কৃষিপ্রধান ভারতে তাঁর মুখে শুধুই কৃষকের স্বপ্নপূরণের কথা! কখনো কৃষিপণ্য ন্যায্য সহায়ক মূল্যে কেনার প্রতিশ্রুতি, কখনো ন্যূনতম মজুরি প্রদানের অঙ্গীকার, আবার কখনো কৃষি যন্ত্রাংশ কেনায় ভরতুকির আশ্বাস, কখনো বা ঋণ মকুবের কথা। অধুনা আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার আগেও দেশের কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ সর্বাগ্রে রক্ষা করার শপথের কথা বারবার শোনা গিয়েছে তাঁর মুখে। কিন্তু বিভিন্ন সময় তথ্যই বুঝিয়ে দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যা বলেন তা আসলে সস্তা প্রচারের কথা। বাস্তব সত্য ঠিক উলটো। ঠিক যেমন এটা আর কোনো গোপন কথা নয় যে, মোদি আসলে দেশের সেই ‘মুষ্টিমেয়’ শ্রেণির পরম মিত্র, যাদের হাতে সম্পদের একটা বড়ো অংশ মজুত। মোদি জমানায় এদের সম্পদ বাড়ছে, মুনাফা বাড়ছে তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণ মকুবের পরিমাণও। তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশের সিংহভাগ কৃষকের জন্য নয়, তাঁর ডিএনএতে রয়েছে মুষ্টিমেয় কর্পোরেটদের তোষণের দর্শন। এ আর কোনো অভিযোগ নয়, তাঁর সরকারের সিলমোহর দেওয়া সত্যকথন। তাতে দেখা যাচ্ছে, গত দশ বছরে কৃষিক্ষেত্রে যত ঋণ মকুব করেছে কেন্দ্রীয় সরকার, তার দশ গুণ বেশি মকুব হয়েছে কর্পোরেটে!
খুব সম্প্রতি সংসদে কর্পোরেট ও কৃষিক্ষেত্রে ঋণ মকুবের যে তথ্য পেশ করা হয়েছে সেখানেই এই চরম বৈষম্য প্রকট হয়ে ধরা পড়েছে। যেমন, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ— এই দশ বছরে শুধু কর্পোরেট ক্ষেত্রের জন্য ঋণ মকুব করা হয়েছে যথাক্রমে ১৭ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা, ৩০ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা, ৫৫ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা, ৮০ হাজার ২২৪ কোটি টাকা, ১ লক্ষ ২৫ হাজার ২৩০ কোটি টাকা, ১ লক্ষ ২২ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা, ৯৭ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা, ৪১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা, ৭৩ হাজার ২৭২ কোটি টাকা, ৪২ হাজার ২১০ কোটি টাকা এবং ২৭ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। একই সময়কালে বড়ো প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ঋণ মকুব করা হয়েছে যথাক্রমে ১৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা, ১০ হাজার ২২৯ কোটি টাকা, ১২ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, ১৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, ২৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা, ৩৬ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা, ২৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা, ২৭ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা, ৪১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা, ২৬ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা এবং ২০ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা। এই দুইয়ের যোগফলে মকুবের অঙ্কটা ১০ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। মোদির কর্পোরেট তোষণের কারণে মুনাফায় ফুলেফেঁপে উঠেছে বিশেষ একটি শ্রেণি। এর পাশাপাশি চরম দুর্দশাগ্রস্থ কৃষকদের ঋণ মকুবের ছবিটা দেখা যায়। এক্ষেত্রে একই সময়ে ঋণ মকুব করা হয়েছে যথাক্রমে ৩৪৩০ কোটি টাকা, ৬৮৪৫ কোটি টাকা, ৬৪৮৮ কোটি টাকা, ১০ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, ১২ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা, ১৪ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা, ১৫ হাজার ২২২ কোটি টাকা, ২৩ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা, ২৪ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা এবং ২২ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ১ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকার সামান্য বেশি। মোদির কৃষক দরদের নিট ফল হল, ১০ লক্ষ বনাম ১ লক্ষ কোটি টাকা! কে না জানে এ দেশের কৃষকদের দুর্দশার কথা, আর কত কৃষক ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে আত্মঘাতী হন। অনেকেই ফসলের ন্যায্য দাম পান না। অদ্ভুত বৈপরীত্য! দেনার দায়ে একদিকে কৃষকের আত্মহত্যা আর অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হয়ে কর্পোরেটের একাংশের বিদেশে পাড়ি!
প্রধানমন্ত্রীর কৃষি ও কৃষক দরদের আরও এক বড়ো উদাহরণ হতে চলেছে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি। আপাতত এই চুক্তির কৃষিক্ষেত্র নিয়ে আমেরিকার কৃষি সচিব দাবি করেছেন, চুক্তি অনুযায়ী ভারতের বিশাল বাজারে মার্কিন কৃষিপণ্যের অবাধ বিচরণ সম্ভব হবে। আমেরিকার গ্রামাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থায়ন হবে। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার ১৩০ কোটি ডলারের কৃষি ঘাটতি কমবে। এদেশের বিরোধীরাও মনে করে, আমেরিকার কৃষি ও ডেয়ারি পণ্যে ছেয়ে যাবে ভারতের বাজার। আমেরিকার পণ্যে শুল্ক কমানো বা শূন্য করে দেওয়ায় তার বিপুল প্রভাব পড়বে। আমেরিকার কৃষি বহুজাতিকের ফাঁদে বন্দি হবে এদেশের কৃষকরা। দেখা যাচ্ছে, এতদিন যত বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে তাতে ভারতের শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা হত কৃষিক্ষেত্রকে। এমনকি সাম্প্রতিক ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য চুক্তিতেও একথা বলা রয়েছে। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে এই নীতির যে ব্যতিক্রম ঘটতে চলেছে তা পরিষ্কার। মুখে অবশ্য এখনও কৃষকের স্বার্থরক্ষার কথাই বলে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার! কিন্তু তাতে ভারতের কৃষিবাজারকে কার্যত আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়ে ট্রাম্পের কাছে আত্মসমর্পণ করার ছবিটা বদলাবে কি। আদৌ রক্ষা পাবে দেশের কৃষকের স্বার্থ?