Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ফের গাজর!

ভারত স্বাধীন হয়েছে, আরও খোলসা করে বলা উচিত দেশভাগ হয়েছে প্রায় পাঁচ দশক আগে।

ফের গাজর!
  • ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভারত স্বাধীন হয়েছে, আরও খোলসা করে বলা উচিত দেশভাগ হয়েছে প্রায় পাঁচ দশক আগে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার ভূমিকা ছিল অনবদ্য, সম্ভবত তৎকালীন সব প্রদেশের চেয়ে বেশি। ইংরেজের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির চেয়ে পূর্ববঙ্গের বাঙালির অবদান কোনও অংশে কম ছিল না। এই প্রসঙ্গে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপিনচন্দ্র পাল, উল্লাসকর দত্ত, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, অশ্বিনী দত্ত, মুকুন্দ দাস, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রভৃতি নামই যথেষ্ট। তাঁরা কেউ এক নরকতুল্য ‘পাকিস্তান’ বা ‘বাংলাদেশ’ পাবেন বলে জীবন যৌবন বাজি রাখেননি। তাঁদের প্রত্যেকেরই স্বপ্ন ছিল অত্যাচারী ইংরেজমুক্ত ভারতের নাগরিক হবেন। কিন্তু তার বদলে কী পেল খণ্ডিত বাংলার মানুষ, বিশেষ করে হিন্দুসহ অমুসলিম শ্রেণি? ধর্মীয় পরিচয়, মানসম্মান রক্ষার জন্য লক্ষ লক্ষ নারীপুরুষ একবস্ত্রে পূর্ববঙ্গ থেকে ভারতে চলে এসেছেন। উদ্বাস্তু বা শরণার্থী পরিচয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণের শুরু ১৯৪৭-এ। ১৯৭১-এও এসেছেন বহু মানুষ। পাকিস্তানের জল্লাদ বাহিনীর খপ্পর থেকে পূর্ববঙ্গকে মুক্ত করেছিলেন মুজিবুর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশ ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ সংবিধান গ্রহণ করলেও ওই ভোল বদল ছিল নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী। পদ্মপাতা থেকে জল গড়িয়ে পড়ার মতোই, মুসলিম-প্রধান বাংলাদেশ ফিরে গিয়েছে উগ্র ইসলামেরই তাঁবে। সেখানে দ্রুত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে হিন্দু, বৌদ্ধসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা। অতএব ফের ভারতমুখী হল শরণার্থী স্রোত...। 

Advertisement

সেই ধারা এই ২০২৫ সালেও অব্যাহত! হিন্দু পীড়ন-নিধনে হাসিনা জমানায় কিছুটা রাখঢাক ছিল, মহাপণ্ডিত ইউনুসের জমানা একেবারে বেপর্দা। কিন্তু ভারতেও কি ভালো আছেন পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু বা শরণার্থী জনতা? দীর্ঘদিন বসবাসের সুবাদে অনেকেই সন্তানসন্ততি নিয়ে ঘরসংসার করছিলেন। আধার, এপিক, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট প্রভৃতি তাঁদের ছিল। কোনও একটা জীবিকা বেছে নেওয়ার পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজেও পাঠিয়েছেন অনেকে। একাধিকবার ভোট দিয়েছেন পূর্ণবয়স্ক লোকজন। সেই ভোটে নির্বাচিত সরকার তৈরি হয়েছে এবং দিব্যি চলছে রাজ্যে ও কেন্দ্রে। এর মধ্যেও কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি উসকে দিয়েছে নাগরিকত্বের প্রশ্ন। এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ-সহ শীর্ষ নেতারা বারবার আঙুল তুলেছেন নেহরু এবং কংগ্রেসের দিকে। তাঁদের অভিযোগ, পূর্ববঙ্গের শরণার্থীদের নাগরিকত্ব এবং পুনর্বাসন প্রশ্নটির ফয়সালা করেনি অন্যায় ক্ষমতার কারবারি কংগ্রেস। পরবর্তীকালেও এই অসহায় মানুষগুলি নিষ্ঠুর রাজনীতির বোড়ে হয়েছেন মাত্র, তাঁদের জীবনমরণের সমস্যাটির সুরাহা কেউ করেনি। মোদি সরকারই ত্রাতা, তিনিই এই ক্রনিক সমস্যার পূর্ণ সমাধান করবেন। 
এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ভোটের বাজারে গলাবাজি করার পাশাপাশি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) তৈরি করেছে কেন্দ্র। কিন্তু কিন্তু পাঁচ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সিএএ মারফত ক’জনের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করেছে মোদি সরকার? গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়, সংখ্যাটি দু’হাতের কর গুনেই বলে দেওয়া যাবে! অথচ এসআইআর ধুয়োয় বহু মানুষ ভোটাধিকার হারাবার প্রহর গুনছেন। বঙ্গ বিজেপির কোনও কোনও নেতা হুংকার ছাড়ছেন এক/দুই কোটি নাম বাদ যাবে? কিন্তু তাঁদের বাসনা অনুযায়ী, তার মধ্যে রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি মুসলিম কোথায়! বেশিরভাগই তো হিন্দু বাঙালি, যাঁদের অধিকাংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁরা ভেবেছিলেন আদালত হস্তক্ষেপ করে তাঁদের ভোটাধিকার ফেরাবে। কিন্তু কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, নাগরিকত্ব নিশ্চিত না-হলে ভোটাধিকার ফিরবে না। বিজেপি নেতারা এতদিন আশ্বস্ত করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গসফরে এসেই এই সমস্যার সুরাহা করে যাবেন। কিন্তু কোথায় কী? শনিবার নদীয়ার তাহেরপুরের সভায় তিনি আসতেই পারেননি। পরিবর্তে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে শুনিয়ে গিয়েছেন ফোনে মাত্র ১৫ মিনিটের এক ভাষণ। তাতে এসআইআর পর্বে মতুয়াদের আতঙ্ক কমানোর নিদান নেই। প্রধানমন্ত্রীর মুখে শোনা গিয়েছে শুধুই—‘জয় নিতাই’, ‘জয় হরিচাঁদ ঠাকুর’, ‘জয় গুরুচাঁদ ঠাকুর’ এবং ‘জয় বড়মা’! অর্থাৎ নাগরিকত্ব নিয়ে স্পিকটি নট! পরে অবশ্য বঙ্গ বিজেপির পিঠ বাঁচাবার কৌশলও নিয়েছেন—‘এক্স’ হ্যান্ডলে মোদি লিখেছেন, ‘আমি প্রত্যেকটি মতুয়া ও নমঃশূদ্র পরিবারকে আশ্বাস দিচ্ছি, আমরা সর্বদা তাঁদের সেবা করব। তাঁরা তৃণমূলের অনুগ্রহে এখানে নেই। আমাদের সরকারের তৈরি সিএএর সৌজন্যে তাঁরা সম্মানের সঙ্গেই ভারতে বসবাস করার অধিকার পেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার হলে মতুয়া ও নমঃশূদ্র সমাজের জন্য আমরা আরও বেশি করে কাজ করব।’ এমন গাজর মতুয়াসহ সমস্ত বাঙালি উদ্বাস্তুর সামনে তো বছরের পর বছর ঝোলানোই আছে। কিন্তু তা বিপন্ন মানুষের নাগালে আনা হচ্ছে কই? তাঁদের নিয়ে প্রতারণার রাজনীতিতে এবার অন্তত পূর্ণচ্ছেদ পড়ুক, প্রধানমন্ত্রী তার আন্তরিক উদ্যোগ নিন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ