হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার (আইএমএফ)! ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতি নিয়ে যে দাবি করে চলেছে মোদি সরকার, তা যে ভালোরকম জল মেশানো প্রকারান্তরে সেকথাই জানিয়ে দিল আইএমএফ তাদের বার্ষিক রিপোর্টে। শুক্রবারই কেন্দ্র জানিয়েছে, গত জুলাই-সেপ্টেম্বরের ত্রৈমাসিকে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৮.২ শতাংশ। এর মধ্যে কল-কারখানায় উৎপাদন বেড়েছে ৯.১ শতাংশ, পরিষেবা ক্ষেত্রে ১০.২ শতাংশ। গত আঠারো মাসে এই বৃদ্ধির হার সর্বাধিক। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন) এই হার ছিল ৮ শতাংশ। সরকারের দাবি, চলতি অর্থবর্ষের শেষে জিডিপির হার ৭ শতাংশের বেশিই হবে। স্বভাবতই প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী আর্থিক উন্নতির এই দ্রুত শ্রীবৃদ্ধিতে যারপরনাই উল্লসিত। মোদি বলেছেন, এ হল কেন্দ্রের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ ও আর্থিক শৃঙ্খলার সুফল। কিন্তু কথায় আছে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। ভারতের অর্থনীতি নিয়ে বৃহস্পতিবারই আইএমএফ-এর বার্ষিক পর্যালোচনা রিপোর্ট সামনে এসেছে। তাদের মূল্যায়নে ভারতের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্ট ডেটা বা জাতীয় হিসেব পরিসংখ্যানকে ‘সি’ গ্রেড দিয়েছে আইএমএফ। চারটি গ্রেডের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অর্থভাণ্ডারের এই মূল্যায়নের মধ্যে রয়েছে দেশের জিডিপি, পণ্য পরিষেবার মোট মূল্যায়নের তথ্য ইত্যাদি। ভারতের ‘সি’ গ্রেড প্রাপ্তির কারণ হল, অর্থনীতি সংক্রান্ত যে সব তথ্য প্রকাশ করেছে দিল্লি তা যথেষ্ট নয়। এতে পদ্ধতিগত বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে, যার ফলে ঠিকমতো নজরদারি চালানোই সম্ভব হয়নি। মোদ্দা কথায়, হিসেবের তথ্যে খামতি রয়েছে। সন্দেহ নেই, আর্থিক বৃদ্ধি নিয়ে মোদি সরকারের উল্লাসের বেলুন ফাটিয়ে দিয়েছে আইএমএফ।
সরকারের সাফল্য দেখাতে মোদিবাহিনীর এমন অপপ্রচার নতুন নয়। এই প্রচারের মূল ভিত্তিই হল জল মিশিয়ে তথ্য পরিসংখ্যান তুলে ধরা। এই কাজে ধরা পড়ে গেলে বা প্রকৃত সত্য প্রকাশ্যে এলে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মাপকাঠি বা সূচককেই চ্যালেঞ্জ করে নিজেদের দাবিকে অসত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করে প্রচার চালানো। আবার, তথ্যের মারপ্যাঁচে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করার উদাহরণও কম নয়। ক্ষুধা সূচকের কথাই ধরা যাক। বিশ্ব ক্ষুধা সূচক তৈরি হয় অপুষ্টি, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ওজন নির্দিষ্ট উচ্চতার তুলনায় কম, এই বয়সি শিশুদের উচ্চতা নির্দিষ্ট বয়সের তুলনায় কম এবং শিশু মৃত্যুর হার—এই চার মাপকাঠির ভিত্তিতে। তালিকায় ভারতের স্থান ১০২ জানার পরেই রে রে করে উঠেছে মোদি সরকার। গোটা দুনিয়ায় ক্ষুধা সূচক নির্ণয়ের এই মাপকাঠি স্বীকৃত হলেও কেন্দ্রীয় সরকার তা মানতে নারাজ! ফলে অসত্য প্রচার চলছেই। আবার, প্রায় ১৪৫ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে যে জিডিপি’র হার বেশি হবে এবং তার ভিত্তিতেই যে এদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠেছে যে কোনও অর্থনীতিবিদই তা জানেন এবং মানেন। কিন্তু মাথাপিছু আয়ে ভারত যে বিশ্বে ১৩৬তম স্থানে রয়েছে, সেই নির্মম সত্য আড়াল করে কৃত্রিম সাফল্যের ঢাক পেটানো হচ্ছে প্রতিদিন।
জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে মোদিবাহিনীর প্রচারের আড়ালে আসল ‘ত্রুটি’টা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আইএমএফ। ভারতে জিডিপি হিসেব করার জন্য ২০১১-১২ সালকে এখনও ‘ভিত্তি বর্ষ’ হিসাবে ধরা হচ্ছে। অথচ তার পরের দেড় দশকে মানুষের খরচের অভ্যাস, বর্তমান খরচের ধারা, উৎপাদন কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে অনেকটাই— যা ভিত্তি বর্ষের সময়কালের হিসাবে ধরা পড়ে না। তাছাড়া, জিডিপি মাপার ক্ষেত্রে উৎপাদন ও খরচের হিসাবও সামঞ্জস্যহীন। এতে জিডিপি বৃদ্ধির প্রকৃত ছবিটা ধরা পড়ে না। আইএমএফ-এর এই পর্যালোচনাকে শিরোধার্য করে মান্যতা দেওয়া দূরের কথা, উল্টে একে পাত্তা না দিয়ে সরকারের অসত্য সাফল্যের প্রচার চলছে! মোদি সরকারের দেওয়া তথ্য ও বাস্তব সত্যের মধ্যে যে বিস্তর অমিলের কথা তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার। তাতে খুশি বিরোধীরা। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাও হল, বাজারে নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া দাম হলেও সরকার দাবি করেছে মূল্যবৃদ্ধি কমেছে! অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, আর্থিক তথ্য প্রকাশের মূল্য উদ্দেশ্য সাফল্যের প্রচার হলে তাতে স্বচ্ছতা থাকে না। আইএমএফ এই স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এতে গোটা বিশ্বের কাছে ভারতের মুখ পুড়তে পারে। বিদেশি লগ্নিতে প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু ধরা পড়ে গিয়ে মুচলেকা দিয়ে নিজেদের শুধরে নেওয়া দূরে থাক, ঝুলি থেকে বেরিয়ে পড়া বিড়ালকে কী করে ঝেড়ে ফেলা যায়, মোদিবাহিনী নিশ্চয়ই এবার সেই পরিকল্পনা সাজাবে।