তামিম ইসলাম, ডোমকল: ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৯টার আশপাশে। সাইকেল করে মাঝবয়সি এক ব্যক্তি এসে দাঁড়ালেন গ্রামের গাছতলায়। সাইকেলের পিছনে বাঁধা কাঠের বাক্স। ঢাকনা খুলেই বের করে আনলেন ক্ষুর, কাঁচি, চিরুনি, ফটকিরি, সাবান, পাউডার…আরও কত কী? গাছতলায় পিঁড়ে নিয়ে তাঁকে বসতে দেখেই ধীরে ধীরে জড়ো হতে থাকল কচিকাঁচা থেকে প্রবীণরাও। কালবিলম্ব না করেই আট থেকে আশির কেশচর্চায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। তবে সেই কেশচর্চার বদলে পয়সাকড়ি দিতে দেখা যায় না কাউকেই। তাহলে কি তিনি বিনে পয়সায় এই পরিষেবা দেন? খোঁজ নিতেই জানা গেল, টাকা নয়, বছরভর এই ক্ষৌরকর্মের বিনিময়ে ধান দিতে হয় গ্রামের বাসিন্দাদের। শুনতে খানিক অবাক লাগলেও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা রানিনগরের চর দুর্গাপুর ও হারুডাঙা সহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামে এখনও এভাবেই চলে ধানের বিনিময়ে ক্ষৌরকর্ম।
ঝাঁ-চকচকে সেলুনের জমানাতেও এসব গ্রামের নাপিতরা এখনও বংশ পরম্পরায় টিকিয়ে রেখেছেন ধানের বিনিময়ে ক্ষৌরকর্মের শতাব্দীপ্রাচীন প্রথা। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সেই নাপিত আসেন। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বাড়ির সামনে গাছতলায় পিঁড়ে পেতে বসেন। তারপর একে একে হাজির হবেন গ্রামের পুরুষরা। চুল, দাড়ি, গোঁফের যত্ন চলবে নিখুঁত ছাঁটে। তবে ওসব কাজের বিনিনিয়ে টাকা নয়, বছরের শেষে ধানের মরশুমে পরিবার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে ধান তুলে দিতে হবে ওই ক্ষৌরকারকে। কিন্তু কত পরিমাণ? সেটি অবশ্য নির্ভর করে বাড়ির পুরুষ সদস্যের সংখ্যার উপরে। এরপরও মোটের উপর পরিবার প্রতি এক থেকে দেড় মণ ধান মেলে এক একটি বাড়ি থেকে। কেউ বিয়ে দিলে কিংবা পরিবারে নতুন পুরুষ সদস্য বাড়লে সেই হিসেবেও ধানের পরিমাণ বাড়ে। চর দুর্গাপুর ও হারুডাঙা মিলিয়ে মোট পাঁচজন নাপিত এই রীতিতেই যুক্ত। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিজের নিজের গ্রাম ভাগ করে নিয়েছেন। গ্রামের যেসব বাড়িগুলি যাঁর দায়িত্বে তিনি সেই বাড়ির সদস্যদেরই কেশ পরিচর্চা করবেন।
হারুডাঙার নাপিত সুব্রত প্রামাণিকও তাঁদের মধ্যে একজন। তিনি বলছিলেন, আমার বাবা এই কাজ করতেন। সেইসময় আমরা দেখতাম, বাবা সকালে বাক্স নিয়ে বেরিয়ে যেতেন। এরপর সারা গ্রামের ক্ষৌরকর্ম সেরে ফিরে আসতেন। এখন সেই কাজই আমি করি। প্রায় ২০বছর হয়ে গেল। আগে অনেক লোক তাঁদের চুল-দাঁড়ি কাটাতেন। এখন কিছুটা কমেছে। তবুও পাড়া মিলে বছরে অন্তত পঞ্চাশ মণ ধান পাই। আমার পরিবারে তাতেই চলে যায়।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা বিভাস হালদার জানান, ছোটো থেকে এভাবেই চুল কাটিয়ে আসছি। গ্রামে বেশ কয়েকটি সেলুন হলেও এখানে গাছের ছায়ায় বসে, বাতাস খেতে খেতে চুল কাটানোর মজাটাই আলাদা। আমার তিন ছেলেও এভাবেই চুল কাটায়। ওরা কিন্তু সেলুনে যায় না। পৌষে ধান ওঠার সময় ওঁদের জন্য আলাদা করে ধান রাখতে হয় আমাদের।