যত দোষ গরিব আর মধ্যবিত্তের—তাদের জন্য ভরতুকি গুনতে গিয়েই নাকি সরকারকে প্রতিবার পথে বসতে হয়! কিন্তু রবিবার সংসদে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করার আগে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, তাতে বিপরীত সাক্ষ্যই বিদ্যমান। মোদি সরকারের পরিসংখ্যানেই প্রকাশ, চলতি অর্থবর্ষের (২০২৫-২৬) গোড়ায় প্রায় ৪৮ লক্ষ কোটি টাকার আয়কর আদায় বকেয়া ছিল। পরিকল্পনা ছিল পুরো বকেয়া করের বেশিরভাগটাই কর্পোরেট শিবির থেকে সংগ্রহ করার। কিন্তু অনুমিত অর্থের অধিকাংশটাই যে আর কোষাগারে ফেরানো যাবে না, তা ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছে কেন্দ্র। অর্থবিষয়ক সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট বলছে, সেই বিপুল অঙ্কের বকেয়া অর্থমন্ত্রক বাধ্য হয়ে নামিয়ে এনেছে প্রায় সাড়ে ১৩ লক্ষ কোটি টাকায়। ফলত, ওই অর্থের বাকিটা হিসেবের খাতা থেকে মুছেই ফেলা হচ্ছে। কিন্তু কেন এই সিদ্ধান্ত? চলতি অর্থবর্ষের জন্য মাথাপিছু বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে করছাড় দেওয়া হয়েছিল গত বাজেটে। মোদি সরকার ধরেই নিয়েছিল, ভোটের কথা মাথায় রেখে করদাতা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনজয়ের জন্য সরকারকে কিছু মাশুল গুনতেই হবে। সরকারের হিসেব ছিল, আয়কর ক্ষেত্রে সাময়িক আপসের জন্য রাজকোষে যে অর্থ কম আসবে তার পরিমাণ নয় নয় করে ১ লক্ষ কোটি টাকা! স্বভাবতই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক বাধ্য হয়েছিল কর রাজস্ব আদায়ের সূত্র বৃদ্ধি বা সংগ্রহের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনতে। সেই কৌশলে কর্পোরেট সংস্থাগুলির উপর কর আরোপ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়। সরকার ধরে নিয়েছিল তাতেই ব্যাপারটা মেকাপ হয়ে যাবে। কিন্তু কর্পোরেট সংস্থাগুলি থেকে যত টাকা আদায় হবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল তা শেষমেশ ‘ফেল’ করে। ওই অনাদায়ী করের উপর পরবর্তীকালে যোগ হয় সুদ, এমনকি জরিমানাও। সব মিলিয়ে সরকারের বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪৮ লক্ষ ১৮ হাজার কোটি টাকা! ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারের ঘরে ফেরাতে আঞ্চলিক অফিসগুলিকে রীতিমতো লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়।
সময়সীমা পেরোবার পরও কেটে গিয়েছে কয়েকমাস। কিছু ক্ষেত্রে মামলা মকদ্দমাতেও জড়াতে হয়েছে সরকারকে। শুধু নাগালের বাইরে রয়ে গিয়েছে বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী অর্থ। সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘ আইনি লড়াই পর্বে বহু সংস্থা উঠেও গিয়েছে। এছাড়া অনেক কোম্পানির বহু সম্পত্তি ইতিমধ্যে ইডি-সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সির দখলে। সেগুলিও পুনরুদ্ধার করার সম্ভাবনা কম। আবার অনেক কোম্পানি নাকি স্রেফ কাগজেকলমে বিপুল সম্পত্তি দেখিয়ে সরকারকে ধোঁকা দিয়ে গিয়েছে। ‘ভুয়ো’ সম্পত্তির কাহিনি থেকে পরিষ্কার, আয়কর বিভাগকে বকেয়া মেটাবার মতো সম্পত্তিও সেসব কোম্পানির নেই। এমনকি, বহু কেসে একই আয়কর সংক্রান্ত ফাইল ভুলক্রমে একাধিকবার হিসেবের মধ্যে নেওয়া হয়েছে। তাই ধাপে ধাপে অনেককিছুই কাটছাঁট করতে হয়েছে। আয়কর বিভাগ মনে করছে, শেষমেশ সাড়ে ১৩ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি আদায় হলেও হতে পারে। বাকি প্রায় ৩৫ লক্ষ কোটি টাকা এখন নিছক কাগুজে রাজস্ব বা সরকারের খাতায় বোঝামাত্র। হিসেবের খাতা থেকে শুধু পশ্চিমবঙ্গকেই ৪৯ হাজার কোটি টাকা মুছে ফেলতে বলা হয়েছে। বকেয়া আয়কর বাবদ বাংলাকে আদায় করতে হবে ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো।
বিপুল অঙ্কের কর রেহাই দেওয়ার কয়েকটি নমুনা এইরকম: ৫৮৮ কোটি টাকার ট্যাক্স বকেয়া রাখার অভিযোগে দেশের প্রথম সারির এক সিমেন্ট কোম্পানিকে নোটিস ধরিয়েছিল আয়কর দপ্তর। মাস তিনেকের আইনি লড়াই শেষে সেই অঙ্কটা নেমে আসে মাত্র ২২২ কোটিতে। চলতি অর্থবর্ষে এমন উদাহরণ একগুচ্ছ বলেই খবর। কোনো নিত্যব্যবহার্য পণ্য উৎপাদনকারী সংস্থার বকেয়া কর ১১০ কোটি থেকে নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। আবার এক হাসপাতাল গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ কোটি টাকার বকেয়া কর ‘সংশোধনের’ পর এসে দাঁড়িয়েছে শূন্যে (০)! এমন চমকদার দৃষ্টান্ত কয়েকশো। বহু কোটি টাকার ‘আউটস্ট্যান্ডিং ট্যাক্স’ আয়কর দপ্তর থেকে স্রেফ ছেঁটে ফেলার ঘটনায় যারা রেহাই পেল তারা ‘মোদি সরকারের বন্ধু’—সংশ্লিষ্ট মহলের খবর এমনই। সোজা কথায়, সরকারের বন্ধুকৃত্যের মাশুল গুনছে দেশের কোষাগার। এই প্রসঙ্গে বলা দরকার, এ কোনো একটি বছরের চিত্র নয়, এই কাণ্ডের পুনরাবৃত্তিই ‘নিয়ম’ হয়ে গিয়েছে। বস্তুত যারা কর ফাঁকি দেওয়ার হিম্মত রাখে তাদের হাত বিরাট লম্বা। তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার স্পর্ধা সরকার বাহাদুরের থাকে না, কারণ শাসকের হাতপা বরাবরই বাঁধা নানাবিধ খুঁটিতে। স্বচ্ছতার নীতিতে সরকার পরিচালনা ছাড়া এই রাহু থেকে দেশের মুক্তি নেই।