Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নারীর ক্ষমতায়নে বড়ো উদ্যোগ

নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন উদ্যোগ শুরু হল। মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুবিধা। বিস্তারিত পড়ুন।

নারীর ক্ষমতায়নে বড়ো উদ্যোগ
  • ৩ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

এদেশের অর্ধেক নারী। পশ্চিমবঙ্গেও তাই। মোটামুটি হিসাবটা এরকমই। রাজ্যের এবং দেশের উন্নতি কাম্য হলে শুধু পুরুষের সমৃদ্ধি দিয়ে সেই আকাঙ্ক্ষা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। লক্ষ্যপূরণে উন্নতি দরকার নারী-পুরুষের উভয়েরই। তবেই বৈষম্য কমবে। মনে রাখা দরকার, অনুন্নয়নের মূল কারণ বৈষম্য। তাই কল্যাণকামী সমাজ বৈষম্যের মূলোচ্ছেদ প্রার্থনা করে। বৈষম্য একরকম নয়, রকমারি। তার মধ্যে নারী ও পুরুষের বৈষম্যটি আদি। এই বৈষম্যকে কেন্দ্র করেই জাঁকিয়ে বেড়েছে ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত, ভাষাগত এবং আঞ্চলিক বৈষম্য। এই সীমাহীন বৈষম্য একদিনে দূর হওয়ার নয়, ধীর পদক্ষেপই বাস্তব। তাই একটু একটু করে বৈষম্য কমাবার উদ্যোগ গ্রহণই বুদ্ধিমানের কাজ। রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার দিক থেকে বরাবর অগ্রণী বাংলা এই কাজে ব্রতী হয়ে প্রথমে মেয়েদের শিক্ষার আলোয় তুলে আনতে সচেষ্ট হয়। অতঃপর মহিলাদের জন্য খুলে দেওয়া হয় কর্মজগতে প্রবেশের দ্বার। তাঁরা নানা ধরনের চাকরি, পেশা, ব্যবসা, এমনকি ক্রীড়া ক্ষেত্রেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। মহিলারা পেয়েছেন ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনুশীলনের অধিকার। ফলত তাঁদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে সরকারি প্রশাসনেরও উচ্চস্থানগুলি। 

Advertisement

তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়ে গিয়েছে পারিবারিক এবং সামাজিক সীমাবদ্ধতা। তার ফলে এই সুযোগ সকলের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। সুযোগগুলি বস্তুত কিছু গোষ্ঠী এবং পরিবারের কুক্ষিগত হয়ে গিয়েছে। গত কয়েক দশকে মহিলারা অনেক বাধা পেরিয়ে বেশি সংখ্যায় ভোটের লাইনে দাঁড়ান। একাধিক রাজ্যের পরিসংখ্যান বলছে, ভোটদানের হারে মহিলারা কিছু স্থানে রীতিমতো পুরুষদের পিছনে ফেলে দিয়েছেন। তবু রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদানের জায়গায় তাঁরা রয়ে গিয়েছেন উপেক্ষিত। বিধানসভা, লোকসভা, রাজ্যসভায় মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব ও উপস্থিতি কাম্য সংখ্যার অনেক নীচেই রয়ে গিয়েছে। সংরক্ষণের বদান্যতায় স্থানীয় সরকার (ত্রিস্তর পঞ্চায়েত এবং পুরসভা) পরিচালনায় মহিলাদের উপস্থিতি একটু ভালো হলেও প্রকৃত ক্ষমতা তাঁদের নাগালে পৌঁছেছে খুবই কম ক্ষেত্রে। অভিযোগ পাওয়া যায়, মহিলা পুরপ্রধান, পঞ্চায়েত প্রধান প্রভৃতি স্রেফ রাবার স্ট্যাম্পের কাজটুকুই করেন। নেপথ্যে খেলে থাকেন সংশ্লিষ্ট পরিবারের প্রধান (স্বামী, শ্বশুর, ভাই কিংবা অন্যকোনো পুরুষ অভিভাবক)। তার ফলে নারীর ক্ষমতায়ন জিনিসটি বহুলাংশে সোনার পাথরবাটিই রয়ে গিয়েছে। এটাই যখন নির্মম বাস্তব, তখন প্রক্রিয়াটির সংস্কার জরুরি, কোনোভাবেই থেমে যাওয়া চলে না। এই সংস্কারের অন্যতম সেরা পদক্ষেপ হল মেয়েদের আর্থিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি। শুধু চাকরি বা ব্যবসাই তার একমাত্র পথ নয়। সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প রূপায়ণ অবশ্যই হবে। পাশাপাশি জারি থাকা দরকার কিছু আপাত ছোটো কর্মসূচি। যেমন পূর্ববর্তী সরকার চালু করেছিল কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, পরিবারের মহিলাকে কর্ত্রী রেখে পাকাবাড়ি প্রদান, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড প্রদান প্রভৃতি। রাজ্যের প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই জন্য প্রশংসা পাবেন যে, পূর্ববর্তী সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প/কর্মসূচিগুলিকে তিনি পত্রপাঠ বাতিল করেননি, বরং সেগুলি চালিয়ে যাওয়ার সদিচ্ছাই ঘোষণা করেছেন। আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে বিগত সরকার যত টাকা দিত এই জমানায় তার অঙ্ক সোজা দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু নামটা পালটে রাখা হয়েছে অন্নপূর্ণা যোজনা। অন্নপূর্ণা যোজনায় বাংলার মহিলারা প্রতিমাসে তিন হাজার টাকা পাবেন। এটা এই সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। বিজেপির সংকল্পপত্রে মেয়েদের জন্য আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ছিল যে, তারা বাংলায় সরকার তৈরি করতে পারলে সরকারি বাসে মহিলারা বিনামূল্যে ভ্রমণ করার সুযোগ পাবেন। এই কথাও রেখেছে নতুন রাজ্য সরকার। 
১ জুন দিনটি বাংলার মেয়েদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকল। সোমবার থেকে কলকাতাসহ সারা রাজ্যেই তাঁদের জন্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে ভ্রমণের সূচনা হল। লোকাল, দূরপাল্লা উভয় বাসেই তাঁরা নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র (আধার, এপিক, প্যান প্রভৃতি কার্ড) দেখিয়ে ‘জিরো’ মূল্যের টিকিট পেয়েছেন এবং প্রয়োজন মতো ভ্রমণ করতে পেরেছেন। স্বভাবতই খুশি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া থেকে কর্মরত মহিলা, এমনকি গৃহবধূরাও—অসংখ্য নারী। দৈনিক/মাসিক গাড়িভাড়া বাবদ একটা ভালো অঙ্কের অর্থের সাশ্রয় হবে তাঁদের। এই খরচটুকুই করতে পারেন না বহু মা-বাবা, এজন্য মেয়েদের পড়াশোনায় ছুটি হয়ে যায় অকালেই! অনেক মহিলা খুব সামান্য টাকা মজুরি বা বেতনের চাকরি করেন। কর্মস্থলে যাতায়াতে তাঁদের রোজগারের একটা বড়ো অংশ বেরিয়ে যায়। রাজ্য সরকারের এই মানবিক সিদ্ধান্তে তাঁরা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন। এমনকি বছরে দু-একবার কাছেপিঠে নিখরচায় ভ্রমণেরও সুযোগ পাবেন তাঁরা। সব মিলিয়ে রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত নারীর ক্ষমতায়ন এবং আর্থিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি বড়ো পদক্ষেপ হিসাবেই প্রশংসিত হবে। সামাজিক বৈষম্য হ্রাসেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকবে সরকারের এই উদ্যোগের। 

সম্পর্কিত সংবাদ