এসআইআর-এর ঘোষিত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে জাতীয় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। কমিশন এও দাবি করেছিল, এই কাজে তারা সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলতে চায় না। পাশাপাশি একজন প্রকৃত ভোটারেরও নাম যাতে বাদ না যায়, তা নিশ্চিত করবে তারা। কমিশনের এমন আশ্বাসবাণী পেয়ে ভোটারদের নিশ্চিন্তে দিন কাটানোর কথা ছিল। কিন্তু বিহারে এসআইআর-এর পরিণতি এবং বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গসহ ১২টি রাজ্যে যেভাবে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের কাজ চলছে, তাতে কমিশনের আসল উদ্দেশ্যই যেন বেআব্রু হয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে বহু মানুষের ঘুম ছুটেছে। দেশের প্রায় প্রতিটি বিরোধী দল প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছে যে, নির্বাচনমুখী রাজ্যগুলিতে বিজেপি-র ভোটব্যাংক নয়, এমন প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দিতেই তাড়াহুড়ো করে এসআইআর করা হচ্ছে। বিজেপিকে রাজনৈতিক সুবিধা করে দিতেই কমিশনের এই অতি সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকার দিকে নজর রাখলে বিরোধীদের অভিযোগগুলি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। এ রাজ্যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে গত ১৬ ডিসেম্বর। তারপর থেকে যে শুনানিপর্ব শুরু হয়েছে তা দেখেশুনে বিরোধীদের তোলা কমিশনের ‘আসল’ উদ্দেশ্যর দাবিই জোরালো হয়ে উঠেছে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির খামখেয়ালিপনা, ঘনঘন তুঘলকি ফরমান জারি করে কমিশন প্রতিদিন যেভাবে প্রকৃত ভোটারদের চূড়ান্ত হেনস্তা করছে, তাতে তাদের মরিয়া ভাবই স্পষ্ট। শুনানিপর্বের প্রায় শেষলগ্নেও তা অব্যাহত।
শুনানিপর্বে জন্মের নথি হিসাবে লক্ষ লক্ষ ভোটার মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড জমা দিয়েছিলেন। গত ২৭ ডিসেম্বর শুনানির শুরু থেকে এই নথি জমা নেওয়া হয়েছে। অথচ বৃহস্পতিবার কমিশন জানিয়েছে, কোনও স্বীকৃত বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শংসাপত্র বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করা হবে, অ্যাডমিট কার্ড নয়। শংসাপত্র মানে পাশের সার্টিফিকেট। প্রশ্ন উঠেছে, স্বীকৃত বোর্ডের বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট বৈধ নথি হলে অ্যাডমিট কার্ড নয় কেন? কেনই বা এতদিন তা গ্রহণ করা হল? ঘটনা হল, যেসব নাগরিকের জন্মের শংসাপত্র নেই, এতকাল তাঁরা সরকারি যে কোনও কাজে বয়সের প্রমাণপত্র হিসেবে অ্যাডমিট কার্ডই জমা করেছেন এবং তা গৃহীত হয়েছে। তাহলে ভোটার পরিচয়ের তা কেন ব্রাত্য হবে? সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, এ দেশে বহু মানুষ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়াশোনাই করেননি। অনেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেননি। অনেকে আবার পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে পারেননি। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ কি তবে বৈধ নাগরিক নন? তাঁদের কাছে অন্যান্য কোনও নথি না থাকলে কী হবে? একইরকম তুঘলকি কাণ্ড দেখা যাচ্ছে আধার কার্ডের ক্ষেত্রে। গোটা শুনানিপর্বে অন্যান্য নথির সঙ্গে আধার কার্ডও আপলোড করা যাচ্ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে সেই আধার কার্ড আপলোড আচমকাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আধিকারিকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, মৌখিকভাবে তাঁদের আধারকে আপলোড করতে নিষেধ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশও কমিশন অমান্য করছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন রয়েছে, আরও অনেক। অসংখ্য ভারতবাসীর নেই কোনও জন্ম সার্টিফিকেট। দেশের বহু মানুষ নিরক্ষর বা অল্প শিক্ষিত হওয়ায় তাঁদের নেই কোনও পাশের সার্টিফিকেট। এই বাস্তব পরিস্থিতিটা কি কমিশনের অজানা?
আরও অভিযোগ, রাজ্যের সংখ্যালঘু এলাকায় প্রকৃত ভোটারদের কাছে নানা অসংগতির অছিলায় মুড়ি-মুড়কির মতো নোটিস পাঠানো হচ্ছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, মালদায় কোনও কোনও বিধানসভায় নাকি ৯০ হাজার নোটিস ইস্যু হয়েছে। তার মানে, সেই বিধানসভায় মোট ভোটারের ৪০-৪৫ শতাংশের কাছে নোটিস গিয়েছে। একইভাবে তফসিলি অধ্যুষিত এলাকাতেও নোটিসের ঢল নেমেছে। অসংগতি মানে ‘শেখ’ বানান কোথাও ‘শ’ কোথাও ‘স’ লেখা হয়েছে। কোথাও ‘শেখ’ লেখা নামের আগে, কোথাও বা পরে। একইভাবে নামের মধ্যে ‘আলি’ ব্যবহার করা, না করা নিয়ে, মহিলারা খাতুন, বেগম, বিবি ব্যবহার করায় নোটিস পেয়েছেন। আবার তফসিলিদের মধ্যে ‘বাগদি’ পদবি এখন হয়েছে ‘বাগ’। ‘বাউরি’ পদবির অনেকে এখন ‘পাল’ পদবি ব্যবহার করেন। দশকের পর দশক ধরে এই নাম-পদবি ভিন্নতা নিয়েই এই সংখ্যালঘু, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে এসেছেন। এবার তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেওয়া হচ্ছে! নাগরিকত্বের অগ্নিপরীক্ষা দিতে গিয়ে ঘোর আতঙ্কে দিন কাটছে তাঁদের। নথি-আতঙ্কে দুর্ভাগ্যজনক হলেও আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এর দায় কি কমিশন এড়াতে পারে? প্রশ্ন হল, শেষ পর্যন্ত আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় এই আতঙ্কে দিন কাটানো মানুষগুলির নাম থাকবে? এরই মাঝে কমিশনের ঘন ঘন অবস্থান বদলে মানুষের ভোগান্তি সহ্যের সীমা ছাড়াচ্ছে। আর যাঁরা শুনানিপর্বে নথি জমা দিচ্ছেনও তার ‘প্রাপ্তিস্বীকার’ করে দেওয়া হচ্ছে না রিসিভ কপি। এখানেও সংশয়। তাহলে কি বিরোধীদের কমিশনের বিরুদ্ধে তোলা ‘আসল’ উদ্দেশ্যই সত্যি হবে?