সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করা চমৎকার একটি ভিডিয়ো ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছেন কোনো নেটিজেন। বিষয়—জলসংকট। লোকাল বাসের জানলা দিয়ে আসা ‘লু’র ঝাপটা খেতে খেতেই চালালাম ভিডিয়োটা। মিনিটদুয়েকের সেই ভিডিয়োতে রীতিমতো অ্যানিমেটেড স্টাইলে জলসংকট ও তার ফলে আসন্ন বিপদ নিয়ে বেশ জ্ঞানগর্ভমার্কা বার্তা রয়েছে। ভিডিয়োটা পুরোটা দেখার ফলে অ্যালগরিদমের নিয়ম মেনে পর পর আরও কয়েকটি একই ধরনের ভিডিয়ো এল ফিডে। এমনিতেই গ্রীষ্মের দাবদাহে নাজেহাল দশা ভারতের। একের পর এক মেগাসিটিতে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ক্রমেই নিম্নমুখী। প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজের পাতাজুড়ে তীব্র জলসংকট সংক্রান্ত নানা খবর। বিভিন্ন রাজ্যে পানীয় জলের অভাবে হাহাকার করছে মানুষ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হালও তথৈবচ। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এই ধরনের ভিডিয়ো ভিউয়ারদের একেবারে টপ চয়েস হতে বাধ্য। এক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। প্রতিটি ভিডিয়োতেই বিপুল সংখ্যায় লাইক পড়েছে। উপচে পড়ছে কমেন্ট বক্স। কিন্তু মজার বিষয় হল, এআই ব্যবহার করে জলসংকট নিয়ে একটা ভিডিয়ো বা ছবি বানাতে ঠিক কতটা পরিমাণ জল খরচ হয়, সেকথা কোথাও বলা হয়নি।
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি কী? চোখ বন্ধ করে উত্তর হল—এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। চ্যাটজিপিটিকে একটি জটিল কোডিং করতে বলা হোক বা মিডজার্নিতে ছবি তৈরি করা—আমরা সবকিছু পেয়ে যাই নিমেষে। এই প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ভার্চুয়াল জগৎ যে প্রকৃতির উপর কী প্রভাব ফেলছে, তা আমরা প্রায় কেউই তলিয়ে ভাবি না। এআই থেকে ইন্টারনেট—সবকিছু চালানোর জন্য বিদ্যুতের কথাই প্রথমে আমাদের মাথায় আসে। কিন্তু জলের কথা আমরা প্রায় চিন্তাই করি না। অথচ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে যে ‘ডেটা সেন্টার’গুলির উপর ভিত্তি করে, সেগুলিকে চালু এবং ঠান্ডা রাখতে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় কোটি কোটি লিটার বিশুদ্ধ জল। একদিকে যখন প্রবল গরম, বর্ষার খামখেয়ালিপনা এবং বিশ্বজুড়ে উষ্ণায়নের প্রভাবে মানুষ তীব্র জলসংকটে ভুগছে, অন্যদিকে তখন এআইয়ের তৃষ্ণা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর সেই কারণেই শুরু হয়েছে এক ‘অদৃশ্য জল-যুদ্ধ’।
অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠতে পারে, কম্পিউটারের কোডিং বা ক্লাউড স্টোরেজের সঙ্গে জলের কী সম্পর্ক? উত্তরটি লুকিয়ে রয়েছে এই প্রযুক্তির পরিকাঠামোয়। জিপিটি-৪, জেমিনির মতো এআই মডেলগুলির ব্যাক-এন্ডে কাজ করে হাজার হাজার শক্তিশালী গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ)। এই প্রসেসরগুলি প্রতিনিয়ত কোটি কোটি ডেটা প্রসেস করতেই থাকে। ফলে সেগুলি গরম হয়ে যায়। একটি সাধারণ ল্যাপটপ বা মোবাইলে দীর্ঘক্ষণ হাই গ্রাফিক্সের গেম খেললে যেমন গরম হয়ে যায়, তেমনই একনাগাড়ে ডেটা প্রসেসিংয়ের সময় এই ডেটা সেন্টারগুলি ওই ল্যাপটপ বা মোবাইলের তুলনায় কয়েক হাজার গুণ বেশি গরম হয়ে ওঠে। যদি এই সার্ভারগুলিকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রার মধ্যে ঠান্ডা রাখা না যায়, তাহলে পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়বে। ক্র্যাশ করে যাবে সার্ভার। আর সেই কারণে প্রধানত দু’টি পদ্ধতিতে কুলিং সিস্টেম চলে—ইভাপোরেটিভ কুলিং এবং চিলড ওয়াটার সিস্টেম।
ইভাপোরেটিভ কুলিংয়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে গরম বাতাসকে ঠান্ডা করার জন্য জলের ধারা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, চিলড ওয়াটার সিস্টেমে পাইপের মাধ্যমে ঠান্ডা জল সার্ভার রুমের চারপাশ দিয়ে ঘুরিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হল, এই দুই প্রক্রিয়ার কোনোটিতেই কারণ নদী বা সমুদ্রের জল ব্যবহার করা যায় না। নোনা বা খনিজযুক্ত জল ব্যবহার করলে পাইপে মরচে জমে সার্ভার নষ্ট হতে পারে। তাই ডেটা সেন্টারগুলিতে ব্যবহার করা হয় বিশুদ্ধ মিষ্টি জল। আর তা আসে সরাসরি মানুষের পানীয় জলের উৎস ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার থেকে। আমরা যখন বিশ্বজুড়ে জল সংকটের কথা বলি, তখন সাধারণত অতিরিক্ত জনসংখ্যা, শিল্পায়ন বা কৃষিকাজকে দায়ী করি। কিন্তু ডিজিটাল পরিকাঠামো বা ক্লাউড কম্পিউটিং যে এই পরিস্থিতিকে কত দ্রুত বিপদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের নজরের আড়ালেই রয়ে গিয়েছে।
এআইয়ের তৃষ্ণার মাত্রা কেমন? ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (রিভারসাইড) গবেষকদের মতে, ১০ থেকে ৫০টি সাধারণ কথোপকথন বা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চ্যাটজিপিটির (জিপিটি-৩) মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের প্রায় ৫০০ মিলিলিটার জল লাগে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ আর এমনকি! কিন্তু ভাবুন, বিশ্বজুড়ে যখন কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এই চ্যাটবটগুলি ব্যবহার করছে, তখন মোট কত পরিমাণ জল খরচ হচ্ছে! লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলির সার্ভার ঠান্ডা রাখতে ১৭.৩ বিলিয়ন গ্যালন জল ব্যবহার করা হয়েছিল। ওই পরিমাণ জল দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষের গোটা একটা বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
এবার তাকানো যাক ভারতের দিকে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই ধরনের সংকট শুধু পরিবেশগত নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সমাজ ও রাজনীতি। কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্য সরকারও বর্তমানে গোটা দেশকে এক বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল ও আইটি হাবে পরিণত করতে মরিয়া। ভারতে মেগা ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থাগুলিকে কোটি কোটি টাকার ভরতুকি, সস্তায় জমি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে এক চরম বৈপরীত্য। একদিকে যখন ভারতের একাধিক শহরের স্থানীয় বাসিন্দারা দৈনিক পানীয় জলের জন্য ট্যাঙ্কারের উপর নির্ভরশীল, সেখানে এই এআই ডেটা সেন্টারগুলিকে ভরতুকি সহ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ গ্যালন বিশুদ্ধ জল সরবরাহ করার কথা বলা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি স্পষ্ট। এই ডেটা সেন্টারগুলি ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বাজার চাঙা করবে। কিন্তু পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজকে ভাবাচ্ছে অন্য কথা—যে প্রযুক্তি স্থানীয় মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার অর্থাৎ জল কেড়ে নেয়, সেই অর্থনৈতিক উৎকর্ষতা ঠিক কতটা কাম্য!
এই প্রসঙ্গে প্রথমেই আসে চেন্নাইয়ের নাম। ২০১৯ সালে ভারতের প্রথম প্রধান শহর হিসাবে ‘ডে জিরো’-র মুখোমুখি হয়েছিল চেন্নাই। সেই সময়ে শহরের প্রধান চারটি জলাধার সম্পূর্ণ শুকিয়ে গিয়েছিল। আজ সেই চেন্নাইতেই ভারতের অন্যতম বৃহত্তম ডেটা সেন্টার হাব তৈরি হয়েছে। ভারতের সিলিকন ভ্যালি হিসাবে পরিচিত বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদেও তৈরি হচ্ছে ডেটা সেন্টার হাব। অথচ প্রতি বছর গরম পড়তেই এই সমস্ত মেগাসিটিতে তীব্র জলসংকট দেখা দেয়। আম জনতার একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় জলের ট্যাঙ্কার। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে এই দুই শহরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষকে জলের জন্য হাহাকার করতে হয়েছে।
জলসংকটপ্রবণ এলাকায় যখন ডেটা সেন্টারগুলি ভূগর্ভস্থ জল নির্বিচারে পাম্প করে তোলে, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় কুয়ো এবং নলকূপগুলির উপর। গত কয়েক বছরে ভারতের একাধিক শহরে কুয়োর জলের স্তর কয়েকশো ফুট নীচে নেমে গিয়েছে। সাধারণ মানুষ ও পরিবেশবিদদের সমালোচনার মুখে টেক জায়ান্ট সংস্থাগুলি এখন ‘ওয়াটার পজিটিভ’ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অর্থাৎ, তারা যতটা জল ব্যবহার করবে, তার চেয়ে বেশি জল বিভিন্ন উপায়ে (যেমন বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, জলাশয় পুনরুজ্জীবন এবং জল পুনর্ব্যবহার) প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেবে। যদিও পরিবেশবিদদের একাংশের মতে, অনেক সংস্থাই আদতে ‘গ্রিনওয়াশিং’-এর আশ্রয় নিচ্ছে। তারা হয়তো জলসংকটপ্রবণ কোনো শহরে থাকা ডেটা সেন্টারের জন্য জল ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, জল ফিরিয়ে দিচ্ছে হয়তো তার থেকে হাজার মাইল দূরের কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের জলাশয়ে। এর ফলে খাতায়কলমে প্রতিশ্রুতি রক্ষা হলেও স্থানীয় জলসংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে আশার আলো কি কিছুই নেই? আছে। বর্তমানে বিশ্বের একাধিক দেশে কিছু বিকল্প প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। যেমন, লিকুইড ইমার্সন কুলিং। এই পদ্ধতিতে সার্ভারগুলিকে এক ধরনের বিশেষ ডাই-ইলেকট্রিক তরলের (যা বিদ্যুৎ অপরিবাহী কিন্তু তাপ পরিবাহী) মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়। অত্যন্ত কার্যকর এই পদ্ধতিতে জলের অপচয় প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু এই পরিকাঠামো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আবার যে সমস্ত ডেটা সেন্টার সম্পূর্ণ সৌর বা বায়ুশক্তিতে চলে বা যেখানে ক্লোজড-লুপ কুলিং প্রযুক্তি রয়েছে, সেখানে যদি রিসাইকেলড ওয়াটার ব্যবহার করা যায়, তাহলে খরচ সামান্য বাড়লেও পানীয় জলের সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন পরিকাঠামোগত কিছু নীতি নির্ধারণ করা। কোন এলাকায় ডেটা সেন্টার তৈরি হবে, তা সরকারকে ঠিক করতে হবে। যে সমস্ত এলাকা ‘ডার্ক জোন’ (যেখানে ভূগর্ভস্থ জল শেষ) সেখানে ডেটা সেন্টার নিষিদ্ধ করতে হবে। সঙ্গে দরকার কঠোর ‘ওয়াটার অডিট’। প্রতি বছর একটা ডেটা সেন্টার কত লিটার জল নিল এবং তার কতটা পুনর্ব্যবহার করল, সেই সংক্রান্ত অডিট রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
টেক জায়ান্ট বা সরকারের পাশাপাশি সচেতন হতে হবে নিজেদেরও। আমরা যখন চ্যাটজিপিটি বা জেমিনি ব্যবহার করি, অনেক সময় অপ্রয়োজনে বা মজার ছলে একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকি। কখনো এআইকে বিশাল বড়ো ডেটা প্রসেস করতে দিই। আমাদের বুঝতে হবে, বাস্তবে এই প্রতিটি সার্চ বা প্রতিটি প্রম্পটের একটা পরিবেশগত মূল্য আছে। জলসংকট নিয়ে এআই ভিডিয়ো তৈরি করার আগে আমাদের ভাবতে হবে, প্রতিটি কম্যান্ডের সঙ্গে কোনো না কোনো গ্রামের একটা কুয়োর জল একটু একটু করে শুকিয়ে যাচ্ছে।সচেতনতা প্রচার অবশ্যই প্রয়োজন। শুধু মনে রাখতে হবে, এআই নয়, জলই জীবন।