Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নতুন বাংলায় বিভাজন অসহিষ্ণুতার

দমদম স্টেশন। রেললাইনে পা রেখে প্ল্যাটফর্মে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে এক মহিলা। কাঁদছেন অঝোরে। দু’চোখ জুড়ে শূন্যতা। রবিবার সকাল হল এই ছবি দেখেই। স্টেশনে স্টল ছিল তাঁর। আর নেই।

নতুন বাংলায় বিভাজন অসহিষ্ণুতার
  • ২ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: দমদম স্টেশন। রেললাইনে পা রেখে প্ল্যাটফর্মে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে এক মহিলা। কাঁদছেন অঝোরে। দু’চোখ জুড়ে শূন্যতা। রবিবার সকাল হল এই ছবি দেখেই। স্টেশনে স্টল ছিল তাঁর। আর নেই। গভীর রাতের ‘অভিযান’ কেড়ে নিয়েছে তাঁর সর্বস্ব। সৌজন্যে ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’। অপরাধ? তিনি হকার। পাশে রেললাইনের উপরই বসে আছেন এক বৃদ্ধ। শূন্যতা তাঁরও সঙ্গী। সব হারানোর শূন্যতা। কেউ ছুটেছেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়কের বাড়ি, কেউ আবার ধ্বংসস্তূপে খুঁজে বেড়াচ্ছেন অক্ষত মালপত্র। কিছু যদি বেঁচে থাকে...। কত টাকার জিনিস ছিল? এক লাখ? দু’লাখ? পরোয়া নেই। প্রশ্ন এখন একটাই—রেলের জমিতে বসেছিল কেন? অবৈধভাবে বসলে উঠতে তো হবেই! এই আয়ের টাকায় কে পাঁচজনের সংসার টানতেন, কার অসুস্থ বাবার ওষুধের সংস্থান হত, কে ছেলেমেয়ের জন্য স্কুলের বই কিনে নিয়ে যেতেন... এই সব প্রশ্নই নতুন বাংলায় ফ্যাকাশে রং ধরেছে। সোজা কথায়, দু’ভাগ হয়ে গিয়েছে এই রাজ্য। এই সমাজ। প্রথম ভাগ বলছে, ‘যা হচ্ছে বেশ হচ্ছে। সবটাই কর্মফল।’ আর দ্বিতীয় ভাগ বলছে, ‘এটাই হওয়ার ছিল। আরও নিয়ে এসো এদের ভোট দিয়ে!’ 

Advertisement

এ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ। রাজনীতির নয়। সমাজের। কোন দল কত ভোট পেয়েছে, সেটা আজ অপ্রাসঙ্গিক। অনুপ্রবেশ, এসআইআরও এখন পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। আলোচনা চলছে। চলবেও। কিন্তু ওই দ্বিতীয় সারিতে বসেই। প্রথম সারি আজকের নতুন বাংলায় চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে মানবিকতাকে। এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে সমাজকে। আজ আমরা দেখছি, বিভাজন শুধুই ধর্মীয় হয় না। মানবজমিনের মাঝ বরাবর দাগটা যে কোনো অঙ্কেই টেনে দেওয়া যায়। তা ধর্ম হতে পারে, মনুষ্যত্ব হতে পারে, কিংবা রাজনীতি। সেটাই হয়েছে। হচ্ছে। দিনের শেষে আঘাতটা আছড়ে পড়েছে স্রেফ সমাজের উপর। এর একটা অবয়বও তৈরি হয়েছে—অসহিষ্ণুতা। গত কয়েক মাসে যার সূচনা নিশ্চিতভাবে ধর্মের মোড়কেই হয়েছিল। কিন্তু পালটে যাওয়া সরকারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে তা জাল ছড়িয়েছে সমাজের যাবতীয় প্রেক্ষাপটে। বেরিয়ে আসছে দাঁত-নখ। তা সে হকার উচ্ছেদ থেকে তৃণমূল নেতাদের হেনস্তা—সর্বত্র প্রতিক্রিয়ার এই একটাই অবয়ব। অসহিষ্ণুতা। দু’পক্ষই অসহিষ্ণু। যেন অদ্ভুত এক পৈশাচিক আনন্দ বাংলার সমাজকে এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করে দিয়েছে। দুই শ্রেণির কেউ বলছে না যে, এমনটা ঠিক হয়নি। এই ঘটনা অনুচিত। বরং পক্ষ বেছে নিচ্ছে তারা। মাঠের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে অন্য প্রান্তের প্রত্যেক শ্রেণিকে আক্রমণ চলছে। লাগাতার। অস্থির হয়ে উঠেছে। দ্রুত ফল চাই হাতের মুঠোয়। নিজেদের ধর্ম, আর্থ-সামাজিক ভিত্তি খুঁজে আলাদা হয়ে যাচ্ছে অন্যদের থেকে। মনে মনে বলছে, হকার চুলোয় যাক। প্ল্যাটফর্ম তো ফাঁকা হল! গরিব মানুষ খেতে না পেলে আমার কী? এই রাজ্য সাফসুতরো তো হল! 
সত্যি বলতে, এই বাংলাকে আমরা চিনি না। অথচ, এটাই নতুন বাংলা। বিভাজনের দান। শুধু ধর্মে নয়, মানুষে-অমানুষেও। তা না হলে ‘হকার’কে কেন মানুষ হিসাবে আমরা ভাবতে পারছি না? কেন একবারের জন্য মনে হচ্ছে না, এরা আগামী কাল দিনান্তে কী খাবে? কার হাতে-পায়ে ধরবে? আজ রেলের জমি দখলমুক্ত করার ধুম লেগেছে। কিন্তু এঁদের মধ্যেই তো কেউ বসেছিলেন কংগ্রেস জমানায়। কেউ বা সিপিএম। তখন কেন তাঁদের বসতে বাধা দেওয়া হয়নি? কাটমানির অঙ্ক কি তখনও ছিল? আর যদি এই হকারদের বসতে বাধা না দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা না করে তাঁদের তুলে দেওয়ার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। উচ্ছেদ অভিযান তো আগেও হয়েছে! তাঁরা নেতা-পুলিশের হাতেপায়ে ধরেছেন। পরদিন আবার দোকান খুলেছেন। ওই হকাররাই। সরকার তখন অমানবিক হয়ে যায়নি। পরিসর ছোটো করেছে, ধমকেছে। কিন্তু পেটের ভাত কেড়ে নেয়নি। আর যদি তুলে দেওয়াটাই একমাত্র উপায় হয়ে থাকে, তখন অন্যত্র ব্যবসা করার ব্যবস্থা সরকারই করে দিয়েছে। যেমনই হোক সেই দোকান। যেমনই হোক তার মাপ। অন্নের অধিকার এভাবে কেড়ে নেওয়া হয়নি। হকারি করেই তাঁরা পরিবারের অন্ন সংস্থান করেছেন, ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়িয়েছেন, মুমূর্ষুর চিকিৎসার জন্য টাকার জোগান করেছেন। তাহলে আজ হঠাৎ কী হল? কেনই বা হল? সবচেয়ে বড়ো কথা, সরকারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষগুলো এভাবে বদলে গেল কেন? চারদিকে যেন ঘোড়দৌড় শুরু হয়েছে। যারা বিজেপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে, তারা প্রতি পদক্ষেপে প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যে, এটাই ঠিক। এটাই তারা চেয়েছিল। আর যারা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছিল, তারা দায় চাপাচ্ছে আগের পক্ষের ভোটারদের উপর। দিনের শেষে তাই আসল সমস্যাটা হারিয়ে যাচ্ছে কলতলার ঝগড়ার দুর্গন্ধে। আমরা খুঁজে দেখছি না সেই চা-ওলাকে, যাঁর ছ’টাকার চা আর তিন টাকার একটা বিস্কুট কত দিনমজুরের পেটের জ্বালা কয়েক ঘণ্টার জন্য নিভিয়ে দিয়েছে। নেই সেই ম্যাগাজিন-বইয়ের দোকানিও। সাতসকালে যার কাছ থেকে ছোঁ মেরে কাগজ তুলেই ট্রেনে উঠে পড়তেন ডেইলি প্যাসেঞ্জাররা। ধারের খাতায় লেখা হয়ে যেত চার টাকা। শুধত সবাই। কেউ বিকেলে। কেউ মাস পড়লে। অবরোধ হলে ফোন চলে আসত, ‘আজ বাসে চলে যান। ট্রেন ধরতে গেলে দেরি হয়ে যাবে।’ কারা এরা? রক্তের সম্পর্কের তো নয়। স্বার্থের নয়। বেশিরভাগ নামই তো জানা হয়নি। তাও তারা থাকত। সুখে-দুঃখে, প্রয়োজনে। কী চেয়েছিল তারা? পুজো পর্যন্ত সময়! ততদিনে কিছু না কিছু ব্যবস্থা করে নেব। সময় দেওয়া হয়নি। একদিনও না। একবেলাও না। 
কী হবে এখন? ফাঁকা থাকবে কি স্টেশন? প্ল্যাটফর্ম? চত্বর? না থাকবে না। এবার ওখানেই হবে কনফেকশনারিসের দোকান। ৬ টাকার চা কিনতে হবে ৪০ টাকায়। আমরা সেটাই কিনব। প্রধানমন্ত্রী নিজে ‘প্রজেক্ট’ করলেও ১৫ টাকার ঝালমুড়ি স্টেশন চত্বরে আর পাওয়া যাবে না। তার বদলে প্যাটি কিনতে হবে ৬০ টাকায়। আমরা কেউ তা কিনতে পারব। আর বেশিরভাগের সামর্থ্যে সেটা কুলোবে না। তারা সাধারণ। ১৪০ কোটির দেশে ১০০ কোটি এরাই। কী বলবেন এদের? গরিব? প্রান্তিক? দুর্বল? ভাগ করে দেবেন শ্রেণিতে? আলাদা করে দেবেন নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে? হকার, গরিব, মজদুর, গীতা হাতে ঘুরে বেড়ানো লোকটা... সবাই তখন দুর্বল শ্রেণি। মানুষের থেকে একটু আলাদা। একদল তাদের ঘিরে আহাউহু করছে, আর একদল নাক সিঁটকাচ্ছে। পেটে গামছা বেঁধে তাদের বসে থাকাটা কেউ রাজনৈতিকভাবে এনক্যাশ করবে, কেউ জাস্টিফাই করবে নিজের দেওয়া ভোটকে। বলবে, এই তো ফুটপাত ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। এবার কত সুন্দর হাঁটা যাবে। কিন্তু তারা স্বীকার করবে না... বদলে গিয়েছে শহরটা। রাজ্যটা। হারিয়ে যাচ্ছে প্রাণ। ফুরিয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতি। মানুষের জন্য, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। বুলডোজার চলছে রাস্তায়, ফুটপাতে, বেআইনি নির্মাণে, দুষ্কৃতীদের বাড়িতে। আর আমাদের মনে। অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানোর মধ্যে তাই এখন আমাদের মধ্যে এক নৃশংস আনন্দ হচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি, তারা অভিযুক্ত। এদের কারও বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণিত হয়নি। আর যতক্ষণ কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত স্তরে রয়েছে, তাকে কোমরে দড়ি বেঁধে বা হাতকড়া পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানো শুধু অমানবিক নয়, বেআইনিও বটে। সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা ভারতের প্রত্যেক নাগরিককে এই অধিকার দিয়েছে। প্রেম শংকর শুক্লা বনাম দিল্লি প্রশাসনের ১৯৮০ সালের মামলার রায় তাকে আত্মসম্মান রক্ষার এই শক্তি দিয়েছে। ১৯৯৫ সালে সিটিজেনস ফর ডেমোক্রেসি বনাম অসম সরকারের মামলাতেও রায় ছিল এটাই—জনসমক্ষে নিষিদ্ধ হবে অভিযুক্তের এমন হেনস্তা। তারপরও আজ এমন দৃশ্য দেখেই আনন্দিত হচ্ছি আমরা। মেনে নিচ্ছি স্বেচ্ছাচার। ভাবছি, বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। সেই বীজ বপন হয়ে গিয়েছে। অসহিষ্ণুতার সারজলে আমরা সেই বিষবৃক্ষকে আরও বাড়িয়ে তুলেছি। গ্রেটার এভিল-লেসার এভিলের বাইনারি চর্চায় আমরাই এভিল হয়ে যাচ্ছি। আর বাংলা? দীর্ঘতর হচ্ছে উত্তরপ্রদেশ, বিহারের সংস্কৃতির ছায়া। যার শুরু আছে... শেষ নেই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ