Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভয়ের লক্ষণ!

সিবিআই খাঁচার তোতা! এটা দেশের কোনও বিরোধী নেতা বলেননি, ইউপিএ আমলে এই আশঙ্কা প্রকাশ করে কথাটি বলেছিল সুপ্রিম কোর্ট।

ভয়ের লক্ষণ!
  • ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সিবিআই খাঁচার তোতা! এটা দেশের কোনও বিরোধী নেতা বলেননি, ইউপিএ আমলে এই আশঙ্কা প্রকাশ করে কথাটি বলেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এরপর বছর সাড়ে তিন আগে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এন ডি রমনা সিবিআই-এর এক অনুষ্ঠানে গিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাজকর্ম ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর কথায়, এই প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে হলে রাজনৈতিক শাসকের সঙ্গে আঁতাত ভাঙতে হবে। দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি, তোতা আপাতত খাঁচাতেই বন্দি আছে। বরং খাঁচা আরও শক্তপোক্ত হয়েছে। চালু ধারণা হল, কী রাজ্য, কী কেন্দ্র—প্রতিটি ক্ষেত্রেই শাসকগোষ্ঠী তাদের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে তার সুবিধা মতো কাজে লাগায়। কিন্তু মোদি জমানার এগারো বছর যেভাবে মূলত রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের ‘শায়েস্তা’ করতে ইডি, সিবিআই, আয়করের মতো দপ্তরকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে তার কোনও তুলনা নেই। ভয় দেখাতে, বশ্যতা শিকার করাতে মোটামুটি তিনরকম কৌশল নেওয়া হয়। ১) বিশেষত বিধানসভা ভোটের আগে সংশ্লিষ্ট রাজ্য দখলের উদ্দেশ্যে সেখানকার শাসক নেতা-নেত্রীদের জেলে ভরে একটা ভয়-আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি করা। এমন উদাহরণ বহু। ২) বিরোধী নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে তদন্তকারী সংস্থাকে লেলিয়ে দিয়ে তাঁদের নিজেদের দলে টেনে নেওয়া। এই করে বিরোধীদের সরকার ভেঙে দেওয়ার নজিরও আছে। ৩) এক শ্রেণির ব্যবসায়ী-শিল্পপতিকে ইডি-সিবিআই দিয়ে ভয় দেখিয়ে দলীয় তহবিলের জন্য মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা। বিরোধীদের এই যাবতীয় অভিযোগগুলি যে কথার কথা নয়, তার প্রমাণ লুকিয়ে আছে নানা সরকারি তথ্যেই। যেমন, মোদি জমানায় যত রাজনৈতিক মামলা করেছে ইডি, তার ৯৮ শতাংশই বিরোধী দলের নেতার বিরুদ্ধে। আবার ইউপিএ জমানায় যেখানে ৮৪টি তল্লাশি হয়েছে, এনডিএ জমানায় তা বেড়ে হয়েছে ৭২৬৪টি। প্রায় ৮৬ গুণ বেশি। একইভাবে গ্রেপ্তার ২৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০৫। এই লোকদেখানো বিপুল কারবারের নিট ফল হল, ইডির তদন্তে সাজার হার মাত্র ০.৭ শতাংশ। সাধে কি রাহুল গান্ধী বলেছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে এই দুই সংস্থার নাকি একটিও মামলা নেই। বিজেপি গোটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটাই রাজনৈতিক ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে। 

Advertisement

অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকালে শহর কলকাতা ও সল্টলেকের পাঁচ নম্বর সেক্টর এক ‘সাজানো’ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ইডি অভিযানের সাক্ষী থাকল। এ রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের সঙ্গে আই-প্যাক সংস্থার জড়িয়ে পড়াটা কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। বরং গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা হল, তৃণমূলের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক সব গুরুত্বপূর্ণ কাজে এই বেসরকারি সংস্থাটি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছে। তৃণমূলের উপর্যুপরি জয়ে আই-প্যাকের অবদান কেউ অস্বীকার করে না। একটি পেশাদার ভোটকুশলী সংস্থা হিসেবে এর আগে গুজরাতে বিজেপি সহ বিভিন্ন রাজ্যে থাকা শাসক বা বিরোধী দলের হয়ে পরামর্শদাতার কাজ করেছে আই-প্যাক। সুতরাং তাদের অফিসে এখন পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল ও সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, তথ্য, কাগজপত্র থাকবে— এটাই স্বাভাবিক। ভোটের আগে সেই অফিসে ইডির হানা ভালো চোখে দেখার কথা নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তা দেখেননি। আই-প্যাকের কর্ণধারের বিরুদ্ধে পাঁচ বছর আগের একটি মামলার তদন্তের জন্য ঠিক ভোটের আগের এই সময়টাকে বেছে নেওয়ার পিছনে ‘আসল উদ্দেশ্য’ নিয়ে তাই দেশজুড়ে সঙ্গত প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এইসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির ‘ট্র্যাক রেকর্ড’ সকলের জানা। আসলে, নির্বাচনের আগে বারবার তদন্তকারী বিভিন্ন সংস্থার ‘অতিসক্রিয়তা’ দেখেছে বঙ্গবাসী। তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করতেই পারে, তল্লাশিও চালাতে পারে। কিন্তু শীতঘুম কাটিয়ে ঠিক ভোটের মুখে হিমঘর থেকে পাঁচ বছর আগের মামলাকে টেনে বের করার পিছনে কোনও ‘উদ্দেশ্য’ কাজ করছে কি না তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। 
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোট ঘোষণাও ফেব্রুয়ারি মাসে হয়ে যেতে পারে। এই রাজ্যটাকে দখল করার জন্য অতীতে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক-আর্থিক সমস্ত শক্তিকে কাজে লাগিয়েও মাথানত করে দিল্লি ফিরতে হয়েছে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ বাহিনীকে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ভালোই জানেন, ভোটের ময়দানে লড়াই করে এবারেও বাংলা থেকে তাদের খালি হাতে ফিরতে হতে পারে। তাই সম্ভবত মরিয়া বিজেপি নেতৃত্ব ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে মমতার সংখ্যালঘু গরিব মানুষের ভোট বাদ দিয়ে জেতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু এসআইআর-এর খসড়া তালিকায় প্রাথমিকভাবে যে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তাতে ব্যুমেরাং হওয়ার আশঙ্কা করছেন খোদ বিজেপি নেতাদের একাংশ। অতএব অন্য চাল হিসেবে ভোটের আগে মমতার দলের যাবতীয় রণকৌশল হাতাতে ইডিকে মাঠে নামানো হয়েছে বলে তৃণমূলের অভিযোগ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ওরা ভোটের স্ট্র্যাটেজি ছিনতাই করতে এসেছিল। তাই বাধা দিয়েছেন তিনি। বলা বাহুল্য এমন সংঘাত বেনজির। এই সংঘাতে কে ভুল বা কে ঠিক— তা বিচার করবে মহামান্য আদালত। কিন্তু এমন কাজ হলে তা যে বিজেপির ভয়ের লক্ষণ, তাতে সন্দেহ নেই। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ