Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে হবেই

আমেদাবাদে বিমান দুর্ঘটনার পর কেটে গিয়েছে ৪৮ ঘণ্টা। মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শনিবার ২৭৪-এ পৌঁছেছে। মৃতদের তালিকায় এমন ৩৩ জন রয়েছেন, যাঁরা ওই বিমানের সঙ্গে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। একটি বিল্ডিংয়ের উপর বিমান আছড়ে পড়ে বিস্ফোরণের শিকার হন তাঁরা।

দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে হবেই
  • ১৬ জুন, ২০২৫ ০৪:০০

আমেদাবাদে বিমান দুর্ঘটনার পর কেটে গিয়েছে ৪৮ ঘণ্টা। মৃতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শনিবার ২৭৪-এ পৌঁছেছে। মৃতদের তালিকায় এমন ৩৩ জন রয়েছেন, যাঁরা ওই বিমানের সঙ্গে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। একটি বিল্ডিংয়ের উপর বিমান আছড়ে পড়ে বিস্ফোরণের শিকার হন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে আছেন ডাক্তারি পড়ুয়া থেকে চা দোকানির ছেলে পর্যন্ত অনেকেই। সংশ্লিষ্ট সব পরিবারকেই আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে। আমদাবাদের বিমান দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এবং ব্যাপকতা এমনই যে বিশ্বজুড়ে ইতিপূর্বে সংঘটিত আরও দশটি দুর্ঘটনার স্মৃতি ফিরে আসছে। চলছে তুলনা, কোন দুর্ঘটনাটি কার থেকে কত বড় এবং মারাত্মক। গত ১২ জুন বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার মডেলের বিমানটি আমেদাবাদ থেকে লন্ডন যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে। যাত্রী ছিলেন ২৪২ জন। তাঁদের মধ্যে একজন বাদে বাকি সকলেরই মৃত্যু হয়েছে। সারা বিশ্বে সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনাগুলির তালিকায় আরও রয়েছে—টেনেরিফ বিমানবন্দর বিপর্যয় (১৯৭৭)। ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। রানওয়েতে দুটি বোয়িং ৭৪৭ বিমানের মধ্যে সংঘর্ষে মৃত্যু হয় মোট ৫৮৩ জনের! একাধিক ভুল বোঝাবুঝি এবং যোগাযোগ বিভ্রান্তির ফল সেটি। জাপান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১২৩ (১৯৮৫): একক বিমানের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। পিছনের প্রেশার বাল্কহেড ভেঙে পড়ায় মৃত্যু হয় ৫২০ জনের। চারখি দাদরি সংঘর্ষ (১৯৯৬): মাঝআকাশে কাজাখস্তান এয়ারলাইন্স ও সৌদি এয়ারলাইন্সের দুটি বিমানের সংঘর্ষে ৩৪৯ জন মারা যান। এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭ (২০০৯): বিধ্বস্ত হয় আটলান্টিকে। এয়ারবাস এ৩৩০-র ২২৮ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। ভুল এয়ারস্পিড রিডিং এবং পাইলটের ভুল সিদ্ধান্তই ছিল দুর্ঘটনার কারণ। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১৭ (২০১৪): ইউক্রেনের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ভেঙে পড়ে। প্রাণ যায় ২৯৮ জনের। এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৮২ (১৯৮৫): আয়ারল্যান্ডের উপকূলে ভেঙে পড়ে বোয়িং ৭৪৭। এটির পিছনে ছিল জঙ্গি হামলা। ওই ঘটনায় নিহত হন ৩২৯ জন। তুর্কি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৯৮১ (১৯৭৪): ভেঙে পড়ে প্যারিসের কাছে। প্রাণ যায় ৩৪৬ জনের। তদন্তে উঠে আসে কার্গো ডোর ফাটল ও ডিকমপ্রেশনই দুর্ঘটনার কারণ। আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৫৮৭ (২০০১): নিউ ইয়র্কের কুইন্সে আকাশে টার্বুলেন্সের মধ্যে রাডারে অতিরিক্ত চাপ পড়ায় ভেঙে পড়ে। ওই ঘটনায় বিমান এবং ভূমি মিলিয়ে ২৬৫ জনের মৃত্যু হয়। অতীতে, তুলনায় ছোট হলেও আরও অসংখ্য বিমান দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে।

Advertisement

কিন্তু সেসব থেকে কতটুকু শিক্ষা নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিল্প এবং বিশেষজ্ঞরা? এই প্রশ্নই আজ সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। তার আগে জানা দরকার, সর্বশেষ বিমান দুর্ঘটনাটির (আমেদাবাদ) প্রকৃত কারণ কী? একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে চর্চা চলছে শুরু থেকেই। তাতে আন্দাজে ঢিল ছুড়ে সময় নষ্ট ছাড়া কিছু হচ্ছে না। এই মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ দ্রুত খুঁজে বের করা দরকার। মাটি ছাড়তেই বন্ধ ডানা ‘ঝাপটানি’! পাইলট না কি উড়ান সংস্থা, কার ভুলে ভাঙল এয়ার ইন্ডিয়ার অভিশপ্ত বিমানটি? যাত্রার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল কি না, সেটি ১০০ শতাংশ নিশ্চিত করার জন্য ফ্লাইট সিকিওরিটি অ্যান্ড ইনসপেকশন ক্লিয়ারেন্সের একটি এসওপি রয়েছে। সেটিও যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি? প্রাথমিকভাবে তদন্তকারীদের ধারণা, তা করা হয়নি। তা সত্যি হলে ‘অল ক্লিয়ার’ সিগন্যাল দেওয়ার পূর্বে সুরক্ষাবলয় পরীক্ষার কোন অংশটি আদৌ পালিত হয়নি? নাকি ফ্লাইট ইনসপেকশন রিপোর্টে ছোটখাটো ত্রুটির উল্লেখই করেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা? অথবা মনোযোগের অভাবে ধরাই পড়েনি সেরকম কিছু! অর্থাৎ, ছিল হিউম্যান এরর! টেকনিক্যাল কর্মীদের গাফিলতির বিষয়টির গোয়েন্দা তদন্ত জরুরি।
এজন্যই একটি পৃথক তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যেই গড়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের যৌথ উদ্যোগে এই কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তদন্ত করবে। কমিটিতে থাকছেন আমেদাবাদের পুলিস কমিশনার, তাঁর অ্যান্টি টেররিজিম স্কোয়াডের স্পেশাল টিম এবং কেন্দ্রীয় গুপ্তচর সংস্থা আইবি’র স্পেশাল ডিরেক্টর। কমিটির সদস্য হবে দেশের শীর্ষ ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ টিম। তিনমাসের মধ্যেই তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবে কমিটি। এই কাজটি অতিশয় স্বচ্ছতার সঙ্গেই সম্পন্ন হওয়া কাম্য। এমন বিপদের পুনরাবৃত্তি রোধের উপায় সন্ধানের জন্যই এ঩টি জরুরি। নতুবা দূরপাল্লার রেলযাত্রার পাশাপাশি বিমানযাত্রাতেও সঙ্গী রয়ে যাবে আতঙ্ক। প্রতিটি যাত্রা যাতে আনন্দসফর হয়ে উঠতে পারে তারই নিশ্চয়তা চায় সমগ্র দেশ।

সম্পর্কিত সংবাদ