পাঠশালা বন্ধ, কোনো উৎসব-আনন্দে নয়, মোদি সরকারের বদান্যতায়! একটা সময় কবির ভাষায় ছিল, লেখাপড়া করে যেই, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই। এই জমানায় শৈশব তৈরির সেই আঁতুড়ঘরেই তালা পড়ে গিয়েছে। গাড়ি ঘোড়া চড়ার স্বপ্ন ছেড়ে শিশু কিশোরের একটা দল এখন সংসারের জোয়াল টানতে মজুরের জীবন বেছে নিয়েছে। মোদি যেন হীরক রাজার ভূমিকায়। এ কোনো মনগড়া কথা নয়, বিরোধীদের অভিযোগও নয়, খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থমন্ত্রকই তথ্য পরিসংখ্যান সহযোগে এই নির্মম বাস্তবটা তুলে ধরেছে। সংক্ষেপে তা হল, শতকরা হিসাব ধরলে সংসার টানতে ১৪-১৮ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদের ৪৪ শতাংশ স্কুলের পাট চুকিয়ে ফেলেছে। ২৮ শতাংশ নাবালক গৃহস্থালির কাজের জন্য স্কুল ছেড়েছে। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব অনেকটা বলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ১ শতাংশ। পড়াশোনা করে কী হবে— এই ভাবনা থেকে স্কুল ছেড়েছে ৮ শতাংশ। বাকি ১৯ শতাংশের স্কুল যাওয়া বন্ধের অন্যান্য কারণ রয়েছে। এই হিসেব চলতি অর্থবর্ষের। মজার কথা হল, একদিকে প্রধানমন্ত্রীর ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রকল্প চলছে, অন্যদিকে স্কুলছুটের হার বাড়ছে! গত পাঁচ বছরে দেশে ৬৫.৭ লক্ষ পড়ুয়া স্কুল ছেড়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মেয়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সর্বাধিক স্কুলছুট হয়েছে মোদির রাজ্য গুজরাতে। এরপরেই রয়েছে অসম ও উত্তরপ্রদেশ। কেন এত স্কুলছুট, তার কারণ জানে সরকার। কিন্তু তা সমাধানের পথে হাঁটতে নারাজ কেন্দ্র। উলটে বিপজ্জনক প্রবণতা হল, ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিকে সামনে রেখে একাধিক স্কুলকে একত্রীকরণ করে দেওয়া হচ্ছে।
পেটের জ্বালা মেটাতে গরিব প্রান্তিক ঘরের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা স্কুলের পথ পরিহার করছে! মোদি সরকারও একের পর এক সরকারি স্কুলের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। কেন্দ্রের রিপোর্ট বলছে, মোদি জমানায় দেশে সরকারি স্কুলের সংখ্যা কমেছে ৮ শতাংশ। অঙ্কের হিসাব যা ৯০ হাজারের বেশি। মাত্র একজন শিক্ষকের উপর নির্ভর করে চলছে লক্ষাধিক স্কুল। স্কুল বন্ধ নিয়ে খুব সম্প্রতি রাজ্যসভায় একটি তথ্য পেশ করেছে শিক্ষামন্ত্রক। প্রশ্ন ছিল, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫—এই পাঁচ বছরে কত সরকারি স্কুল বন্ধ হয়েছে? বন্ধের সময় কত পড়ুয়া ছিল? কত সংখ্যক স্কুলে কোনো পড়ুয়াই ছিল না? একই সময়ে কত বেসরকারি স্কুল খুলেছে? জবাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের মন্ত্রী জানান, এই সময়ে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ছিল ১০ লক্ষ ৩২ হাজার ১৯টি। তা কমে হয়েছে ১০ লক্ষ ১৩ হাজার ৩২২টি। অর্থাৎ পাঁচ বছরে ১৮ হাজার ৭০০টি সরকারি স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধের তালিকায় প্রথম চারটি রাজ্য হল মধ্যপ্রদেশ, অসম, ওড়িশা ও উত্তরাখণ্ড। উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হরিয়ানা ও গুজরাতেও। অথচ মাত্র গত এক বছরে দেশে বেসরকারি স্কুল খুলেছে ৮ হাজার ৪৭৫টি।
শিক্ষা বিষয়ক পণ্ডিতরা বলেন, শিক্ষা সমাজ গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। শিক্ষা মানে শুধু পুঁথিপড়া বা পরীক্ষায় পাশ করা নয়। চরিত্র গঠনেও শিক্ষার ভূমিকা সর্বাধিক। এই কারণেই সংবিধানে শিক্ষার অধিকারটি মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত। ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সি সমস্ত শিশু কিশোরের জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাকে সংবিধানে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই মৌলিক অধিকারটি আদৌ কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রশ্ন উঠছে। গত ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে যে বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী, তাতে শিক্ষাখাতে সামান্যই বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সমগ্র বাজেটের তা মাত্র ২.১ শতাংশ। আর জিডিপি-র ০.৩৯ শতাংশ। এও দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবর্ষে শিক্ষাখাতে যে বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছিল তার মধ্যে ৬ হাজার ৭০১ কোটি টাকা স্রেফ ছাঁটাই করা হয়েছে! প্রশ্ন উঠেছে, ন্যূনতম বা প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাদানের এই বেহাল ছবি দেখেও সরকার কী করে উচ্চশিক্ষায় নিত্যনতুন দরজা খোলার রঙিন স্বপ্ন দেখায়? এবারের বাজেটে দ্বিচারিতা, ভণ্ডামি চোখে আঙুল দিয়ে সত্যটাকে বেআব্রু করে দিয়েছে। ‘পরীক্ষা পে চর্চা’ অনুষ্ঠানে পড়ুয়াদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী যে মন কি বাত-ই শোনান, তাঁর অন্দর কি বাত অন্য কথা বলছে। আসলে এই গেরুয়া সরকার চায়ই না দেশের সব মানুষ শিক্ষিত হোক। কারণ যে যত জানবে, বুঝবে ততই প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে সরকারকে। আর তখনই অপ্রিয় সত্যগুলি সামনে চলে আসবে।