Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

জমি-বাড়ি: যুগান্তকারী ব্যবস্থা

যে জিনিসগুলি বেঁচে থাকার জন্য জরুরি, তার মধ্যে বাসস্থান একটি। বাসস্থান মানে, ঩যেখানে একজন মানুষ এবং তার পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। সেখানে ঘর তৈরি তো করতেই হয়, ওইসঙ্গে থাকে তাদের বাগবাগিচাও।

জমি-বাড়ি: যুগান্তকারী ব্যবস্থা
  • ২১ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

যে জিনিসগুলি বেঁচে থাকার জন্য জরুরি, তার মধ্যে বাসস্থান একটি। বাসস্থান মানে, ঩যেখানে একজন মানুষ এবং তার পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। সেখানে ঘর তৈরি তো করতেই হয়, ওইসঙ্গে থাকে তাদের বাগবাগিচাও। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান—যে-যুগে বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপকরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, সে-যুগে ভারতবাসীর প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। খাদ্যসংগ্রহের জন্য শিকার আর একমাত্র উপায় নয়; আর গুহাবাসীও নয় তারা; পরবর্তী ধাপে উত্তরণ ঘটে গিয়েছে মানুষের। ফলে, কিছু কৃষিজমিও বাসস্থানের সংজ্ঞার অন্তর্গত তখন। ধান, গম, সব্জি প্রভৃতি চাষের পাশাপাশি আম, জাম, নারকেল, সুপারি প্রভৃতি ফলমূলের গাছ রোপণ রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সমাজে স্বীকৃতি লাভ করেছে ততদিনে। ফলে জমির উপর মানুষের দখলদারি এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই বাড়তে থাকল। কৌটিল্যের আমলেই ব্যক্তিগত জমির মালিকানা, বিক্রয় বা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চালু ছিল। প্রাচীন রাজারা রাজ্যের এক্তিয়ার বৃদ্ধির জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। জয়ী রাজার রাজত্ব সম্প্রসারিত হতো, অন্যদিকে সঙ্কুচিত হতো পরাজিত রাজার রাজ্যের আয়তন। প্রাচীন রাজারা খাজনার বিনিময়ে প্রজাদের জমি ভোগদখলের অধিকার দিতেন। তাঁরা আবার খুশি হয়ে নিষ্কর জমিও দান করতেন বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা শ্রেণিকে। মোগল এবং ইংরেজ আমলে জমির দলিল ব্যবস্থা অনেকটাই সংগঠিত রূপ পেয়েছিল। আবার তখন থেকেই শুরু হয়েছিল গরিব, দুর্বল ও অশিক্ষিত মানুষকে ঠকিয়ে জমি কেড়ে নেওয়ার কারবার। এই অপরাধ স্বাধীন ভারতে ব্যাপক আকার নিয়েছে। মালিককে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে কোনও কোনও জমি অন্যের নামে রেজিস্ট্রি, এমনকী মিউটেশন পর্যন্ত করে নেওয়া হয়। জমি সংক্রান্ত জালিয়াতি এমনও ভয়াবহ আকার নেয় যে, একই জমি একইসঙ্গে একাধিক ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। জাল দলিল ও পরচা দাখিল করে একাধিক ব্যাঙ্ক থেকে ঋণগ্রহণের অনেক ঘটনা সামনে আসে। কয়েকবছর যাবৎ পশ্চিমবঙ্গসহ সারা ভারতেই ক্রেতা-বিক্রেতার আধার-প্যান নিয়ে হাজারো কড়াকড়ি চলছে। তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতেও এই ধরনের জালিয়াতদের দাপাদাপি বন্ধ হয়নি। 

Advertisement

ফলে সরকারকে ফলপ্রসূ বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতেই হচ্ছে। আর এখানেই মিলেছে সুখবর, জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশনে বাংলাতেই চালু হচ্ছে ফেস রেকগনিশন ব্যবস্থা এবং তা দেশের মধ্যে প্রথম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের এই মহতী উদ্যোগের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে উদ্যোগী রাজ্য সরকার। জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশনের সময় চালু হতে চলেছে ফেস রেকগনিশনের মাধ্যমে ভেরিফিকেশন বা যাচাই পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ক্রেতা, বিক্রেতা ও সাক্ষীর মুখমণ্ডল ‘স্ক্যান’ করা হবে। রেজিস্ট্রি অফিসে আসা বিক্রেতাই সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির প্রকৃত মালিক কি না, তা এই প্রক্রিয়ায় সহজেই যাচাই করা যাবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে একটি অ্যাপ তৈরি করছে রাজ্য সরকারের অর্থদপ্তরের অধীন ‘ডিরেক্টরেট অব রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড স্ট্যাম্প ডিউটি’। অ্যাপ তৈরির শেষ পর্যায়ের (টেকনোলজি অডিট) কাজ চলছে এখন। অ্যাপটি ব্যবহার করা হবে রীতিমতো আটঘাট বেঁধে, যাতে অ্যাপের কোনোরকম অপব্যবহার না-হয় সেটা অবশ্যই দেখা হবে। নয়া ব্যবস্থা চালু হয়ে যাবে শীঘ্রই। সেক্ষেত্রে দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ফেস রেকগনিশনের মাধ্যমে যাচাই প্রক্রিয়া চালু হবে। 
বর্তমান নিয়মে রেজিস্ট্রেশনের সময় ক্রেতা, বিক্রেতা এবং সাক্ষীকে দশ আঙুলের বায়োমেট্রিক দিতে হয়। ওইসঙ্গে তুলে রাখা হয় তাঁদের ছবি। দিতে হয় ই-সিগনেচার। রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রারের সামনেই এই ধাপগুলি সারতে হয়। একইভাবে মুখমণ্ডল ‘স্ক্যান’ করে যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও সারতে হবে রেজিস্ট্রি অফিসে। ফলে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির প্রকৃত মালিকই সেটি বিক্রি করছেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে এবং সহজে যাচাই করা সম্ভব হবে। প্রসঙ্গত, ফেস রেকগনিশন হয়ে গেলে ছবি তোলার আর তেমন প্রয়োজন থাকবে না। পরবর্তীকালে আইনে বদল আসার পর ক্রেতা-বিক্রেতার পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিই প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠবে। অনেক সময় আঙুলের বায়োমেট্রিক নেওয়ার ক্ষেত্রে একাধিকবার চেষ্টা করতে হয়। ফেস ভেরিফিকেশন চালু হলে সেই ঝামেলাও মিটবে। সব মিলিয়ে জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাটসহ বিবিধ স্থাবর সম্পত্তির ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরে স্বচ্ছতা বাড়বে। এই যুগান্তকারী পরিবর্তনে সবচেয়ে স্বস্তি পাবেন আইন মেনে চলা নাগরিকরা। জমি-বাড়ির দলিলের ভিত্তিতে ঋণমঞ্জুরের ক্ষেত্রে অনেক নিশ্চিন্ত হতে পারবে ব্যাঙ্কসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিও।

সম্পর্কিত সংবাদ