হিন্দু শাস্ত্রে রহিয়াছে যে, কোনও সাধক যখন যোগ বলে ঈশ্বর স্থানীয় হইয়া যান—পরে আরও কঠোর তপস্যার ফলে তাঁহারা মুক্তির পর্যায়ে পৌঁছাইতে পারেন। অর্থাৎ ঈশ্বরীয় অবস্থা প্রাপ্ত হন। সে ঈশ্বরীয় অবস্থা কী? দেখা যায়, সাধারণ যোগী বা তপস্বী জরা ব্যাধি শোক দুঃখ দৈন্যের অধীন কর্তব্যজ্ঞান দ্বারা আবদ্ধ থাকেন। কিন্তু, লোকনাথ ব্রহ্মচারীর সেরকম কিছু ছিল না। কেমন যেন একটা স্বাধীন ও একনায়কত্ব ভাব। অন্যান্য মহাপুরুষের জীবনের কর্মধারাগুলি বিশদভাবে পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জীবনের গতি ভিন্ন ধরনের ছিল। জীবনের প্রতিটি স্তরেই যেন আদেশ আদেশ ভাব। উপদেশ নয়। তোয়াজ নয়। অর্থাৎ আমি যাহা ইচ্ছা করিব তাহাই হইবে। উপনিষদে নির্গুণ বা সগুণ উভয় স্তরের ব্রহ্মবিদ্যার ব্যাখ্যা রহিয়াছে। উদ্দালক আরুণি কর্তৃক, পুত্র শ্বেতকেতু, যাজ্ঞবল্ক্য কর্তৃক জনক নির্গুণ ব্রহ্মবিদ্যালাভের অধিকারী ছিলেন। তাছাড়া অথর্ববেদীয় মাণ্ডক্য উপনিষদে নির্গুণ ব্রহ্মবিদ্যার বিস্তৃত ব্যাখ্যা রহিয়াছে। গায়ত্রীবিদ্যা, শাণ্ডিল্যবিদ্যা, বৈশ্যানরবিদ্যা, মধুবিদ্যা, পঞ্চাগ্নিবিদ্যা প্রভৃতি সগুণ ব্রহ্মবিদ্যা বলিয়া বিদিত।
এই বিষয়ে বৈদিক শ্রুতির উক্তিও নিম্ররূপ: ‘‘যোহন্যাং দেবতা মুপান্তে ঽ ন্যোহ সাবন্যোহম স্মীতি ন স বেদ।’’ যে সাধক বা উপাসক পূজক এবং পূজার মধ্যে একত্ব ভাবাপন্ন না হইতে পারেন—সে সাধক মূল তত্ত্ব জানেন না। লোকনাথ ব্রহ্মচারী ছিলেন উপরোক্ত ভাবধারার বিপরীত। লোকনাথ যে গুরুতত্ত্ব, গুরুমহিমা জগতের সম্মুখে উদ্ঘাটিত করিয়া গিয়াছেন তাহার তুলনা বিরল। গুরু ভগবান লোকনাথ ব্রহ্মচারীর দ্বারা সারা বিশ্বের বুকে এক রেখাপাত করিয়া গিয়াছেন। জগৎকে তিনি দেখাইয়া গিয়াছেন—গুরু অসিদ্ধ হইলেও প্রকৃত পথে শিষ্যকে পরমপদপ্রাপ্তির পথ দেখাইতে পারেন।
আবার শ্রীগুরু ভগবান ও লোকনাথ ব্রহ্মচারীর গুরু-শিষ্য লীলা কলিযুগে বিরল। লোকনাথ ব্রহ্মচারী গুরুঋণ স্বীকার করিয়াই ভগবান গাঙ্গুলির পুনর্জন্মের মুক্তির ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন। শাস্ত্রে আছে—একই দেহে একই জন্মে গুরু-শিষ্যের চরণ প্রার্থী হইতে পারে না। গুরু সিদ্ধ আর অসিদ্ধ হউক—ভবাতিতং ত্রিগুণ রহিতং সদ্গুরুং ত্বং নমামী।
শিষ্য হিসাবে গুরুদেবকে চরণে আশ্রয় দেওয়া ব্রহ্মজ্ঞানীর পক্ষে বেদগর্হিত কর্ম। যাহার জন্য লোকনাথ পরজন্মে উদ্ধারের ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন। ব্রহ্মানন্দ গিরি মহারাজের গৃহে জগন্মাতা প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ ছিল। প্রত্যেক সাধক জানিতেন, তিনি জগন্মাতার বরপুত্র। শর্ত ছিল, যেদিন জগন্মাতার প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শিত হইবে সেইদিন গিরি মহারাজের নিকট হইতে তিনি চলিয়া যাইবেন। লোকনাথ মঠের ‘জীবন্ত গীতা শ্রীশ্রীলোকনাথ’ থেকে