তখনও গোটা দেশে জিএসটির নতুন হার চালু হয়নি। কিন্তু এবছরের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে যে তা কার্যকর হবে, সেই ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। সেই অন্তর্বর্তী সময়ে গোটা দেশ দেখল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে থামিয়ে রাখা যাচ্ছে না। যেমন, ১৫ আগস্ট লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারতকে স্বাবলম্বী করার জন্য পরবর্তী প্রজন্মের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। আমি দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, দীপাবলি ও ছটপুজোর আগে দ্বিগুণ আনন্দের ঝলক দেখা যাবে। সেই প্রতিশ্রুতি সরকার রক্ষা করেছে।’ তারপরে একদিন বলেছেন, ‘এই সিদ্ধান্তে একুশ শতকে দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন অগ্রগতি হবে।’ আবার এও বলেছেন, ‘জিএসটি ২.০ জাতির প্রতি সহায়তা ও দেশের আর্থিক বৃদ্ধির ‘ডবল ডোজ’ হবে’। জিএসটি চালুর আগের দিন বিকালে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামীকাল (২২ সেপ্টেম্বর) থেকে দেশবাসীর সাশ্রয় শুরু হবে। এর ফলে দেশবাসীর সঞ্চয় বাড়বে, পণ্য সস্তা হবে।’ নতুন জিএসটি-কে নবরাত্রির নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে তুলনা করেন মোদি। প্রধানমন্ত্রীর মতো দেশের অর্থমন্ত্রীও জিএসটি নিয়ে উচ্ছ্বাস চেপে রাখেননি।
তারপর মাত্র আড়াই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যেই দেশের সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ের প্রকৃত চেহারাটা বেআব্রু করে দিয়েছে মোদি সরকারেরই অর্থ মন্ত্রকের অধীন সংস্থা ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি’র রিপোর্ট। গ্রাম ও শহরের মানুষের গড় মাসিক খরচের উপর জিএসটির নয়া হারের প্রভাব বিশ্লেষণ করে তারা দেখিয়েছে, এতে গ্রামের মানুষের খরচ কমেছে মাসে ৩৪ টাকা, শহরে ৬০ টাকারও কম। সামগ্রিকভাবে আগে যেখানে সাধারণ মানুষের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পণ্য ও পরিষেবা কর মেটাতে হত, এখন তা কমে হয়েছে ৪ থেকে ৬ শতাংশ। অর্থাৎ জিএসটির দায় কমেছে গড়ে ১ শতাংশ। গোটা দেশে এক কর ব্যবস্থা চালু করতে ২০১৭ সালে প্রথম জিএসটি চালু করে মোদি সরকার। সেই থেকে জিএসটি ২.০ চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত পণ্য বিশেষে করের চারটি হার চালু ছিল যথাক্রমে ৫, ১২, ১৮ এবং ২৮ শতাংশ। ২৮ শতাংশের উপর চাপানো হত সেস। এখন মূলত দুটি স্ল্যাব (৫, ১৮) চালু হয়েছে। এর বাইরে কিছু বিলাসী বস্তু ও তামাকের মতো ক্ষতিকর পণ্যে ৪০ শতাংশ হারে কর বসানো হয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, এই কর সাধারণ মানুষকে দিতে হবে না। কিন্তু এত পরিকল্পনা, এত আয়োজন, এত দাবি, এত প্রচার যে আসলে পর্বতের মূষিক প্রসব করেছে, জিএসটির হার কমলেও সাধারণের সাশ্রয় যে সামান্যই তা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে কেন্দ্রই।
প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, যতটা জিএসটি কমেছে, তার পুরো সুবিধাই মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াটা নিশ্চিত করবে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু এটা গোড়া থেকেই পরিষ্কার ছিল, শিল্পমহল ও বিমা সংস্থার অনেকে জিএসটির পুরো সাশ্রয় সাধারণের হাতে তুলে দেবে না। ঘটনা হল, আগে অসাধু কারবার রুখতে মুনাফা আটকানো প্রতিরোধ সংস্থা ছিল। তাদের কাছে বহু অভিযোগও জমা পড়েছিল। কিন্তু চলতি বছরেই এই ব্যবস্থা কেন্দ্র তুলে দেওয়ায় এখন বাড়তি মুনাফালুটেরাদের আটকাতে কার্যত কোনও ব্যবস্থা নেই। অঙ্কের হিসেবে হয়তো জিএসটি কমায় বাজারে কেনাকাটা কিছুটা বেড়েছে। তাতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধা গ্রাম-শহরের সাধারণ মানুষ বিশেষ পাচ্ছেন না। এর মূলত তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এক, বাজারে নিত্যপণ্যের অগ্নিমূল্য থাকায় জিএসটি কমলেও বিশেষ সুবিধা মিলছে না। দুই, জিএসটি কমায় বহু পণ্যের দাম চুপিসারে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আম জনতার লাভের গুড় ব্যবসায়ীরা খাচ্ছে। তিন, বহু পণ্যে এখনও পুরোনো দামই বহাল আছে। এসবের নিট ফল হল, জিএসটির হার অনেকটা কমলেও গত বছরের নভেম্বর মাসের তুলনায় এ বছর নভেম্বরের কর আদায় বেড়েছে মাত্র ০.৭ শতাংশ। সবচেয়ে বড়ো কথা হল, জিএসটির নতুন হার চালুর সময় স্বদেশি পণ্য কেনাবেচায় জোর দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ দেখা যাচ্ছে, নভেম্বরে দেশীয় জিএসটি আদায় হয়েছে ১,২৪,৩০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের নভেম্বরের তুলনায় ২.৩ শতাংশ কম। সুতরাং প্রশ্ন হল, জিএসটি ২.০ নিয়ে যতটা গর্জন হল, ততটা বর্ষণ হল কি? আম জনতাই বা কতটা উপকৃত হল? সামান্যই।