এসআইআর আতঙ্কে দিন দিন যোগ হচ্ছে নয়া মাত্রা। এবারের নায়ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এআই-নির্ভর এক সফটওয়্যারের সৌজন্যে বাংলার আরও ১৪ লক্ষাধিক বৈধ ভোটারকে শুনানির মুখে পড়তে হচ্ছে। কারণ, তাঁদের নথি যথাসময়ে জমা পড়া সত্ত্বেও তা চিনতেই পারেনি কমিশনের ওই সর্বাধুনিক কীর্তিমান (সফটওয়্যার)। আর তাতেই বিপত্তি। ‘বৈধ’ ভোটার হওয়া সত্ত্বেও নামের পাশে ‘সন্দেহজনক’ শব্দটি যোগ হয়ে গিয়েছে। স্বভাবতই বহু নাগরিক পড়ে গিয়েছেন কমিশনের শুনানির ফাঁদে। যাঁরা এমন হেনস্তার শিকার, তাঁদের বেশিরভাগই সীমান্তবর্তী এলাকার ভোটার। তাঁদের মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনই সর্বাধিক। কিন্তু এ কি নিছকই কাকতালীয়? ব্যাপারটা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের অতীত। তাই যুক্তিসংগত জবাবটা জাতীয় নির্বাচন কমিশনকেই (ইসিআই) দিতে হবে।
এসআইআর গণনা পর্বের মাঝপথে সন্দেহজনক ভোটার চিহ্নিত করার উপর বাড়তি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তখন ইসিআই একটি বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করেছিল। ওই বিশেষ সফটওয়্যারটি এআই প্রযুক্তিনির্ভর। যেকোনও বিষয় চালু করার আগে যথেষ্ট সময় নিয়ে তার উপযুক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেওয়াই নিয়ম। বিষয়টি যদি বহুজনের উপর প্রয়োগের প্রয়োজন থাকে, তবে সেক্ষেত্রে শুধু মামুলি যাচাই করে নেওয়াই যথেষ্ট নয়, বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনই জরুরি। কারণ কোনোরকম যাচাই ছাড়া কিংবা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ঘাটতির কারণে যদি একজনও নাগরিক হয়রানির শিকার হন তবে তা অন্যায় হিসেবেই গণ্য হয়। আর সেই অবাঞ্ছিত কাণ্ড ঘটাবার জন্য রাষ্ট্রই দায়ী বা অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার কথা। কারণ ওই চাহিদা একজনও ব্যক্তিনাগরিকের ছিল না, কাজটি করা হয়েছে রাষ্ট্রের কোনো প্রয়োজন থেকে। যেমন এসআইআর ২০২৬ ধুয়োয়, খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এআই-নির্ভর ওই সফটওয়্যার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, খসড়া তালিকায় অন্তত ১.৩৬ কোটি ভোটারকে ‘সন্দেহভাজন’ দেগে দেওয়ার ‘কীর্তি’ ওই সফটওয়্যারের। বিএলও মারফত ওই ভোটারদের কাছে নথি চেয়ে পাঠিয়েছিল ইসিআই। তখন কমিশন-নির্ধারিত বৈধ নথিও জমা দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু এই আজগুবি সফটওয়্যার সকলের নথি গ্রহণ করেনি। অর্থাৎ বৈধ ভোটার হওয়া সত্ত্বেও এই নয়া অগ্নিপরীক্ষায় বহুজনে ‘ফেল’ করলেন! ফলে তাঁরা শুনানির মুখে পড়তে বাধ্য। এই চক্করে শুনানির ঝক্কি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আরো অন্তত ১৪ লক্ষ ভোটারের ঘাড়ে। নথি জমা দেওয়ার পর কমিশন জানিয়েছিল, অন্তত ৪২ লক্ষ ভোটার আর সন্দেহের তালিকায় নেই। বাকি ৯৪ লক্ষ ভোটারকে শুনানির নোটিস পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সফটওয়্যারের অতিবুদ্ধির সৌজন্যে ১.০৮ কোটি ভোটার এখনও সন্দেহভাজনের তালিকায় রয়ে গিয়েছেন। কমিশন সূত্রে মিলেছে আরও বড়ো দুঃসংবাদ, যা পরিস্থিতি বাংলায় কম করে ১.৪০ কোটি ভোটারকে শুনানির নোটিস ধরানো হতে পারে।
এসআইআর শুরু করার আগে কমিশনের তরফে দাবি করা হয়েছিল যে, এই পদক্ষেপের এক ও একমাত্র লক্ষ্য গণতন্ত্রের মানোন্নয়ন এবং নির্বাচন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসআইআর এক ভয়াবহ আতঙ্কেরই নাম। এই আতঙ্কে অসংখ্য পরিবারের ঘুম ছুটে গিয়েছে। জরুরি কাজকর্ম ফেলে প্রতিটি পরিবার গ্রাহ্য নথি সংগ্রহে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু যে-দেশে লক্ষ লক্ষ পরিবার গৃহহীন, বহু মানুষ বংশপরম্পরায় বানজারা, বানবন্যা ভূমিধস নদীভাঙনে বারবার ঠাঁইনাড়া, এমনকি সর্বস্বান্ত হয়—তাদের সকলের পক্ষে কংসরাজার নিত্যনতুন বদ ফরমাস পালন করা সম্ভব নয়। তার মধ্যেও যাদের পক্ষে যতটা সম্ভব হয়েছে তারা জোগাড় করেছে। তারপরেও হেনস্তা অব্যাহত রাজ্যজুড়ে। এই আকস্মিক ধাক্কা সইতে না পেরে ইতিমধ্যেই কিছু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এমনকি কয়েকজন মারাও গিয়েছেন কিংবা আত্মঘাতী হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলার নিরীহ নির্দোষ মানুষকে আর কত দুর্ভোগে ফেলার পর শান্ত হবে কমিশন? এই প্রশ্নই এখন বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ, শুনানিতে তলবের নামে যে কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে, তাতে একটা জিনিস পরিষ্কার যে বিষয়টি মানুষের যুক্তিবুদ্ধির অতীত। যন্ত্রের এই কারসাজি রোখার সাধ্য বিএলও’দেরও নেই। তাই এই দায় কমিশনের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। গণতন্ত্ররক্ষা এবং নির্বাচনে স্বচ্ছতা ফেরানোর দাবি আন্তরিক হলে মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে সবার আগে। মানুষকে বিপদে রেখে গণতন্ত্রের দাবি ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে কমিশন কখনোই সফল হবে না।