Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এখন নীরব কেন?

কয়েকদিন আগের ঘটনা। ১ ডলার= ৮৯.৯৬ টাকা। রেকর্ড করে নজিরবিহীন তলানিতে নামল ভারতীয় মুদ্রা। পতনের সর্বকালীন রেকর্ড গড়ল টাকা।

এখন নীরব কেন?
  • ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কয়েকদিন আগের ঘটনা। ১ ডলার= ৮৯.৯৬ টাকা। রেকর্ড করে নজিরবিহীন তলানিতে নামল ভারতীয় মুদ্রা। পতনের সর্বকালীন রেকর্ড গড়ল টাকা। গোটা বছরজুড়ে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ পতন হয়েছে টাকার দরে। ২০২৫ সালে এশিয়ায় ‘সবচেয়ে খারাপ মুদ্রা’র তকমা জুটেছে টাকার। শুধু মার্কিন ডলারই নয়, সাম্প্রতিক অঙ্কে ব্রিটিশ পাউন্ড-ইউরো, জাপানিজ ইয়েন এবং চীনের ইউয়ান— বিশ্বের এই অন্যতম চার প্রধান কারেন্সির বিনিময় দরেও পতন হয়েছে ভারতীয় মুদ্রার। পরিসংখ্যান বলছে, তিরিশ বছর আগে ১৯৯৫ সালে মার্কিন ডলার সাপেক্ষে ভারতীয় মুদ্রার দর ছিল ৪০ টাকা। এর দশ বছর দশ মাস পর ২০০৫-এ তা বেড়ে হয় ৫০ টাকা। আরও চার বছর সাত মাস পর ২০১০ সালে দর হয় ৬০ টাকা। এর পাঁচ বছর এক মাস পর ২০১৫ সালে ৭০ টাকায় পৌঁছয় ভারতীয় মুদ্রা। সেখান থেকে চার বছর পর ২০২০ সালে এই দর ওঠে ৮০ টাকায়। এর তিন বছর দু’ মাস পর ২০২৫-এর ৩ ডিসেম্বর রেকর্ড ৯০ টাকায় পৌঁছয় ডলারের বিনিময় মূল্য। এবার ১০০-র ঘরে দৌড় শুরু হবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। দেশের যেকোনও বিপর্যয়, বিশেষত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে টালমাটাল অবস্থা দেখা গেলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মৌনব্রত অবলম্বন করেন। টাকার এই অবিশ্বাস্য পতনের সময়েও যথারীতি তিনি মুখে কুলুপ এঁটেছেন! 

Advertisement

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী চুপ থাকলেও অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশেষজ্ঞরা বসে নেই। কেন্দ্রের তরফে অবশ্য বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে যে এই অবমূল্যায়ন রপ্তানি বা মূল্যবৃদ্ধির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। বরং নতুন বছরে টাকার শক্তিবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই পতনের এক ঝাঁক কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ১) ভারতীয় শেয়ার ও ঋণপত্রের বাজার থেকে লগ্নিকারীরা সর্বাধিক লগ্নি সরিয়ে নিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে ভারত থেকে ১.৫৩ লক্ষ কোটি টাকার লগ্নি সরিয়ে নিয়েছে বিদেশি লগ্নিকারীরা। এর ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ নাগাড়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। ২) অশোধিত তেলের আমদানি খরচ বেড়েছে। সাম্প্রতিককালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আনার স্বাভাবিক যাত্রাপথ। এর ফলে ১৭ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পথ উজিয়ে ঘুরপথে তেল বোঝাই ট্যাঙ্কার আসছে ভারতে। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়া থেকে বেশি দামে তেল আমদানি করতে হচ্ছে। এই দুয়ের যোগফলে টাকার উপর চাপ বেড়েছে। ৩) ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তাও টাকার উপর চাপ বাড়িয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, যা টাকার দরে প্রভাব ফেলছে। ৪) বিশ্ববাজার থেকে কেনা পণ্যের দাম মেটাতে দামি ডলার কেনার হিড়িক টাকার উপর চাপ বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, টাকার ক্রমাগত রক্তক্ষরণ কীভাবে আটকানো যায়— তা নিয়ে একমাত্রিক কোনও ফর্মুলা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। অনেকের মতে, এই পরিস্থিতিতে রিজার্ভ ব্যাংকের সক্রিয় পদক্ষেপ জরুরি। আবার অনেকের মতে, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি দ্রুত সেরে ফেলতে না পারলে রিজার্ভ ব্যাংকও কিছু করতে পারবে না। উলটে টাকার দরের আরও পতন হলে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ধাক্কা খেতে পারে। 
বিরোধীদের দাবি, মোদি সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ঠিক থাকলে ভারতীয় মুদ্রার এই পতন হত না। কেন্দ্র যতই শক্তিশালী অর্থনীতির ঢাক পেটাক, টাকার এই অবমূল্যায়ন দেশের আর্থিক নীতিকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে। ঘটনা হল, টাকার পতন নিয়ে একদা মোদি ও তাঁর দলের নেতারা কী বলেছিলেন, এই সুযোগে তা মনে করিয়ে দিয়েছেন বিরোধীরা। যেমন, ক্ষমতায় আসার আগে ২০১৩ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে খোঁচা দিয়ে মোদি বলেছিলেন, ‘টাকার দরে পতন হলে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদার পতন হয়।’ প্রশ্ন হল, তবে কি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা গভীর গর্তে পড়েছে এখন? মনমোহনকে কটাক্ষ করে এও বলেছিলেন, অচিরেই প্রধানমন্ত্রীর বয়সকে ছাপিয়ে যাবে টাকার বিনিময় মূল্য। তা অবশ্য হয়নি। কিন্তু এগারো বছর প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা ৭৫ বছরের মোদির বয়সকে যে ডলার সাপেক্ষে টাকার দর ছাপিয়ে গিয়েছে—তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তার মানে দাঁড়ায়, টাকার পতন আটকাতে মনমোহন সমর্থ হলেও মোদি পুরোপুরি ব্যর্থ। টাকার পতনকে ঘিরে এক দশক আগের যাবতীয় কটাক্ষ, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের জবাব দিতে গিয়ে কংগ্রেস নেতারা এখন প্রশ্ন তুলছেন, ডলার এখন কার বয়সে পৌঁছেছে? কটাক্ষ, পালটা কটাক্ষ নিয়ে এই টানাপোড়েনের আড়ালে আসল যে কথাটা চাপা পড়ে যায় তা হল, কোনও ব্যর্থতার দায়ই মোদি সরকার নিতে নারাজ। টাকার এই রেকর্ড পতন একদিনে হয়নি। বরং চলতি বছরের গোড়া থেকেই এর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। তা দেখেও কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল অনেকটা অসহায় দর্শকের মতো। এবার হয়তো রিজার্ভ ব্যাংককে ঢাল করে যাবতীয় ব্যর্থতা পাশ কাটানোর চেষ্টা হবে। যেমনটা অতীতেও দেখা গিয়েছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ