একটা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে সামনে রেখে অবাধ ধ্বংসলীলা, তুমুল অরাজকতা ও অন্ধ ভারত বিদ্বেষের সাক্ষী থাকল বাংলাদেশ। প্রায় দেড় বছর আগে ‘হাসিনা হটাও’ আন্দোলনের অন্যতম মুখ, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিক ওসমান হাদি সপ্তাহখানেক আগে ঢাকার রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হন। তারপর কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হার মানেন ৩২-এর এই যুবক। গত বৃহস্পতিবার রাতে হাদির মৃত্যু সংবাদ আসতেই রাজধানী ঢাকা সহ বাংলাদেশের একাধিক শহরের রাজপথের দখল নেয় উন্মত্ত জনতা। প্রায় সারারাত কয়েক হাজার দুষ্কৃতীর বেপরোয়া, হিংস্র তাণ্ডবে ধ্বংস হয়ে যায় ঢাকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’-এর কার্যালয়, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ‘উদীচী’, দুটি প্রথমসারির সংবাদ মাধ্যমের অফিস এবং অজস্র ঘরবাড়ি দোকান। তাণ্ডবের হাত থেকে রেহাই মেলেনি বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের ভাঙাচোরা বাড়িও। ময়মনসিংহ কাপড় কারখানার হিন্দু শ্রমিক দীপু দাসকে প্রথমে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। তারপর তাকে গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। হাদির হত্যাকারীরা ভারতে গা-ঢাকা দিয়েছে—এই ধুয়ো তুলে ভারতীয় দূতাবাসও আক্রমণের শিকার হয়। হত্যা করা হয় এক সাংবাদিককেও। গোটা ঘটনায় বাংলাদেশের পুলিশ ও সেনা দীর্ঘসময় নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস দায়সারা বিবৃতি দেওয়ায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে জোরালো বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন গভীর অসুখে আক্রান্ত। এই ব্যাধি তাদের কোন অতলে নিয়ে যাচ্ছে তা সম্ভবত তারা নিজেরাও আঁচ করতে পারছে না।
হাদিকে কে বা কারা হত্যা করল, কী তাদের উদ্দেশ্য তা নিয়ে নানা অনুমান চললেও সরকারি তরফে এখনও কোনও ভাষ্য মেলেনি। কিন্তু এই হত্যার ঘটনাকে সুযোগ হিসাবে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জামাত যে হাড়হিম তাণ্ডবের নীল নকশা তৈরি করেছিল— গোয়েন্দা রিপোর্টে তা উঠে এসেছে। বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন ঘোষিত হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ায় এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না শেখ হাসিনার দল আওয়ামি লিগ। ফলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা জামাতের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বিএনপি দলের। কিন্তু গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়ার পক্ষে এই নির্বাচনে প্রকাশ্যে আসাই কার্যত অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে জামাত ক্ষমতা দখলের বিষয়ে অনেকটা নিশ্চিত ছিল। কিন্তু খালেদার ছেলে তারেক সম্প্রতি জানিয়েছেন, তিনি বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসছেন, এই ঘোষণায় বিএনপি চাঙ্গা হবে, নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের ভোটব্যাংক চলে যেতে পারে বিএনপির ঝুলিতে, তাতে ক্ষমতা দখলের স্বপ্নভঙ্গ হতে পারে। পাশাপাশি বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতে চাইবে, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আওয়ামি লিগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় ভুগছে উগ্র মৌলবাদীরা। বাংলাদেশের ভোট রাজনীতির এই অঙ্কে আশঙ্কিত জামাত তাই বাংলাদেশের নির্বাচন আটকাতে মরিয়া বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। নির্বাচন না করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতেই অস্থিরতা, অরাজকতা সৃষ্টির জন্য হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কাজে লাগানো হয়েছে। এই নতুন ব্লুপ্রিন্ট কার্যকর করতে প্রকাশ্য মুখ হল ‘জুলাই যোদ্ধারা’। আর মুখোশ হল জামাত। অনেকের মতে, এই পরিকল্পনায় ‘পুতুল’ ইউনুস সরকার ও সেনার একটা অংশের পরোক্ষ মদত রয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচন না করে ভারত বিরোধী শাসক বসানোর পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে ভারত-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পরিকল্পিতভাবেই। তা না করলে যে বাংলাদেশকে পূর্ণাঙ্গ মৌলবাদী সরকারের আওতায় আনা যাবে না।
গত বছরের ৫ আগস্ট হাসিনার দেশত্যাগ ও ভারতে আশ্রয় নেওয়ার দিন থেকেই ভারত বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বাংলাদেশে। পাকিস্তান বরাবরই ভারতের শত্রুতা করে এসেছে। তাদের মদত ও ইন্ধনে বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তি গত দেড় বছর ধরে ভারতের বিরুদ্ধে লাগাতার বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছে। পরিসংখ্যানও বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু (হিন্দু)দের উপর আক্রমণ কয়েকগুণ বেড়েছে। এই সময়কালে সংখ্যালঘু ও জনজাতি সম্প্রদায়ের উপর প্রায় ৩ হাজারবার হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে। দেড় বছরে রাজনৈতিক হিংসায় বলি হয়েছেন ২৮১ জন। ভারতের মতো বন্ধুবৎসল প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে সে দেশের মানুষকে উস্কানি দেওয়া, লাগামছাড়া ধ্বংসলীলায় প্ররোচনা ও প্রশ্রয় দেওয়া, সংখ্যালঘু হিন্দু নাগরিকদের উপর নির্যাতন নামিয়ে আনা কোনও সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না। অথচ সেটাই প্রায় বিনা বাধায় ঘটে চলেছে বাংলাদেশে। প্রশ্ন উঠেছে, সেখানকার উগ্র মৌলবাদীদের এই হিংসাত্মক কার্যকলাপ এদেশের মৌলবাদীদের উৎসাহিত করবে কি না। আশার কথা, এই জঘন্য ও নিন্দনীয় ধ্বংসলীলার মধ্যেই ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। এই দেশ, এই বাংলাও সেই সুরে সুর মেলাচ্ছে। মৌলবাদ একদিন নিশ্চয়ই মাথানত করবে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারত নাক না গলালেও ‘অকৃতজ্ঞকে’ সবক শেখানোর ক্ষমতা এদেশের আছে। ভারত পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। দেশের নিরাপত্তা রক্ষার্থে তাই যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।