Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অপাঙ্‌ক্তেয়?

পেনশন নিয়ে ভারতের সীমাহীন দুর্দশার ছবিটা দেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রশ্ন করাই যায়, দেশের বরিষ্ঠ মানুষেরা আর কত অসহায় হলে তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ বলা যাবে?

অপাঙ্‌ক্তেয়?
  • ১৯ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পেনশন নিয়ে ভারতের সীমাহীন দুর্দশার ছবিটা দেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রশ্ন করাই যায়, দেশের বরিষ্ঠ মানুষেরা আর কত অসহায় হলে তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ বলা যাবে? স্কুলের পরীক্ষায় ‘সি’ গ্রেড পেলে বলা হয় টেনেটুনে পাস। আর ‘ডি’ গ্রেড মানে ‘ফেল’, মানে অকৃতকার্য। একটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পেনশনের ক্ষেত্রে গত কয়েকবছর ধরে টানা ‘ফেল’ করেই চলেছে ভারত! এই ২০২৫-এও তার অন্যথা ঘটেনি। শুধু ফেল নয়, পেনশন সূচকের বিশ্ব ক্রমতালিকায় ভারতের স্থান তলানিতে ঠেকেছে। ভারতের স্থান শেষ পাঁচের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। অথচ পেনশন হল বরিষ্ঠ নাগরিকের শেষজীবনের সম্বল, আত্মনির্ভরতা ও আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার প্রতীক। বলা যায়, অবসরের ‘লাঠি’ পেনশন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবসরপ্রাপ্তদের সম্মানজনকভাবে বাঁচা নিশ্চিত করতে তাদের সরকারি উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা চোখ টানতে বাধ্য। অথচ চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দাবি করা মোদি জমানায় বয়স্করা যেন সরকারের ‘দুয়োরানি’, যেন ‘পাপের বোঝা’ বইতে হচ্ছে সরকারকে! সরকার ভুলে যায় পেনশন কারও দয়ার দান নয়। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, অবসর গ্রহণের পর তাদের জন্য সম্মানজনকভাবে বাঁচার ব্যবস্থা করতে এই সরকার নারাজ। 

Advertisement

অতীতের ভুলত্রুটি শুধরে এগিয়ে চলাই যে কোনও সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। অথচ অতীতের নানা সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা তুলে ধরে প্রচার করতে প্রধানমন্ত্রী মোদি কোনও ত্রুটি না রাখলেও দেখা যাচ্ছে মোদির রাজত্বে পেনশনের ক্ষেত্রে সেই ‘ট্র্যাডিশন’ সমানে চলছে। মার্কিন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মার্সার সিএফএ ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ২০২১ সালে ৪৩টি দেশের মধ্যে ভারতের পেনশন ব্যবস্থা ৪০তম স্থানে ছিল। ২০২২-এ ৪৪টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ৪১ এবং ২০২৩-এ ৪৭টি দেশের মধ্যে ভারত রয়েছে ৪৫তম স্থানে। সদ্য ২০২৫-এর ‘গ্লোবাল পেনশন ইনডেক্স’ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। সূচক তৈরিতে মূল তিনটি মাপকাঠিকে বিচার্য বিষয় হিসেবে ধরা হয়েছে। এক) পর্যাপ্ত অঙ্কের পেনশন, দুই) পেনশনের স্থিতিশীলতা এবং তিন) পেনশনের গ্রহণযোগ্যতা। এই তিন মাপকাঠির ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী গড় স্কোর ছিল ৬৪.৫ পয়েন্ট। ভারত ৪৩.৮ পয়েন্ট পেয়ে ‘ডি’ গ্রেডে ঠাঁই পেয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পর্যাপ্ত পেনশন বিভাগে। ৩৪.৭ পয়েন্ট পেয়ে এই মাপকাঠিতে ভারত পেয়েছে ‘ই’ গ্রেড। স্থিতিশীলতায় ৪৩.৮ পয়েন্ট পেয়ে ‘ডি’ গ্রেড। কিছুটা মুখরক্ষা হয়েছে গ্রহণযোগ্যতায়। এখানে ৫৮.৪ পয়েন্ট পেয়ে ভারতের কপালে জুটেছে ‘সি’ গ্রেড, মানে পাস মার্ক। বিশ্বজুড়ে অবসরকালীন ৫২টি প্রকল্পের উপর সমীক্ষা হয়েছে। জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ এইসব পেনশন প্রকল্পের অধীনে। নরেন্দ্র মোদির সরকার এই সমীক্ষাকে মান্যতা না দিয়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমার ‘অপপ্রচার’ বলে আখ্যা দিতেই পারে। কিন্তু তাতেও প্রকৃত সত্য আড়াল করা যায় না। ভারতের পেনশনভোগীরা, বিশেষত বেসরকারি সংস্থা থেকে অবসরপ্রাপ্তরা কী পরিস্থিতিতে অবসরজীবন কাটাচ্ছেন তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। পেনশনবাবদ যেটুকু টাকা তাঁরা পান তাতে তাঁদের ওষুধের খরচটুকুও মেটে না। 
এ দেশে কেন্দ্র-রাজ্যের সরকারি কর্মচারীরা সাধারণভাবে তাঁদের সর্বশেষ মূল বেতনের একটা অংশ পেনশন হিসেবে পান। বেসরকারি সংস্থার একটি অংশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা ন্যূনতম মাসিক এক হাজার টাকা পেনশন পেয়ে থাকেন, যা তাঁদের জন্য যথেষ্ট অসম্মানজনক। তাঁদের পেনশন বাড়ানোর দাবি নিয়ে দীর্ঘ টালবাহানা করে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু বেসরকারি ক্ষেত্রের একটা বড় অংশ এবং প্রায় গোটা অসংগঠিত শিল্পের শ্রমিকদের অর্থনৈতিকভাবে জীবনের কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবন কার্যত অন্ধকারে। এই বাস্তব পরিস্থিতিতে সরকারের আশু কর্তব্য ও ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে সমীক্ষক সংস্থা থেকে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ বহু পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন, গরিব প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থা করা। দেশের বিশাল সংখ্যক অসংগঠিত ক্ষেত্রকে পুরোপুরি পেনশন প্রকল্পের আওতায় আনা দরকার, পর্যাপ্ত অবসরকালীন সঞ্চয় নিশ্চিত করতে কোনও প্রকল্পের আওতায় আনার ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা, বেসরকারি ও স্বেচ্ছা পেনশন প্রকল্পগুলির নিয়মকানুন আরও শক্তিশালী করা ইত্যাদি। কিন্তু এসব পরামর্শ কানে তুলতে নারাজ মোদি সরকার। অথচ দেশে বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। তার মানে, মোটামুটি ৬০ বছর পর্যন্ত কর্মজীবন কাটিয়েও জীবনের উপান্তে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বাকি জীবনটা কাটানোর কোনও নিশ্চয়তা দিতে নারাজ এই সরকার। অবশ্য যে দেশের সরকার কোনও সদ্যোজাত এবং আসন্নপ্রসবা মাকে সুস্থ থাকার গ্যারান্টি দিতে পারে না, তারা যে বয়স্ক নাগরিকের আর্থিক নিরাপত্তা ও দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করবে— তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। দেশের বরিষ্ঠ নাগরিকরা অতলে তলিয়ে যান, মোদির গদি অক্ষত থাকলেই শাসকের চোখে দেশ এগিয়ে যাবে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ