঐতিহাসিক কারণেই লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু পরিবারের বসবাস সেখানে ‘নাগরিক’ প্রমাণ চাওয়ার নামে তুঘলকি কাণ্ড চলবে। এমনও আশঙ্কা করা হয়েছিল যে, বাংলায় ছাব্বিশের ভোটে বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবেই জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে (ইসিআই) ব্যবহার করছে মোদি সরকার। এর পিছনে রাজ্যের প্রধান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংক সংকুচিত করে দেওয়ার মতলব আছে বলেও অভিযোগ ওঠে। মতুয়া এবং মুসলিম ভোটারদের একটা বড়ো অংশের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা বিপুল। তৃণমূল বারবার বলার চেষ্টা করেছে, এসআইআর করার নামে এই দুই শ্রেণির ভোটারদের কিছুটা ছেঁটে দেওয়ার প্ল্যান রয়েছে বিজেপির। কাজটা তারা নিজেরা করতে পারছে না বলে ইসিআইকে ‘হায়ার’ করেছে, যেমন দুর্নীতির ‘নিরপেক্ষ’ তদন্তের নামে একাধিক সেন্ট্রাল এজেন্সির অপব্যবহারের কাহিনি আজ সুবিদিত। কেন্দ্রীয় এজেন্সির কারবার আদালতেরও দৃষ্টিগোচর হয়েছে একাধিক সময়ে। এজন্য তারা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্সিকে তীব্র ভর্ৎসনাও করেছে।

Advertisement

তাই মোদি জমানায় একাধিক ক্ষেত্রে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই এসআইআরের জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধীদের একটা বড়ো অংশ। এই আন্দোলন রাজপথ, জনসভা থেকে বিধানসভা, এমনকি দিল্লির দরবার পর্যন্তও নিয়ে গিয়েছে তারা। মামলা হয়েছে আদালতে। জবাব দিতে গিয়ে ইসিআই একাধিকবার আশ্বস্ত করেছে যে, এসআইআর নিয়ে প্রকৃত নাগরিক এবং ভোটারদের দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। যাদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আছে তারা সরাসরি এসআইআর ২০২৬-এ তালিকাভুক্ত হবে। আর যাদের নাম দু’দশক আগের তালিকায় ছিল না, তাদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এগারোটি নথির যেকোনো একটি দেখালেই সমস্যা মিটে যাবে। কিন্তু ‘এসআইআর পাশ’ করা ইসিআই কর্তারা যতটা সহজ মুখে বলেছিলেন তার সঙ্গে বাস্তবের মিল কমই। বহু ‘বৈধ’ নাগরিকের নাম খসড়া তালিকায় নেই। কিছু ‘জলজ্যান্ত’ ব্যক্তিকে সটান ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে! এরপর শুরু হয়েছে শুনানির ধামাকা। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, একই ব্যক্তিকে বারবার তলব করা হচ্ছে শুনানি কেন্দ্রে। অতিবৃদ্ধ, এমনকি গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিরাও রেহাই পাচ্ছেন না। বহির্বঙ্গে ব্যস্ত ব্যক্তিদেরও টানাহেঁচড়া জারি আছে। বহু ব্যক্তির ‘গ্রাহ্য’ নথিও ‘নাকচ’ হয়ে যাচ্ছে নানা অজুহাতে। এছাড়া ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ যাচাইয়ের নামে চলছে রীতিমতো খ্যাপামি। এরপর জারি রয়েছে বহু লোকের নাম বাদ দেওয়ার আবদার নিয়ে হাজার হাজার ফর্ম জমার কিম্ভুত কাণ্ড। গেরুয়া শিবিরের এই স্বজনবিরোধী কারবার নিয়ে বাংলা কার্যত ফুঁসছে।

কিন্তু কুছ পরোয়া নেই। সব মিলিয়ে শুনানি কেন্দ্রে তলবের ঠেলায় কমিশনের অফিসারদেরও হিমশিম অবস্থা। বিপুল সংখ্যক ভোটারের শুনানি প্রক্রিয়া শেষ করতে কমিশন এবার নয়া নির্দেশ জারি করেছে। কী সেই খ্যাপামি? প্রতি ভোটারের শুনানির জন্য বরাদ্দ মাত্র ২ মিনিট! অর্থাৎ ওই অতিসামান্য সময়ের ভিতরেই ভোটারকে এদেশে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। বাংলায় ‘আনম্যাপড’ এবং ‘সন্দেহজনক’ মিলিয়ে মোট প্রায় দেড় কোটি ভোটারের শুনানি হবে। এখনও পর্যন্ত শুনানি শেষ হয়েছে মাত্র ৩৪ লক্ষের। অর্থাৎ বাকিটা পাহাড়প্রমাণই। এই পরিস্থিতিতে শুনানি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে ভোটারপিছু বরাদ্দ হয়েছে মাত্রই ২ মিনিট। কমিশনের আজগুবি নির্দেশের প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এতে ভুলভ্রান্তি বাড়বে না তো? তার মাশুল ইসিআই, মোদি সরকার, বঙ্গ বিজেপি কাউকেই গুনতে হবে না, রাম ভোগান্তি হবে ভোটারদেরই। স্বভাবতই ‘অনাগরিক’ হয়ে পড়ার উদ্বেগ পেড়ে ফেলছে বহু মানুষকে। অসমে এনআরসি’র নিষ্ঠুরতম ইতিহাস আজ আর কারো অজানা নয়। রাষ্ট্র আর কত যন্ত্রণার কারণ হতে চায় নাগরিকের? অথচ রাষ্ট্রের দায়িত্বকর্তব্য এর ঠিক উলটো—নাগরিকদের সবরকমে স্বস্তি প্রদান, তাদের জন্য নিরাপত্তা ও সুবিচার সুনিশ্চত করা। পরিবর্তে মোদি জমানায় যা চলছে তা বুলডোজ প্রশাসন ছাড়া কিছু নয়। এত অশান্তি ও অনিশ্চয়তা নিয়ে মানুষ আর যাই হোক উন্নয়নে, রাষ্ট্রগঠনের মনোনিবেশ করতে পারবে না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ