ভবি ভোলবার নয়! কয়েকমাস আগে বিহার বিধানসভার নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গ, অসম সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোট। ভোটে যাওয়া রাজ্যগুলিতে প্রচারে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, বিভাজনের রাজনীতিকে শিরোধার্য করে অনুপ্রবেশকেই তিনি বিরোধীদের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র করে তুলবেন। এই ইস্যুতে বিহারে তিনি কাঠগড়ায় তুলেছেন বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর লক্ষ্য শাসক তৃণমূল। অসমে কংগ্রেস। গেরুয়াবাহিনীর চোখে ‘অনুপ্রবেশকারী’ মানে বাংলাদেশের মুসলমান ও মায়ানমারের রোহিঙ্গারা। এদের দেশছাড়া করতে এনআরসি, সিএএ জুজুতে বিশেষ কাজ হয়নি দেখে আসরে নেমেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের এসআইআর। নির্বাচনে যাওয়া রাজ্যগুলিতে প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন করা হচ্ছে। ‘সার’ শুরুর আগে হিন্দুত্ববাদীদের দাবি ছিল, প্রতিটি রাজ্যে অন্তত এক কোটির বেশি অনুপ্রবেশকারীর নাম রয়েছে। বাস্তবে দেখা গেল, বিহারে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে যে ৪৭ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে তার মধ্যে কতজন অনুপ্রবেশকারী তা আজও জানাতে পারেনি কমিশন! গত ১৬ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে ৫৮ লক্ষের নাম বাদ থাকলেও অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই। বরং দুই রাজ্যেই দেখা গিয়েছে, প্রত্যাশার তুলনায় হিন্দুদের নাম বেশি সংখ্যায় বাদ পড়েছে। এর চেয়েও নির্মম সত্য হল, অসমে ২০২৬-এ ভোট থাকলেও সে রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের ঝুঁকি নেয়নি কমিশন। কারণ তাতে ক্ষমতাসীন বিজেপির ভোটব্যাংকে চিড় ধরতে পারে। বলাবাহুল্য, প্রধানমন্ত্রী মোদির ভাষণে অত্যন্ত পছন্দের বিষয় হল ‘ঘুসপেটিয়া’। এই ‘ঘুসপেটিয়া’ ধরতেই তো অসমে এনআরসি করা হয়েছিল। তার ফল কী হয়েছে তা অনেকেরই জানা। এখন গোরুর রচনার মতো গল্প ফেঁদে দায় ঠেলে দিচ্ছেন কংগ্রেসের ঘাড়ে।
আসলে অনুপ্রবেশ সমস্যা মোকাবিলায় কেন্দ্র ব্যর্থ হলেও নরেন্দ্র মোদি থামতে রাজি নন। বলা যায়, অনুপ্রবেশের ‘ভূত’ দেখছেন। গত শনিবার অসমে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘অসমের মানুষের পরিচয় নিয়ে কংগ্রেস চিন্তিত নয়। ওরা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বেশি পছন্দ করে। কংগ্রেস ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বাঁচানোর চেষ্টা করছে। তাই তো কংগ্রেস ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।’ মোদির এই অভিযোগ যতটা রাজনৈতিক, ততটা সত্য নয়। প্রথমত, ১৯৪৭-এ দেশভাগ ও ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরি হওয়ার পর পড়শি ওই দেশ থেকে অসম, পশ্চিমবঙ্গ সহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে বহু মানুষ এসেছেন। এরা উদ্বাস্তু, অনুপ্রবেশকারী নয়। দ্বিতীয়ত, ভারত বাংলাদেশ দীর্ঘ সীমান্তের একটা বড়ো অংশে কাঁটাতারের বেড়া না থাকা এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন বিএসএফ কার্যত চোখ বুজে থাকায় গত কয়েক দশকে অনুপ্রবেশও ঘটেছে। এর দায় গত এক দশক ক্ষমতায় থাকা মোদি সরকারও অস্বীকার করতে পারে না। তৃতীয়ত, ওপার বাংলা থেকে যাঁরা এদেশে এসেছেন, তাঁদের একটা বড়ো অংশ হিন্দু, যাঁদের বিভাজনের রাজনীতি মেনে ‘নাগরিকত্ব’ দিতে চায় মোদি সরকার। চতুর্থত, অনুপ্রবেশকারীরা কী করে পাসপোর্ট, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ইত্যাদি পায়— তার দায় অস্বীকার করতে পারে না কেন্দ্রীয় সরকার। পঞ্চমত, অসমে ২০১৯-এ সমীক্ষা করে যে ১৯ লক্ষ নাম এনআরসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে প্রায় ১৪ লক্ষই হিন্দু। মুসলমানের সংখ্যা তিন লক্ষের বেশি নয়। সুতরাং রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের অবতারণা করলে মোদি অনুপ্রবেশকারীদের জন্য জনবিন্যাস পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করতে পারতেন না।
মোদির আরও একটি অভিযোগ হল, স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ ও মুসলিম লিগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অসমকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে ষড়যন্ত্র করেছিল কংগ্রেস। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হল, দেশভাগের নকশায় কখনওই অসমকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ওঠেনি। তখন অসমের অন্তর্ভুক্ত ছিল মুসলিম অধ্যুষিত সিলেট জেলা। এই জেলা ভারত না পাকিস্তান কোনদিকে থাকবে তা নিয়ে গণভোট হয়। বেশিরভাগ ভোট পাকিস্তানের পক্ষে পড়ায় সিলেট চলে যায় পাকিস্তানের অংশে, যা এখন বাংলাদেশের মানচিত্রে রয়েছে। বরং কংগ্রেস সেই সময় বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় করিমগঞ্জ মহকুমা অসমের সঙ্গে থেকে যায়। এই সত্য জানার জন্য রকেট বিজ্ঞান জানার প্রয়োজন নেই। উইকিপিডিয়া দেখলেই জানা যায়। দুর্ভাগ্যের কথা হল, প্রধানমন্ত্রী সেই সামান্য অনুশীলন না করেই একটি বিকৃত ইতিহাস প্রচারে মেতে উঠেছেন! অন্যথায় বলা চলে, তাঁর পরামর্শদাতারা তাঁকে সঠিক তথ্য পরিবেশন করেননি। ঘটনা যাই হোক, প্রশ্ন হল, অনুপ্রবেশকে ইস্যু করে প্রধানমন্ত্রী কি সফল হবেন? বিহারের ভোটে অনুপ্রবেশ দাগ কাটতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গেও অনুপ্রবেশ ভোটে জেতার নির্ণায়ক হওয়ার সম্ভাবনা কম, তা খসড়া তালিকার চেহারা দেখে মনে করছেন খোদ বঙ্গ বিজেপির নেতাদের একাংশ। অসমেও এর ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। এই বাস্তব পরিস্থিতিটা মোদি ও তাঁর বাহিনী যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন, ততই বিজেপির মঙ্গল।