Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মানসিকতার বদল হবে?

নামে কি সত্যিই কিছু এসে যায়?

মানসিকতার বদল হবে?
  • ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নামে কি সত্যিই কিছু এসে যায়? নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সনাতনী হিন্দুধর্ম প্রতিষ্ঠার বার্তা দিতে দেশের বহু সরকারি প্রতিষ্ঠান, দর্শনীয় স্থান, রেলস্টেশনের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। বদলে গিয়েছে কংগ্রেস আমলে চালু হওয়া বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের নাম। নিজের অহং প্রতিষ্ঠায় জীবদ্দশাতেই মোদি নামে একটি স্টেডিয়ামও করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী। আর দেশের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে জনপ্রিয় জনকল্যাণমূলক ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পের নামও বদলে দিতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে এবং গ্রামের গরিব পরিবারে বছরে ১০০ দিন কাজ নিশ্চিত করতে কংগ্রেস আমলে ২০০৫ সালে চালু হয়েছিল ‘মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্ম নিশ্চয়তা যোজনা’। মোদির সরকার সেটাকেই ‘পূজ্য বাপু গ্রামীণ রোজগার নিশ্চয়তা যোজনা’ করতে চলেছে। জাতির জনক গান্ধীজির নামের সঙ্গে ‘মহাত্মা’ জুড়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাম্প্রতিক ‘বন্দেমাতরম্‌’ গান নিয়ে বিতর্কে সাম্প্রদায়িকতার ধুয়ো তুলে পরোক্ষে রবীন্দ্রনাথকে অসম্মান করেছেন গেরুয়া শিবিরের কেউ কেউ। সেই আবহে রবীন্দ্রনাথের দেওয়া ‘মহাত্মা’ তুলে প্রকল্পের নাম ‘পূজ্য বাপু’ করা হচ্ছে কি না— সেই প্রশ্ন উঠেছে। গান্ধীজিকে ‘বাপুজি’ বলেও সম্বোধন করা হয়। বাপু আদতে গুজরাতি শব্দ, যার অর্থ পিতা। পূজ্য বাপু মানে পূজনীয় পিতা। সুতরাং প্রকল্পের নাম থেকে ‘মহাত্মা’-কে বাদ দিয়ে ‘পূজ্য বাপু’ রাখায় রবীন্দ্রনাথকেও খানিক হেয় করার চেষ্টার পাশাপাশি সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়াই যে প্রধান উদ্দেশ্য— তাতে সন্দেহ নেই।

Advertisement

নাম বদল নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ১০০ দিনের প্রকল্প নিয়ে মোদি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভূমিকা কতটা সদর্থক, সেই প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি ফের সামনে এসেছে। প্রথমত, এই প্রকল্পে একটি পরিবারকে ১০০ দিন কাজের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু গত দু’দশকে মূল্যবৃদ্ধির কারণে বছরে নিশ্চিত কাজের দিনের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০০ দিন করার দাবি উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। সেই দাবি উড়িয়ে কেন্দ্র ন্যূনতম কাজের দিন ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করতে চলেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে উত্তম উদ্যোগ। কিন্তু এ হল বাস্তবকে আড়াল করে সস্তা কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা। ঘটনা হল, মোদি জমানায় এই প্রকল্পের ইতিহাসে দেশের কোনও রাজ্যেই জবকার্ডধারী মানুষ বছরে ১০০ দিন কাজ পেয়েছে, তেমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বরং এই অভিযোগ উঠেছে, ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্য উত্তরপ্রদেশের বেনারসে (মোদির নির্বাচনী কেন্দ্র) বহু পরিবার ২০-২৫ দিনের বেশি কাজ পায় না! এমনকি কিছু পরিবার বছরে পাঁচ-দশ দিন কাজ পেলেই নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন। পশ্চিমবঙ্গে এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বদান্যতায় কেন্দ্র টাকা আটকে রাখা সত্ত্বেও বছরে ৬০ দিনের মতো কাজ পাচ্ছেন জবকার্ডধারীরা। সুতরাং ১০০ দিনের কাজই নিশ্চিত না করে ১২৫ দিন করার ভাবনার মধ্যে চমক ছাড়া আর কিছু নেই। দ্বিতীয়ত, এই প্রকল্পে দৈনিক ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ২৪০ টাকা করতে চলেছে কেন্দ্র। ঘটনা হল, ভারতে প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই বর্তমানে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে কাজ করলে দৈনিক ২৪০ টাকার বেশি মজুরি মেলে। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ মজুরি দেয় হরিয়ানা, দৈনিক ৩৭৪ টাকা। সর্বনিম্ন নাগল্যান্ড ও অরুণাচলপ্রদেশ। সেখানে দৈনিক মজুরি ২৩৪ টাকা। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পের মজুরি ২৫০ টাকা করা হচ্ছে। এই কারণেই সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল দৈনিক মজুরি ৪০০ টাকা করার সঙ্গত দাবি তুলেছে। কিন্তু শুনছে কে? বরং ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর কথা বলে মিথ্যাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। 
আসলে এই প্রকল্পটি চালু রাখা কিংবা তার নাম বদল করা হলেও মোদি সরকারের অর্থনীতির নিয়মমেনেই গ্রামীণ জনগণকে যে আরও অন্ধকারের পথে ঠেলে দেওয়াই উদ্দেশ্য, গত কয়েক বছরের বাজেটের দিকে চোখ রাখলেই তা পরিষ্কার হবে। দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় বাজেটে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে ২০২০-২১ অর্থবর্ষে ১ লক্ষ ১১ হাজার ১৭১ কোটি, ২০২১-২২-এ ৯৮ হাজার ৪৬৮ কোটি, ২০২২-২৩-এ ৯০ হাজার ৮১০ কোটি, ২০২৩-২৪ সালে ৮৯ হাজার ২৬৮ কোটি এবং ২০২৪-২৫-এ ৮৫ কোটি ৮৩৯ টাকা খরচ করা হয়েছে। তার মানে এই পাঁচ বছরে ২৫ হাজার কোটির বেশি অর্থ কম খরচ করা হয়েছে। যদিও চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। এর সঙ্গেই যোগ হয়েছে বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির প্রাপ্য আটকে রাখার নোংরা খেলা। এ রাজ্যে সরকারের দাবি মতো ৫২ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে না কেন্দ্র। এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশ নিয়েও টালবাহানা করেছে তারা। সব মিলিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের ৯২০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ বকেয়া রয়েছে কেন্দ্রের কাছে। যে প্রকল্পে দেশের প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি মানুষ যুক্ত, সেই প্রকল্প নিয়ে এমন ছেলেখেলার মধ্যে প্রকল্পের নাম বদল বা দিন ও মজুরি সামান্য বাড়ানোর চেষ্টার মধ্যে গেরুয়া শিবিরের ভোটের রাজনীতির অঙ্ক স্পষ্ট।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ