Bartaman Logo
২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পুনর্বাসনের কী হবে?

এ যেন উচ্ছেদের উৎসব চলছে! রাত নামলেই বুলডোজারের গর্জন শুরু হয়ে যাচ্ছে। কখনো শহরের বেআইনি বাড়ি-ফুটপাতে, কখনো রেল স্টেশনের ভিতরে-বাইরে শত শত ‘অবৈধ’ নির্মাণ নিমেষে মিশে যাচ্ছে মাটিতে।

পুনর্বাসনের কী হবে?
  • ২ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

এ যেন উচ্ছেদের উৎসব চলছে! রাত নামলেই বুলডোজারের গর্জন শুরু হয়ে যাচ্ছে। কখনো শহরের বেআইনি বাড়ি-ফুটপাতে, কখনো রেল স্টেশনের ভিতরে-বাইরে শত শত ‘অবৈধ’ নির্মাণ নিমেষে মিশে যাচ্ছে মাটিতে। সেই ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ছে কয়েক হাজার দিন-আনা দিন-খাওয়া পরিবারের ভবিষ্যৎ। রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার চায়, ফুটপাত-রেলস্টেশন হোক বেআইনি হকারমুক্ত। শহরের শরীর থেকে রাতারাতি বেআইনি নির্মাণ ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাক। অতএব সময় নষ্ট না করে বুলডোজারকে মূল হাতিয়ার করে শুরু হয়েছে উচ্ছেদের দক্ষযজ্ঞ। একদিকে বেআইনি নির্মাণ, অন্যদিকে অবৈধ জবরদখল হটানোর জন্য সরকারের আগ্রাসী অভিযানে কোথাও যেন ‘শেষ দেখা’র হুঁশিয়ারি শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এখানেই সেই অনিবার্য প্রশ্নগুলি ফের সামনে এসে পড়ছে। প্রথমত, উচ্ছেদ করে পুনর্বাসন, নাকি উলটোটা— এই ভয়াবহ বেকারত্বের যুগে কোনটা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, তা কি সরকারের বিবেচনার মধ্যে রয়েছে? প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে আজকের মুখ্যমন্ত্রী, সেদিনের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, উপযুক্ত পুনর্বাসন দিয়েই হকার উচ্ছেদ করতে হবে। তা না হলে তিনি নিজে বুলডোজারের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন। দ্বিতীয়ত, বেআইনি নির্মাণ কিংবা অবৈধ উচ্ছেদ করতে গিয়ে পক্ষপাতিত্ব দেখানোটা কি সরকারের নীতি হতে পারে? 

Advertisement

এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে কলকাতা ও জেলা শহরগুলিতে বহু ফুটপাত দখল হয়ে গিয়েছে। আইন মোতাবেক ফুটপাতের তিনভাগের একভাগ পথচারীদের জন্য, বাকি দু’ভাগ বৈধ হকারদের বসার জায়গার যে নিয়ম, তা প্রায় কোথাওই মানা হয় না। একই কথা প্রযোজ্য রেল স্টেশনে প্রবেশ-প্রস্থানের জায়গার ক্ষেত্রেও। এতে শুধু পথচারী বা রেলযাত্রীদের চলাচলের অসুবিধাই নয়, যান চলাচলেরও প্রভূত সমস্যা হচ্ছে। আবর্জনাও এক বড়ো সমস্যা। এসবের কারণে শহরের সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে। মেট্রো শহরের চরিত্র হারাচ্ছে রাজ্য। সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, ফুটপাতে হকারের সংখ্যার বিচারে মেট্রো শহরগুলির মধ্যে কলকাতা নাকি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। কলকাতা পুরসভার হিসাবে, এই মহানগরীতে বৈধ হকারের সংখ্যা ৫৪ হাজার। কিন্তু আসল সংখ্যাটা নাকি কয়েক লক্ষ! অর্থাৎ সিংহভাগ এলাকাতেই অবৈধ হকারদের রমরমা। এই রমরমা একদিনে হয়নি। স্থায়ী চাকরি দিতে না পেরে ভোট ব্যাংকের স্বার্থে শহরের যত্রতত্র হকার বসতে দেওয়ার শুরু সেই বাম আমলে। তৃণমূলের আমলে অবৈধ হকারের সংখ্যা শুধু বাড়েইনি, সেই বিপুল সংখ্যক হকারের থেকে ‘হপ্তা’ আদায় করত শাসক দলের বিভিন্ন মাপের বহু নেতা। অভিযোগ, তাদের দোসর ছিল পুলিশের একাংশ। আবার এই ফুটপাত অবৈধ হকারমুক্ত করতে বাম বা তৃণমূলের জমানায় লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযানের ছবিও দেখা গিয়েছে মাঝেমধ্যে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতি বদলায়নি। রাজ্যের নুতন বিজেপি সরকার এখন উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই উচ্ছেদ অভিযান চালানোয় সঙ্গত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, পেটের দায়ে ২০/৩০/৪০ বছর ধরে যাঁরা বাধ্য হয়ে ফুটপাতে বসছেন, সংসার চালাচ্ছেন—তাঁরা কেন ‘অপরাধী’ হবেন! রাজনৈতিক দল, প্রশাসনের চোখ বুজে থাকার দায় কেন এই অসহায় মানুষগুলিকে বহন করতে হবে? প্রশ্ন উঠেছে, ফুটপাতে দোকান ছাড়াও জবরদখল করে অন্যান্য নির্মাণও আছে। সেসব ভাঙতে কেন নজর দিচ্ছে না সরকার? একথা ঠিক, অবৈধ জবরদখল বা নির্মাণ কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। ফুটপাত দিয়ে হকারদের জন্য মানুষ হাঁটতে পারবেন না, রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটবে তা যেমন কাম্য নয়, ঠিক তেমনই এও সত্য চাকরি বা কাজ না পেয়ে যাঁরা ফুটপাতে বসে হকারি করতে নেহাতই বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা পেটের টানেই রুটিরুজির সংস্থানে নেমেছেন। তাঁদের সমস্যাটাও গুরুত্ব সহকারে ভাবা দরকার। তাঁদের কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার দায় জনকল্যাণকামী সরকার অস্বীকার করতে পারে না। সরকারের সেই মানবিক মুখ কোথায়? 
একই প্রশ্ন উঠেছে বেআইনি নির্মাণের ক্ষেত্রে। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার দশ দিনের মধ্যে তিলজলা এলাকায় বেআইনি বাড়ি রাতারাতি ভেঙে ফেলতে বুলডোজার পাঠিয়েছিল প্রশাসন। সেই কাজ অবশ্য স্থগিত রয়েছে আদালতের নির্দেশে। কিন্তু বেআইনি বাড়ি তো শুধু তিলজলা-তপসিয়া-মোমিনপুর-একবালপুর-খিদিরপুর-রাজাবাজারে নেই। বড়বাজার-ইএমবাইপাসের দু’ধারে, পোদ্দার কোর্ট-সহ শহর ও শহরতলির প্রায় সর্বত্রই বেআইনি নির্মাণের রমরমা চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। কখনো বাড়ি ভেঙে পড়লে, আগুন লাগলে বা বিস্ফোরণ হলে তার কিছু নজির সামনে আসে। বলাই বাহুল্য, রাজনীতি ও প্রশাসনের যৌথ মদতে এইসব বেআইনি কর্মকাণ্ডের রমরমা কার্যত গোটা ব্যবস্থাটিকে ‘বৈধ’ করে তুলেছে। ব্যাঙের ছাতার মতো এই বেআইনি নির্মাণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার শুধু বুলডোজারের পক্ষপাতিত্ব ব্যবহারে সমাধান হবে না। এ জন্য সুসংহত পরিকল্পনা দরকার। মনে রাখা প্রয়োজন, বেআইনি নির্মাণে অনেকক্ষেত্রে বাসিন্দারা ‘অপরাধী’-ও থাকেন না, তাঁরা অপরাধের শিকার হন। সুতরাং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে তাঁদের বৈধ কাগজপত্র প্রমাণের সময় দেওয়া প্রয়োজন। সংস্কার বা সংশোধনের সুযোগও দিতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু সরকার শুধু বুলডোজার পাঠিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে, এটা দুর্ভাগ্যের।

সম্পর্কিত সংবাদ