হিমাংশু সিংহ:
হিমাংশু সিংহ:
বঙ্গ বিজেপি আজ কোন মুখে উৎসব করবে? কেন্দ্রে এগারো বছর ক্ষমতায় থাকার চোখধাঁধানো পার্বণ চলছে দেশজুড়ে। দল ও সরকার দুই নানা কিসিমের সাফল্যের ঝাঁপি খুলে বসেছে। প্রচারের সাতকাহনে ঢেকে যাচ্ছে দুশো জুমলা। বেকারত্বের যন্ত্রণা। প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারার হতাশা। না ভুল হল, আলোর রোশনাইয়ের নীচেই নিকষ অন্ধকার। আচমকা একটা ভয়ঙ্কর বিমান দুর্ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সর্বক্ষেত্রে গাফিলতি কেমন নিরাপদ আকাশকেও গ্রাস করেছে। বলতেই পারেন, এয়ার ইন্ডিয়া তো এখন বেসরকারি হাতে। কিন্তু বেসরকারি হাতে দিলেই কি সাত খুন মাফ? টেক অফের সঙ্গে সঙ্গে যদি দূরপাল্লার কুলিন ড্রিমলাইনার বিমানেরই এমন অবস্থা হয়, তাহলে গালভরা অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক রাখার দরকারটা কী? সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন, আসল সত্যিটা সামনে আসবে তো! নাকি রাজনীতির ভুলভুলাইয়ায় সব হারিয়ে যাবে অবলীলায়। ভোট আসে ভোট যায়, সরকারি গাফিলতি দগদগে ঘা হয়ে মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। শাসক বিজেপি ক’টা রাজ্যে বাড়ল তা দিয়ে সমাজের এই বিশাল ক্ষতিপূরণ সম্ভব কি?
ভোট আসতেই বঙ্গ বিজেপি বলছে, দ্যাখো আমি বাড়ছি মামি! কিন্তু টানা একদশকের দুধ, কলা, দলবদলু আর ল্যাক্টোজেনেও তার শরীর সেই রুগ্নই। তামিলনাড়ু ও কেরল বিজেপি’র অবস্থাও রেল-বিমান পরিষেবার মতোই ধুঁকছে। নিয়ম করে কেন্দ্রের মন্ত্রীসান্ত্রিরা ঝাঁপাচ্ছেন বটে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বাংলায় বিগত একুশের তুলনাতেও জেলায় জেলায় সংগঠন দুর্বল। যেটুকু ছিল তাও হতাশায় ইদানীং বসে গিয়েছে। কুৎসা আর সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ছাড়া দেওয়ার কিছুই নেই। না ভুল বললাম। আর একটা জিনিস আছে। বামের ভোট রামে টানার অন্তহীন প্রতিযোগিতা। সঙ্গে দিল্লি থেকে উড়িয়ে আনা ডাকাবুকো নেতানেত্রী। তাঁরা আসছেন, ঘুরছেন, শেষে আঁতুড় ঘরে থাকা দলটার ন্যাপি বদলেই আবার নীরবে ফিরে যাচ্ছেন। বাংলার মানুষকে দিশা না দেখিয়ে শুধু কুৎসার চাষ হচ্ছে।
এসবেরই নিট ফল, বাংলায় এক দশকেরও বেশি সময় পরেও দলের নিজস্ব সর্বজনগ্রাহ্য নেতা নেই। আবার ভোট এসে গেল, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও নতুন বঙ্গ সভাপতি খুঁজে পাওয়া গেল না। দাঁড় বাওয়ারই লোক নেই, স্বাভাবিক কারণেই মমতার পাল্টা মুখ্যমন্ত্রী মুখ সামনে আনাও বিশ বাঁও জলে। কারণ তাতে শুধু দলে কোন্দলই বাড়বে, লাভের লাভ কিছুই হবে না। যাঁরা আছেন অধিকাংশই ভাঙিয়ে আনা। ইডি, সিবিআই-এর মামলা থেকে বাঁচতে কিংবা তৃণমূলে কল্কে না পেয়ে। ব্যক্তিগত ধান্দায়। তাদের দিয়ে শাসকের বিরুদ্ধে কুৎসা করা যায়, নর্দমা সাফ করা যায়, কিন্তু লড়াইয়ের মুখ, মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি—রাম কহো!
বিগত এক দশক ভোট এলেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিল্লির নেতাদের ডেইলি প্যাসেঞ্জারি শুরু হয়। এবারও বাংলার মাটিতে সেই বস্তাপচা কৌশলের ছেলেমানুষি প্রয়োগ অনিবার্য। শুরুও হয়ে গিয়েছে তার প্রাথমিক মহড়া। নেতাদের বিমান দু’ঘণ্টা উত্তর-দক্ষিণ চষে বাংলার সীমানা ছাড়ালেই সব শূন্য, আবার পরের সফরের প্রতীক্ষা। চল্লিশবার এসেও মোদি-অমিত শাহের জাদুকাঠিতে বাংলার গেরুয়াকুল নিজের পায়ে দাঁড়ায় না। একুশে অমিত শাহ দু’শো আসনের টার্গেট বেঁধে অর্ধেকেরও কম আসনে থেমে গিয়েছিলেন। ভোটের পর নাটক করে দল ছেড়েছেন এক ডজনের মতো বিধায়ক। আর এবার দলের মধ্যেই হরেক শিবির। গোষ্ঠীর ছড়াছড়ি। কেউ ওই দাদার ঘনিষ্ঠ তো কেউ অমুক শিবিরের। কেউ আবার পুরনো আরএসএস। উনিশের লোকসভায় ১৮ আসন জেতার কাণ্ডারী দিলীপ ঘোষ ইদানীং ব্রাত্য। একুশ পরবর্তী দলের নতুন হিরোদের মুখ যত চলে ভোটযন্ত্রে পদ্ম কিন্তু তত ফোটে না। কোণঠাসা দিলীপ তাই কলকাতায় অমিত শাহের মিটিংয়ে পর্যন্ত ডাক পাননি। তাঁর অসুখটা কী দল বলেনি। অপরাধটাও না। এতদিন পেরিয়ে এসে বিয়ে করা নাকি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির দেখতে গিয়ে মমতার সঙ্গে দেখা করা। কে জানে! গত চার দশকেরও বেশি সময় মন্দির রাজনীতি যে দলটার মূল চালিকাশক্তি তার এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মন্দির দেখতে গিয়েছেন বলে একঘরে হতে পারেন? এসব দেখে দলের নিচুতলা হতাশ হয়ে দল ছাড়ছেন। তাই এবার আর টার্গেট বেঁধে দেবেন কি নাড্ডাজিরা? বোধহয় না। অগত্যা অনুগামীদের গা গরম করতে তামিলনাড়ুতে লোক হাসিয়েছেন অমিতজি। কী বা করার আছে তাঁর। বলেছেন, আসন্ন বিধানসভা ভোটে তামিল ও বঙ্গভূমে নাকি পদ্ম ফুটবে। এমন কথা শুনে স্ট্যালিন ও মমতা দু’জনে কী করবেন জানি না। তবে দুষ্টু ঘোড়ার মুচকি হাসি যে কিছুতেই থামবে না, তা হলফ করেই বলতে পারি।
গোদের উপর বিষফোঁড়া, মোদি সরকারের বীরত্ব কাহিনি দেশে দেশে তুলে ধরেছেন সেই তৃণমূল নেতা যার সমালোচনা না করে ওদের দিন চলে না। যাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করলে এ রাজ্যের তাৎপর্যহীন গেরুয়া নেতানেত্রীদের ভাত হজম হয় না। দলবদলুর তো বটেই। অপারেশন সিন্দুর নিয়ে বিদেশে গলা ফাটাল কে? দলবদলু এলওপি নন, বাংলার সঙ্ঘপতিরাও কেউ নন। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ডহারবারের এমপি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এত আক্রমণ সহ্য করেও তিনি শুধু একাধিক দেশে সফর করেই ক্ষান্ত হননি অনেকের চেয়ে সদর্থক ভূমিকা পালন করেছেন। বঙ্গ বিজেপির উলুখাগড়া নেতারা না ডাক পেলেও প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ পেয়েছেন সসম্মানে। শশী থারুর কয়েক দশকের পোড়খাওয়া পণ্ডিত হিসেবে খ্যাত। তাঁর সঙ্গে কারও তুলনা টানা উচিত নয়। বিদেশ নীতির ওস্তাদ। তবে অভিষেকের সপ্রতিভ কথা বলা ইংরাজি বলার স্টাইল, স্মার্টনেস, সবার নজর কেড়েছে। অভিষেকের ইংরেজিতে কোনও মেদিনীপুরিয়া টান নেই। অভিষেক যখন বিদেশে তখন এ রাজ্যে এসে ভোটের রাজনীতি করেছেন দেশের সর্বোচ্চ নেতা। সিঁদুর নিয়ে বলতে গিয়ে সোজা লাফ ক্ষমতা দখলের ফিরিস্তিতে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিষেককে তাবলে সফর কাটছাঁট করে ফিরে আসতে বলেননি। এই খানেই পার্থক্য। দেশপ্রেমের নামে মেকি জাতীয়তাবাদ ত্যাজ্য। এগারোর সাফল্যকে আবাহন করার সঙ্গে এই সত্যের উপলব্ধিও জরুরি।
চোদ্দো বছরে মমতা দিয়েছেন লক্ষীর ভাণ্ডার। কন্যাশ্রী। পথশ্রী। বিধবা ভাতা। স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড। আরও কত কী! সর্বশেষ সংযোজন পুরীর আদলে দীঘায় বিরাট জগন্নাথ দেবের মন্দির। কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান পাকা। আর মোদিজি উপহার দিয়েছেন নোট বাতিল। জিএসটি। বালাকোট । অপারেশন সিন্দুর। অযোধ্যার রামমন্দির। কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি। বেকার কমেনি। বরং রেকর্ড বেড়েছে। জিনিসের দামও কমেনি বরং আকাশ ছুঁয়েছে। কালো টাকাও পাল্লা দিচ্ছে। মধ্যবিত্তের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। সঞ্চয় তলানিতে। দশ লক্ষ সরকারি পদ ফাঁকা। কৃষকের আয় দ্বিগুণ হয়নি। হ্যাঁ, সমাজে ভেদাভেদ বেড়েছে। হিন্দু মুসলিম ভাগাভাগির ভোট দেখছে দেশ। আর আটমাস বাদে বাংলার ভোটেও উন্নয়ন নয়, অন্যকোনও স্বপ্ন নয়, শুধু সাম্প্রদায়িক তাস খেলেই বৈতরণী পার করতে চাইছে বিজেপি। তবে তাদের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে একাজে সাহায্য নিতে হচ্ছে তৃণমূল ছেড়ে আসা দলবদলুদের। আগমার্কা আরএসএসের অনেক নেতাকে বসিয়ে রেখে দল আজ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের টানাপোড়েনে জীর্ণ। চোলি কে পিছে কী চলছে, ডেইলি প্যাসেঞ্জার নেতারা তার খোঁজ রাখেন না। আসন্ন নির্বাচনেও ৩০ শতাংশ বুথে লোক বসাতে হিমশিম খেতে হবে।
চারদিকে ঢাকের আওয়াজ। ৬৩ বছর আগে ওয়াহিদা রহমানের ছবি দেখেছিল দেশবাসী। বিশ সাল বাদ। মনস্তাত্ত্বিক হরর ছবি।এবার মোদির এগারো সালের কিস্সা। শুধুই সিঁদুর দিয়ে ঢাকা। সেনার বাহাদুরি, দেশের সার্বভৌমত্ব, পাকিস্তান বিরোধী পরাক্রম বাঙালি বাইরের কারও কাছ থেকে শিখবে না। বাংলা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পীঠস্থান। দেশের জন্য প্রাণ সঁপে দেওয়ার কাহিনি এখানে মুখে মুখে ঘোরে। শুধু বঙ্গ বিজেপির থিঙ্ক ট্যাঙ্কদের বলব মমতার সঙ্গে লড়বেন পরে, আগে এ রাজ্যে দলটার অতিমাত্রায় দিল্লি নির্ভরতা কমিয়ে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করুন। ১১ বছরেও দুই পা শক্ত না হলে, হাঁটতে গিয়ে টাল খেলে লোকে তাকে খোঁড়া বলে!