আজ ৪১ বছর পূর্ণ করে ৪২’এ পা দিল ‘বর্তমান’। প্রবাদপ্রতিম সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তর ‘বর্তমান’। আমাদের ‘বর্তমান’। খবর, মতামত... আর তার সঙ্গে পাঠকের ভালোবাসা, সমালোচনা, ক্ষোভ, অভিমান মিলেমিশেই টিকে থাকে সংবাদপত্র। এগিয়ে যায় আগামীর উদ্দেশে। কিন্তু তার জন্য সবার আগে যা প্রয়োজন, তা হল মাটির সঙ্গে যোগ। ‘বর্তমান’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বরুণবাবু এই শিক্ষাটিই দিয়ে এসেছেন ৭ ডিসেম্বর, ১৯৮৪ থেকে। ঠিক যেদিন প্রথমবার প্রকাশিত হয়েছিল ‘বর্তমান’। প্রজন্ম বদলেছে। ব্যাটন হাত বদল করেছে। কিন্তু এই শিক্ষাটুকু বদলায়নি। আজও যদি নতুন প্রজন্মের কোনও প্রতিনিধি এই দপ্তরের মেঝেতে পা রাখে, সবার আগে এই একটি শিক্ষা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তার হাড়ে-মজ্জায়—মাটির সঙ্গে যোগ। তাই ঠিক এই কারণে প্রথম দিন থেকে আমরা বলে এসেছি মানুষের কথা। বলছি আজও। সময় বদলেছে। শাসক বদলেছে। প্রযুক্তির বাহার ও ব্যবহার বেড়েছে। বদলে গিয়েছে মানুষের স্বাদও। কিন্তু ‘বর্তমান’ মানুষের কথা বলে চলেছে। সেই একইরকমভাবে। বরুণবাবু বলতেন, কোনও পাড়ায় জল বন্ধের খবর যেন মিস না হয়। কারণ, জল মানুষের সরাসরি প্রয়োজন। পাঠককে সবার আগে এই একটি শব্দ কানেক্ট করে। ঠিক যেভাবে কানেক্ট করে বিদ্যুৎ, জমে থাকা আবর্জনা, খারাপ রাস্তা, ট্রেন বাতিল... মানুষের প্রয়োজন। এই প্রত্যেকটি সমস্যার মুখে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে হয় আম আদমিকে। প্রতিনিয়ত। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান যদি বেঁচে থাকার প্রথম তিনটি প্রয়োজন হয়, তাহলে এই সমস্যাগুলিও খুব পিছনের সারিতে থাকে না। আর ঠিক তাই আমরা এখনও সেই প্রয়োজনের কথাই বলি। বুঝতে চেষ্টা করি মানুষের পালস। অন্যান্য সংবাদমাধ্যম যখন একুশের ভোটে উলটো সুর ধরে, তখন শুধু আমাদের কাগজে লেখা হয়, বিজেপি নয়... তৃণমূল ২০০ পার। কারণ, আমরা প্রত্যেক ভোটের আগে বেরিয়ে পড়ি মাঠেঘাটে, রাস্তায়। খুঁজে বের করি সেই মাটির সঙ্গে যোগটা। কথা বলি প্রত্যেক শ্রেণির মানুষের সঙ্গে। গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করি প্রত্যেক জেলার। পাহাড় থেকে সাগর। একটা নির্বাচন, একটা কেন্দ্রও সেই তালিকা থেকে বাদ যায় না।
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। এবারও নেমে পড়ব আমরা। ভোটের আগে। আমরা আবার মানুষের কাছে যাব। প্রশ্ন করব। তারই প্রতিফলন পাওয়া যাবে আমাদের প্রতিবেদনে। তাতে এতটুকু অতিরঞ্জন থাকবে না। রাজনীতি নয়, শোনা যাবে শুধু মানুষের কথা। কারণ, এই শিক্ষাও যে শ্রদ্ধেয় বরুণ সেনগুপ্তর। ‘রাজনীতির খবর কোরো। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে যেও না।’ মনে পড়ে একটি ঘটনা। দিল্লির দরবারে শক্তপোক্ত যোগাযোগের কারণে স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল বরুণবাবুর। পরিচয় ছিল মানেকা গান্ধীর সঙ্গেও। সঞ্জয় গান্ধীর প্রয়াণের পর তিনি গিয়েছিলেন ইন্দিরাদেবীর সঙ্গে দেখা করতে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তখন তাঁর অপর পুত্র রাজীবকে রাজনীতির মূলস্রোতে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। সেই সময়ই মানেকার অনুরোধ ছিল বরুণবাবুর কাছে... শাশুড়িকে বোঝান। আপনি বললে উনি শুনবেন। রাজনীতির এই ব্যাটন যেন পুত্রবধূ হিসেবে আমার হাতেই আসে। হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছিলেন বরুণবাবু। বলেছিলেন, ‘মিসেস গান্ধী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তাঁকে আর বুঝিয়ে লাভ নেই। আর আমার সেটা উচিতও হবে না।’ তবে এর থেকে পড়ে পাওয়া শিক্ষাটা ছিল তাঁর সাংবাদিকদের জন্য। বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে প্রভাব খাটানো সাংবাদিকের কাজ নয়। সেটা করতে গেলেই সম্পর্কে চিড় ধরবে।’
এই শিক্ষাও কিন্তু আমরা ভুলিনি। ভুলবও না। ঠিক এই কারণে রাজনীতির তেলের উপর জলের মতো ভেসে থাকতে পারি আমরা। মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারি খবর। তার মধ্যে কোনও অ্যাকটিভিজমের ছোঁয়া থাকে না। কথা দিতে পারি, ভবিষ্যতেও থাকবে না। এ রাজ্যের সিংহভাগ মানুষ যা চাইবে, আমরা সেটাই লিখব। সেটাই পৌঁছে দেব পাঠকের হাতে। এর প্রতিদানে যদি সত্যিই আপনাদের থেকে আমাদের কিছু চাহিদা থাকে, তা হল... আস্থা। বিশ্বাস। সমর্থন। যেভাবে এত বছর ধরে আপনারা আমাদের পাশে থেকেছেন, ঠিক একইভাবে যেন অদূর ও দূর ভবিষ্যতেও থাকেন। আমাদের সাহস আপনারাই। মানুষের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার। কখনও সেই মানুষ হতে পারেন হাসপাতালে পরিষেবা না পাওয়া রোগী, কখনও ১০০ দিনের কাজের টাকা না পাওয়া দিনমজুর, কখনও আবার চাকরি হারানো শিক্ষক।
প্রতিষ্ঠানের আরও এক জন্মবার্ষিকীতে তাই আপনাদের কাছে একটাই আশা... পাশে থাকবেন। সুস্থ থাকবেন। বরুণ সেনগুপ্তর শিক্ষা, আর আপনাদের সমর্থন—এই দুই স্তম্ভ আমাদের ভিতের উপর মজবুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেই আমরা এগিয়ে যাব। ভগবানকেও ভয় না করে।