Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া

এক যুগ অতিক্রান্ত। ২০১৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নরেন্দ্র মোদিকে বিজেপি/এনডিএর ‘প্রধানমন্ত্রী মুখ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া
  • ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

এক যুগ অতিক্রান্ত। ২০১৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নরেন্দ্র মোদিকে বিজেপি/এনডিএর ‘প্রধানমন্ত্রী মুখ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। দলের একাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় নেতাকে বাদ দিয়ে সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস/ইউপিএ-কে মোকাবিলার দায়িত্ব গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে যে ব্যক্তিকে কেউই কখনও দেখেনি, অথচ গোধরা কাণ্ডে যাঁর নাম নিয়ে বিস্তর বিতর্ক, সেই নেতাই আরএসএস/বিজেপির প্রথম পছন্দ! বিস্ময়ের বড়ো কারণ ছিল সেটাই। যাই হোক, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন দেখিয়ে দিল, পার্টি, এনডিএ, আরএসএস কাউকেই হতাশ করেননি মোদি। তিনি বাজিমাত করেছিলেন যে ইশ্যুতে সেটা আর কিছু নয়, বেকারত্ব। যে দেশে ঘরে ঘরে বেকার বা সবচেয়ে বড়ো বাহিনীর নাম বেকারবাহিনী—সেই দেশের রাজনীতিতে এর চেয়ে পছন্দের তাস যে আর কিছু হতে পারে না, মোদি তা চিনে নিতে একটুও ভুল করেননি। ভোটের প্রচারে তাঁর দাবি ছিল, হাতে হাতে কাজ দিলে এই বেকাররাই সবচেয়ে বেশি সম্পদ সৃষ্টি করতে পারবেন। কিন্তু কংগ্রেসের ভুল নীতি, অকর্মণ্যতা, ব্যর্থতা, অপদার্থতার জন্যই কোটি কোটি যুবক-যুবতি বেকার, তাঁদের দুর্দশার অন্ত নেই। মোদি দাবি করেন, তিনি সরকার গড়তে পারলে বছরে দু-কোটি চাকরি দেবেন!

Advertisement

কিন্তু গত একদশকে, মোদি জমানায় সরকারি চাকরি কজনের হয়েছে, এই প্রসঙ্গ উত্থাপন আর সরকারকে লজ্জা দেওয়া সমার্থক ব্যাপার। কেননা, মোদি জমানায় কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে এবং কেন্দ্রীয় সরকার অধিগৃহীত ও পরিচালিত সংস্থাগুলিতে শূন্যপদের পাহাড়ই জমেছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নিয়োগ হয়নি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমানুপাতে অতিরিক্ত শূন্যপদ সৃষ্টির কোনও কথাই নেই। এরপর বাকি থাকে বেসরকারি ক্ষেত্র। সেখানেও নিয়োগচিত্র যে আশাব্যঞ্জক নয়, কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যানেই তা পরিষ্কার। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫—এই দু-বছরের ব্যবধানেই সারা দেশে ইপিএফ গ্রাহকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে প্রায় পৌনে ৯ লক্ষ। শ্রমমন্ত্রকের অন্তর্ভুক্ত কর্মচারী ভবিষ্যনিধি সংগঠনের (ইপিএফও) পে-রোল ডেটা রিপোর্ট বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে সারা দেশে নেট পে-রোল বা মোট ইপিএফ সদস্যের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩৮ লক্ষ ৫১ হাজার ৬৮৯। ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩১ লক্ষ ৪৮ হাজার ২০৪-এ। তারপরের অর্থবর্ষে ইপিএফের নেট পে-রোল আরও কমেছে, যা চিন্তার বিষয়। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই সংখ্যা হয়েছে ১ কোটি ২৯ লক্ষ ৭৮ হাজার ১৬৮। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, একইসঙ্গে ইপিএফের মতো সামাজিক সুরক্ষা পরিষেবার আওতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া সদস্যের সংখ্যাও ওই তিনবছরে ক্রমে বেড়েছে। ২০২২-২৩ সালে ১ কোটি ৩৩ লক্ষ, ২০২৩-২৪ সালে ১ কোটি ৪৯ লক্ষ এবং ২০২৪-২৫ সালে ১ কোটি ৮৩ লক্ষ সদস্য ইপিএফও ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। তবে তাঁরা চাকরি খুইয়েছেন, নাকি স্বেচ্ছায় ইপিএফও ছেড়েছেন—রিপোর্টে তা পরিষ্কার নয়। বাস্তব যাই হোক, তথ্যটি কেন্দ্রের জন্য যথেষ্ট অস্বস্তিকর। 
এই প্রসঙ্গেই আসে প্রধানমন্ত্রী ইন্টার্নশিপ স্কিম (পিএমআইএস) কাহিনি। তরুণ বেকারদের কর্মজীবনে এগিয়ে দিতেই মোদি সরকার একপ্রকার ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রকল্পটি ঘোষণা করেছিল। কিন্তু অল্প দিনেই ভাটা পড়েছে সেই উৎসাহে। এই সত্য কেন্দ্র কার্যত মেনেও নিয়েছে। প্রকল্পটি চালু হয় গতবছর অক্টোবরে। নামী সংস্থাগুলিতে অন্তত এক কোটি তরুণ-তরুণীকে ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পটির হালফিল দশা কেমন? লোকসভায় তৃণমূলের তরফে উত্থাপিত প্রশ্নের যে জবাব এসেছে তা তাৎপর্যপূর্ণ। কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক জানিয়েছে, প্রথম দফায় ৬০ হাজার এবং দ্বিতীয় দফায় ৭১ হাজারের বেশি প্রার্থীকে ইন্টার্নশিপের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে যোগ দেন মাত্র ১৬ হাজার জন। এমনকি, ইন্টার্নশিপ মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার নজিরও ভূরি ভূরি। ১২ মাসের ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার আগেই তা ছেড়ে দিয়েছেন ৪১ শতাংশ শিক্ষানবিশ। অর্থাৎ বেশিরভাগ তরুণ-তরুণীর কাছে কেন্দ্রীয় প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্যই মনে হয়নি। আবার ইন্টার্নশিপ করতে করতেও হতাশ হয়েছেন বহুজন। কিন্তু কেন? তার উত্তর নিহিত কেন্দ্রের দেওয়া নিম্নোক্ত পরিসংখ্যানে: ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছ থেকে চাকরির অফার পেয়েছেন মাত্র ৯৫ জন! পিএমআইএস প্রকল্পে ২০২৫-২৬ সালের জন্য বরাদ্দ ছিল ১০,৮৩১ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তার মধ্যে খরচ হয়েছে মাত্র ৭৩.৭২ কোটি টাকা। বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ার এর চেয়ে উত্তম উদাহরণ আর কী হতে পারে? যুব শ্রেণি এবং বেকার বাহিনীকে ভোটব্যাংকের ঊর্ধ্বে ভাবা প্র্যাকটিস করতে হবে। না-হলে এই ব্যর্থতা, হতাশার পুনরাবৃত্তি কোনোকালেই বন্ধ হবে না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ