এই পৃথিবীতে সমস্ত সৃষ্টির বিনাশ বা মৃত্যু একটি অনিবার্য সত্য। জীব কিংবা জড় সমস্ত বস্তুই এই বন্ধনীভুক্ত। বস্তুত প্রতিটি সৃষ্টি নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেদিকে এগিয়ে যায়, সেটি বিনাশের দিক ছাড়া অন্যকিছু নয়। মৃত্যু অনিবার্য এবং ‘স্বাভাবিক’ হলেও তা আমাদের শোকাচ্ছন্ন করে। আর ‘অস্বাভাবিক’ মৃত্যুর ধাক্কা আরও বেশি, সেটা সাধারণ মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু যে-মানুষের ‘দৈহিক মৃত্যু’ই হয়নি, তাকেও যদি ‘মৃত’ আখ্যা দেওয়া হয়, সেই ঘটনা তার নিকটজনদের ক্ষুব্ধ করে। তবু এই ‘অবাঞ্ছিত’ কাণ্ড মাঝেমধ্যেই আমাদের নজরে আসে। কোনও কোনও রোগীকে পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ছাড়াই ডাক্তার ‘মৃত’ ঘোষণা করে দিয়েছেন, এমন ঘটনা বিরল নয়। কোনও ব্যক্তি দীর্ঘদিন ‘নিরুদ্দেশ’ থাকার পর রটে যায় কিংবা ধরে নেওয়া হয় যে তার ‘মৃত্যু’ হয়েছে। এই ধরনের মানুষকে পরবর্তীকালে ‘জলজ্যান্ত’ প্রত্যক্ষ করে অন্যরা যুগপৎ অবাক এবং খুশি হয়। বলা বাহুল্য, হই হই পড়ে যায় এলাকায়। তবে এই ধরনের অস্বাভাবিকতার পিছনে কোনও ষড়যন্ত্র থাকলে ষড়যন্ত্রকারী অবশ্যই প্রমাদ গোনে। আর্থিক বা বৈষয়িক স্বার্থে কোনও কোনও মানুষ, এমনকি অতিনিকটজনও এমন ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। পুলিশে, আইনের দরবারে এই ধরনের কাহিনি ঘোরাফেরা করে ভূরি ভূরি। কিছু ঘটনা মিডিয়ায় সংবাদ হিসেবে প্রকাশ পায়। এসব কাহিনিকে উপজীব্য করে নানা ভাষায় রোমহর্ষক গল্প উপন্যাস নাটক কাব্য প্রভৃতি লেখা হয়েছে; তৈরি হয়েছে কাহিনিচিত্র; মঞ্চস্থ হয়েছে নাটক থিয়েটারও।
উপর্যুক্ত ক্ষেত্রগুলিতে সরকারি প্রশাসনের কোনও ভূমিকা লক্ষণীয় নয়। ফলে ব্যাপারগুলি আজব আজগুবি বিরক্তিকর প্রভৃতি যাই হোক না কেন, তার পরিণতি কম বিপজ্জনক। সেসব ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছে, আদালতে গিয়ে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে কঠোর পদক্ষেপ দাবি করার সুযোগ থাকে। কিন্তু এমন কেলেঙ্কারি যদি খোদ সরকার বা কোনও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের তরফে হয়ে থাকে তখন সেই ক্ষোভ মাত্রা ছাড়ায়। যেমনটা এবার ঘটেছে এসআইআর’কে কেন্দ্র করে—বিহারের পর সম্প্রতি বাংলায়। ভোটার তালিকা স্বচ্ছ সুন্দর করে তোলার নামে বহু নির্দোষ মানুষকে নানাভাবে বিপাকে ফেলা হচ্ছে। এমনকি কিছু ‘জীবিত’ মানুষকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে ‘মৃতের তালিকায়’! এমনই কিছু সুস্থ সবল নারী পুরুষ মঙ্গলবার খসড়া ভোটার তালিকায় নিজেদের ‘মৃত’ আবিষ্কার করে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে গিয়েছেন। বাংলার উত্তর থেকে দক্ষিণ—প্রায় সর্বত্র এমন জীবিত অথচ ভোটার তালিকায় ‘মৃতের’ একের পর এক সন্ধান মিলেছে। কিন্তু হঠাৎ কীভাবে ‘মারা গেলেন’ তাঁরা?
এই কেলেঙ্কারির দায় কার? ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) ছাড়া আর কারও উপরেই বর্তায় না। ইসিআই কর্তারা এই দায় মেনে নেবেন কি? আমাদের ‘ঐতিহ্য’ এত বড়ো ভরসা দেয় না। নিজ দায় স্বীকার করে যথোচিত পদক্ষেপ করার দৃষ্টান্ত উপরতলার কর্তারা কখনও দেখিয়েছেন বলে স্মরণকালের মধ্যে নজরে আসেনি। তাঁরা যেটা করবেন, চারিদিকে ‘বলির পাঁঠা’ খুঁজবেন। এই ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সহজ শিকারের নাম বিএলও, এইআরও প্রভৃতি। পরিকল্পনার অভাব, পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা, অযথা তাড়াহুড়ো করা প্রভৃতির দায় কি কমিশন নেবে? আশঙ্কা হয় যে, ইসিআই কর্তারা এই দায় ঠেলবেন বেচারা বিএলও, এইআরওদেরই ঘাড়ে। ইতিমধ্যেই বিএলওদের শোকজ করা শুরু হয়েছে—বুধবার পর্যন্ত খবর ১০ জনকে। ওইসঙ্গে এইআরওদেরও শোকজ করার খবর মিলেছে। অথচ ভোটার তালিকা ‘সাদা’ করার ঢাক পিটিয়ে একজনেরও জীবন ‘কালো’ করার কোনও অধিকার কমিশনের নেই। তাদের এই অনধিকার চর্চার কারণে যদি কোনও দুর্বলচিত্ত ভোটারের প্রাণ যায়! তার দায় ইসিআই এবং কেন্দ্রীয় সরকারকেই নিতে হবে। কারণ বাংলাসহ একাধিক রাজ্যের ঘোর আপত্তি অগ্রাহ্য করেই চলছে চলতি এসআইআর। এর পিছনে কমিশন গণতন্ত্ররক্ষার সাফাই দিলেও মোদি সরকার এবং কেন্দ্রীয় শাসক দলের বিশেষ স্বার্থসিদ্ধির দিকটি অস্বীকার করা কঠিন।