Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ফের সিঁদুরে মেঘ

হুজুগের বিরাম নেই। মোদি জমানায় হুজুগের পূর্ণ তালিকা দেওয়া অসম্ভব। এই মুহূর্তে চলছে এসআইআর। দেশবাসী জল্পনা করছিলেন, তাহলে এরপর কী?

ফের সিঁদুরে মেঘ
  • ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হুজুগের বিরাম নেই। মোদি জমানায় হুজুগের পূর্ণ তালিকা দেওয়া অসম্ভব। এই মুহূর্তে চলছে এসআইআর। দেশবাসী জল্পনা করছিলেন, তাহলে এরপর কী? যেন ‘প্রশ্নপত্র’ প্রকাশের আগেই উঁকি দিচ্ছে ‘উত্তর’। সরকারের মতিগতি বলে দিচ্ছে, দেশজুড়ে এনআরসি কার্যকরের পথ প্রশস্ত হচ্ছে এবার। শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে আসন্ন সেন্সাসের জন্য যে অর্থবরাদ্দ হয়েছে, সেখানে পৃথকভাবে ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টারের (এনপিআর) কোনও উল্লেখ করেনি সরকার। এর অর্থ একটাই—দেশজুড়ে এনআরসি হতে চলেছে সেন্সাসের পরই। আর সেই কারণে শুরু হয়েছে প্রবল জল্পনা। বাজেট বরাদ্দেও এনপিআর খাতে কিছু নেই। সেন্সাসের পর, সামগ্রিক জনসংখ্যা এবং নাগরিকত্বের একটি ডেটাবেস তৈরি করা হয়। এনপিআর হল সেটাই। ২০১০ সাল থেকেই তা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৭ সালের সেন্সাস থেকে এনপিআর প্রক্রিয়াকে বাতিল করা হয়েছে চুপিচুপি। ২০১৯ সালে এনপিআর ঘোষণার পর প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ‘কাগজ দেখাব না’ আন্দোলনের শুরু সেই ইস্যুতেই। এবার এনপিআর প্রক্রিয়াকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই স্পষ্ট, সেন্সাস বা জনগণনা রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে এনআরসি করবে মোদি সরকার। আর সেটা হবে অসমেরই ধাঁচে। কারণ, এনপিআর বাদ দিলে, জনসংখ্যা এবং নাগরিকত্ব ডেটাবেসের একমাত্র মাধ্যমটি হল এনআরসি। সরকারি প্রকল্প সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থবরাদ্দ এবং বাজেট তৈরির জন্য এই ডেটাবেস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা বাহুল্য, উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপে সরকার তা ব্যবহার করে থাকে। 

Advertisement

চলতি এসআইআরের চূড়ান্ত তালিকা ইসিআই প্রকাশ করবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে। তার অব্যবহিত পরে, এপ্রিল থেকেই শুরু হবে আদশুমারির প্রথম ধাপ। অর্থাৎ  হাউস লিস্টিং বা গৃহগণনা। জনগণনা শেষ হবে ২০২৭ সালের মার্চ মাসে। সরকারি সূত্রের খবর, তারপরই মোদি সরকার এনআরসি রূপায়ণে হাত দেবে। পরিকল্পনা সাজা হয়ে আছে এইমতোই। সেন্সাস ২০২৭-এর মার্চে সম্পূর্ণ হলেও তার রিপোর্ট বেরোতে ২০২৮ সাল গড়াতে পারে। আর তারই ভিত্তিতে নেওয়া হবে ডিলিমিটেশন প্ল্যান। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সবটাই আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অনুমেয় যে, ডিলিমিটেশনের ভিত্তিতেই হবে দেশজুড়ে লোকসভা এবং সমস্ত রাজ্যে বিধানসভার আসন পুনর্বিন্যাস। অসমে এনআরসি প্রক্রিয়ার পরই শাসক দল বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকার পরিষ্কার করে দিয়েছিল, দেশজুড়ে এনআরসি সম্পন্ন করা কেবল সময়ের অপেক্ষা। পরবর্তীকালে সংসদের উভয় কক্ষে এই বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে একাধিকবার। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক প্রতিবারই ‘যথাযথ জবাব’ দেওয়ার পরিবর্তে তা কৗশলে ‘এড়িয়েই গিয়েছে’। কেন্দ্রের তরফে জবাব মিলেছে একটাই—‘এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হবে, তখনই জানানো হবে।’ লক্ষণীয় যে, সংসদে সরকার কিন্তু কখনওই ঘোষণা করেনি, ‘এনআরসি হবেই না।’ বরং এটাই জানিয়েছে, ‘কবে হবে সেই সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।’ অর্থাৎ এনআরসি যে মোদি সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ, তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। আগামী এনপিআর নিয়ে মোদি সরকারের নীরবতা এই জল্পনাই বাড়িয়ে দিয়েছে যে, ভারতজুড়ে এনআরসি আসন্ন। পরপর হবে সেন্সাস, এনআরসি, ডিলিমিটেশন। দীর্ঘসূচি সাজা হয়েছে এই মর্মেই। অর্থাৎ এসআইআরের পরেই আসবে আরও তিনটি বড়ো কাজ। 
দেশে একমাত্র অসমেই এনআরসি হয়েছে। তার জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ওই রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়েছিল তা সবার জানা। ওই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে বাঙালি বা বাংলাভাষীরা। তাঁদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষই বেশি। তাই এনআরসির নামে দেশজুড়ে বাংলাভাষী বা বাঙালিরা এখন থেকেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেছেন। তার প্রধান কারণ ১৯৪৭ সালে দেশভাগের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাংলা, বাংলাভাষী এবং বাঙালি জাতির। লক্ষ লক্ষ মানুষ পূর্ববঙ্গ থেকে একবস্ত্রে এদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। বেশিরভাগ শরণার্থীই আশ্রয় নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরায়। আন্দামানসহ আরও কিছু স্থানেও তাঁরা ঘর বেঁধেছেন। পূর্ববঙ্গের হিন্দুরা পিতৃপুরুষের ভিটেছাড়া হয়েছেন একবার নয়—১৯৪৭, ১৯৭১ এবং তারপরও একাধিকবার। স্বাধীন রাষ্ট্রের ক্ষমতায় কিছু নেতার উচ্চপদ নিশ্চিত করতেই ইংরেজের পাতা ফাঁদে ভারতের তৎকালীন (১৯৪৭) নেতৃত্ব পা দিয়েছিলেন। কিছু মানুষের ক্ষমতার কাঙালিপনার মাশুল বাংলা ‌ও বাঙালি ৭৮ বছর ধরে গুনে চলেছে। নিস্তার মেলেনি আজও। আগামীদিনেও তাঁদের জ্বালিয়ে মারার জন্যই সবরকমে তৈরি হচ্ছে মোদি সরকার। ধন্য ভারতের রাজনীতি, ধন্য রাজনীতির কারবারিদের ক্ষমতালিপ্সা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ