Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এবার মানবিক হোক কমিশন

নরেন্দ্র মোদি কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতবাসীর ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। তিনি প্রথম ধাক্কা দিয়েছিলেন নোটবন্দি করে।

এবার মানবিক হোক কমিশন
  • ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নরেন্দ্র মোদি কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতবাসীর ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। তিনি প্রথম ধাক্কা দিয়েছিলেন নোটবন্দি করে। তারপর রামধাক্কা জুটেছিল কোভিড পর্বের চার দফা ‘লকডাউন’ ফরমান থেকে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে পেতে ‘আনলক’ যে কত দফায় করা হয়েছিল তার হিসেব রাখা শক্ত। এছাড়া আধার তৈরি ও আপডেট, নানা ক্ষেত্রে ফোন নম্বর এবং আধার লিঙ্ক নিয়ে মোদি সরকার এককথায় সকলকে জ্বালিয়ে মেরেছে এবং এখনো জ্বালিয়ে মারছে। তার মধ্যে উটকো ঝামেলা জুটেছিল সিএএ। সেন্সাস বা জনগণনার কোনও খোঁজ নেই। সেই অত্যন্ত জরুরি কাজ ফেলে শুরু হয়েছে এসআইআর। এই মহাবস্তুটি যে কী, ইতিমধ্যেই দেশবাসী তা জেনে গিয়েছে। তার মধ্যে বাংলার মানুষকে টের পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, যাকে বলে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া। অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মূলগত তফাত এই যে, এই রাজ্যটি দেশভাগের প্রধান বলি। বাংলার উপর দিয়ে দেশভাগ ঘটাবার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঠাঁইনাড়া বা উদ্বাস্তু হয়েছিল ১৯৪৭-এ। কিন্তু ওই একবারেই বাঙালির যন্ত্রণা দূর হয়নি, একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন পর্বেও তাদের উপর এই আঘাত নেমে এসেছিল আরো একদফা। সব মিলিয়ে বাঙালি আজও নিজঘরে পরবাসীর মতোই বেঁচে আছে। তার নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নের অবসান হয়নি—নেহরু থেকে মোদি পর্যন্ত সব কেন্দ্রীয় সরকারকেই বাঙালি একই দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকায় পেয়েছে। তাই লক্ষ লক্ষ বাঙালি বরাবরই এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে, বিশেষ করে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী পরিবারগুলি। অসমে এনআরসি করার নামে বাঙালির মানবাধিকার যেভাবে হরণ করা হয়েছিল, তার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত নেই। অসমে বাংলাভাষীরা আজও দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতোই দিনগুজরান করছে বলে অভিযোগ।

Advertisement

স্বভাবতই, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের নামে অনুরূপ আতঙ্কই তৈরি হয়। জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) বারবার আশ্বস্ত করার পরেও বহু পরিবার এমন আতঙ্ক থেকে যে মুক্ত হতে পারেনি, তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই ঘটে যাওয়া বেশকিছু মর্মান্তিক অঘটন। কিছু মানুষ এসআইআর আতঙ্কে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এমনকি মৃত্যুও হয়েছে কয়েকজনের। স্বভাবতই তৃণমূল কংগ্রেসহ একাধিক বিরোধী দল কমিশনের এই ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেছে, তাদের লাগাতার প্রতিবাদও জারি আছে। তৃণমূলের প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে দিল্লিতে ইসিআই দপ্তর এবং সংসদ পর্যন্ত। তার ভিত্তিতে মানুষকে সুরাহা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েও কমিশন বস্তুত নিত্যনতুন যন্ত্রণাই ‘উপহার’ দিয়ে চলেছে। এসআইআর ফর্ম ভরা, জমা নেওয়া থেকে শুরু করে শুনানি পর্যন্ত কতবার যে নিয়ম আর নথির তালিকা বদল হয়েছে তা মনে রাখা দুষ্কর। ভোটারদের হয়রানির সর্বশেষ সংযোজন এআই-নির্ভর সফটওয়্যারের গেরো। এই ‘অপরীক্ষিত’ ব্যবস্থা মারফত বাংলায় প্রায় দেড় কোটি মানুষকে শুনানিতে ডাকা হয়েছে। যাদের কোনোভাবেই তলব করার কথা নয়, তাদেরকেও একপ্রকার হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শুনানি কেন্দ্রে। কমিশনের এই ‘তুঘলকি’ কারবার এবার দেশের শীর্ষ আদালতকেই ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, এই জিনিস তারাও মেনে নেবে না।

কমিশনকে তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। তাঁর মন্তব্য, ‘সামান্য ভুল শোধরানোর নামে যেভাবে সাধারণ মানুষকে মানসিক চাপ দিচ্ছেন, তা মোটেই বরদাস্ত করা যায় না।’ তাতে সহমত পোষণ করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত। সেই চাপে বাংলায় এসআইআর ইস্যুতে কমিশনকে মানতে হল একগুচ্ছ নির্দেশ। কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী আপত্তি তুলেও ঠেকাতে পারলেন না। শীর্ষ আদালত আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, এতটুকু অনিয়ম দেখলেও গোটা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করে দেওয়া হবে। তা সত্ত্বেও আম জনতার হয়রানিতে খামতি হয়নি। তারই প্রতিবাদ জানিয়ে তৃণমূলের পক্ষে মামলা করা হয়। সোমবারই ছিল তার শুনানি। বহুচর্চিত ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ইস্যুতে কমিশনের কোনও যুক্তিই আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। যাতে মানুষের হয়রানি ছাড়াই এসআইআর সম্পন্ন হতে পারে, তার জন্যই এদিন একগুচ্ছ নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে শীর্ষ আদালত এই মামলা বন্ধ করছে না বলেও জানিয়ে দিয়েছে। এবার অন্তত ইসিআইয়ের সংবিৎ ফেরা উচিত। তারা যেন সরকার কিংবা কোনো একপক্ষের কথায় আর নাচানাচি না করে। বহুদলীয় গণতন্ত্রে ইসিআইয়ের কাছে সব দলের, এমনকি প্রতিটি ব্যক্তি নাগরিকেরও মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা সমান। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশন যেন নিজ পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখতে যত্নবান হয়। বৃহত্তম গণতন্ত্রের উন্নয়নের স্বার্থেই এই পদক্ষেপ জরুরি। মনে রাখতে হবে, গোটা গণতান্ত্রিক দুনিয়া কিন্তু আমাদের এসআইআর পর্বের সাফল্য-ব্যর্থতার দিকে নজর রাখছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ